জেলা প্রশাসনের এলএ শাখা

সাবেক চেইনম্যান নজরুল দুদকের হাতে গ্রেপ্তার

নগদ ৭ লাখ ও ৯১ লাখ টাকার চেক উদ্ধার

নিজস্ব প্রতিবেদক

57

জেলা প্রশাসনের এলএ শাখার সাবেক চেইনম্যান ও ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার কার্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নজরুল ইসলামকে গতকাল ষোলশহর শপিং কমপ্লেক্সস্থ তার নিজস্ব দোকান থেকে গ্রেপ্তার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ সময় তার কাছ থেকে ৯১ লাখ টাকার চেক ও নগদ ৭ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে জমি অধিগ্রহণ সম্পর্কিত বিভিন্ন দলিলপত্র।
দুদক সূত্রে জানা যায়, শপিং কমপ্লেক্সের দ্বিতীয় তলার ‘আনুকা’ নামের একটি কাপড়ের দোকান রয়েছে নজরুলের। দুদক কর্মকর্তারা জানতে পারেন সে দোকানে নিয়মিত টাকা লেনদেন হয়। বৃহস্পতিবার বিকেলেও টাকা লেনদেনের খবর আসে। এরপরই অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে সাড়ে তিনটার দিকে তাকে আটক করা হয়। একই সাথে ওই দোকান থেকে জেলা প্রশাসনের কর্মচারী তসলিম উদ্দিনকেও দুদক কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনিও তার সহযোগী। তার কাছ থেকে পাওয়া যায় ৫৭ হাজার টাকা।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, নজরুল ইসলাম একসময় জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ কার্যালয়ে চেইনম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে নজরুল ইসলামসহ তিনজনকে তাৎক্ষণিক বদলির নির্দেশ দেন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী। তাকে দেয়া হয় ফটিকছড়ি উপজেলা পরিষদে।
সূত্র জানায়, চেইনম্যান হলেও তিনি শত কোটি টাকার মালিক। জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় থাকাকালে তার কথার বাইরে কোনো কাজ হত না। তিনি যেটা বলতেন সেটাই হত। ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের কাছ থেকে কমিশন আদায়ের দায়িত্ব ছিল নজরুলের নেতৃত্বে তিন জনের একটি চক্রের। প্রতিটি প্রকল্পে প্রতিজন ভূমি মালিকের কাছ থেকে শতকরা ১০ থেকে ২০ ভাগ টাকা কমিশন হিসেবে আদায় করতেন তিনি। ওই সময় বাস্তবায়ন হওয়া আউটার রিং রোড প্রকল্প, বহদ্দারহাট থেকে শাহ আমানত সেতু পর্যন্ত ফোর লেন, চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়ক, অক্সিজেন-হাটহাজারী সড়ক প্রকল্পসহ অন্তত ১৫টি প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। যার বরাদ্দ কয়েক হাজার কোটি টাকা। শতকরা ১০ থেকে ২০ ভাগ কমিশনের ভাগ পেয়েই শত কোটি টাকার মালিক বনে যান নজরুল ইসলাম ও তার দুই সহযোগী।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি ফটিকছড়ি উপজেলা পরিষদে চাকরি করলেও সপ্তাহে এক বা দু’দিনের বেশি যেতেন না। আগের মতই জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। সীতাকুন্ড গ্যাস লাইনের ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের কাছ থেকে কমিশন আদায়ে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। তার দোকানে বসেই লেনদেন চলত। সেখানে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ক্ষত্রিপূরণের কাজ চলছিল। এর সবই ছিল তার হাতে। চার জনের একটি সিন্ডিকেট কমিশন আদায়ের কাজ করছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযানে নেতৃত্ব দানকারী দুদকের সমন্বিত জেলা-২ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক রতন কুমার দাশ জানান, আমরা খবর পেয়েছি নজরুল ইসলাম ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের কাছ থেকে কমিশন আদায় করছেন। তার দোকানে লেনদেন হয়। খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার বিকালে নজরুলের দোকানে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার ও তার কাছ থেকে চেক ও টাকা পাওয়া উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি বলেন, তছলিম উদ্দিনকে এখনো আটক দেখানো হয়নি। তার বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। তিনি এ চক্রের সদস্য কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দোকানের দু’জন কর্মচারীকেও আটক করা হয়েছে।
দুদকের কর্মকর্তারা জানান, ভূমি অধিগ্রহণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ যে টাকা পান, সেই টাকা ছাড় করাতে কমিশন দিতে হয়। আর এ কমিশনের ভাগ অনেকেই পান। সেই কমিশন তোলার কাজটি করতেন নজরুলসহ জড়িত অন্যরা। অগ্রিম কমিশনের অংশ হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে চেক ও টাকাগুলো নেওয়া হয়েছে। তছলিম উদ্দিনও তার সঙ্গে কাজ করতেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নজরুলসহ তিন জন এ চক্রের সদস্য। তারা সকলেই শত কোটি টাকার মালিক। নজরুল ইসলামের শপিং কমপ্লেক্সে তিনটি দোকান রয়েছে। এগুলো হচ্ছে আনুকা, ইয়ানা নামে দুটো কাপড়ের দোকান ও নিচ তলায় একটি খাবারের দোকান। জিইসি মোড় সহ বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাট রয়েছে ৫ থেকে ৭টি। ঢাকায়ও বাড়ি রয়েছে। গ্রামে জমি কিনেছেন ৫০ থেকে ৬০ কানি।
জানা যায়, তার গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তার ফ্ল্যাটে থাকা কোটি কোটি টাকা অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে তার স্বজনরা।