খাস ভূমিতে পুনর্বাসন দাবি

সাতকানিয়ায় শঙ্খে বিলীন হচ্ছে শতাধিক বসতি

শহীদুল ইসলাম বাবর, সাতকানিয়া

34

বড় বড় পাকা দালানসহ শতাধিক বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পথে। নদীতে অর্ধেক তলিয়ে গেছে একাধিক বড় বড় পাকাঘর। ভাঙনের কবল থেকে বসতবাড়ি রক্ষা করতে না পারলেও বাড়িতে রক্ষিত নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি রক্ষার জন্য ঘর থেকে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র বের করে নিচ্ছে অনেকেই। আবার অনেকেই নদী পাড়ে বসে তলিয়ে যাওয়া বসতঘরের দিকে তাকিয়ে ফেলছে দীর্ঘশ্বাস। ঠিক এমনি চিত্র বিরাজ করছে সাতকানিয়ার আমিলাইশ ইউনিয়নের শঙ্খনদের পাড়ে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে আমিলাইশ ইউনিয়নে নদীভাঙন চিত্র সরেজমিন পরির্দশনে গেলে এমন চিত্রই দেখা গেছে।
জানা যায়, ঈদের দুইদিন আগে থেকে বেড়ে যাওয়া ভাঙনের তীব্রতায় মাত্র এক সপ্তাহের কম সময়ে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বেশ কয়েকটি পাকাঘর। এর মধ্যে নদী ভাঙন থেকে রক্ষা পায়নি দ্বিতল বিশিষ্ট পাকাঘরও। আমিলাইশ ইউনিয়নের পূর্ব আমিলাইশ ৩নং ওয়ার্ডের সারওয়ার চেয়ারম্যানের বাড়ি, আনোয়ার বাড়ি, পেন্ডির বাড়ি, রাইত্যার বাড়ি, কুরা সাহেবের বাড়ি, কালুর বাড়ি, বাচার বাড়ির শতাধিক বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে হয়ে গেছে। বিলীনের অপেক্ষায় রয়েছে আরো শতাধিক বসতঘর, মসজিদ, মন্দির, বাজার, স্কুল ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
আমিলাইশের সাবেক চেয়ারম্যান সারওয়ার উদ্দিন চৌধুরী জানান, চলতি সপ্তাহের নদীভাঙ্গনে মো. ইদ্রিস, মো. ইউছুপ, আবুল হোসেন, নাছির উদ্দিন, সহিদ উদ্দিন, সেলিম উদ্দিন, জসিম উদ্দিন, ফোরকান আহমদ, মোহাম্মদ মুছা, আব্দুর রহিম, আব্দুল হালিম, আব্দুল মান্নান, আব্দুল করিম, জাফর হোসেন, মোহাম্মদ হোসেন, জয়নাল আবেদীন, গিয়াস উদ্দিন, সাহাব উদ্দিন, মহিউদ্দিন, আব্দুর রশিদ, আব্দুশ শুক্কুর, রাবেয়া বেগম, মোহাম্মদ হাসান, মোহাম্মদ হানিফ, সামশুল আলম, ইয়াকুব হোসেন, আবছার উদ্দিন, হুমায়ুন কবির, মঈনুদ্দিন, দানু মিয়া, সরওয়ার আলম, ইমাম শরীফ, নুরুল আলম, আহমদ ছফা, জাহাঙ্গীর আলম, আহমদ হোসেন, শহীদুল ইসলাম, শোয়াইব, ফরিদুল আলম, মোহাম্মদ ইদ্রিস, কবির আহমদ, মৃত জমির আহমদ, আব্দুর রহমান, ছালেহ আহমদ, বজল আহমদ, রেহেনা বেগম, জাহাঙ্গীর আলম, আব্দুর রশিদ, মোস্তাফিজুর রহমান, নুর হোসেন, আব্দুল করিম, নুরুল আলম, শফিক আহমদ, জামাল উদ্দিন, সিরাজুল ইসলাম, মোহাম্মদ সিরাজ, মোহাম্মদ আইয়ুব, মোহাম্মদ আমিন, বদিউল আলম, সৈয়দ আহমদ, মোহাম্মদ ইউছুপ, মোহাম্মদ ইলিয়াছ, মোহাম্মদ ইদ্রিস,
মোহাম্মদ হোসেন, সামশুল ইসলাম, আব্দুল করিমসহ আরো বেশ কিছু মানুষের বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়েপড়া মানুষগুলো রাস্তার কিনারায় তাবু টাঙ্গিয়ে কোন রকমে মানবেতর দিনযাপন করছে।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিন পরির্দশনকালে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত বৃদ্ধ জাফর আহমদ বলেন, ‘জীবনে এমন নদী ভাঙন আগে দেখিনি। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ব্যাপক ভাঙনে আমার বসতঘরসহ শতাধিক বসতঘর নদীতে হারিয়ে গেছে। এখন আমি নিঃস্ব, অসহায়, সরকারের সুদৃষ্টি ছাড়া আর কোন উপায় নাই।’
বসতঘর হারানো আবুল হাসেম বলেন, ‘আমার সব কিছু শেষ। এখন আমি নিঃস্ব। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কোথাও মাথা গোঁজার ঠাই নেই। আমরা কোথায় যাব, কোথায় থাকব কিছুই জানা নেই।’
আরেক ক্ষতিগ্রস্ত মোহাম্মদ হাসান বলেন, ‘আমাদের এখানে নদী ভাঙ্গনের সমস্যা আগেও ছিল। কিন্তু এতটা ভয়াবহ নয়। আমরা ১০ কেজি চাল চাই না। নদীভাঙন রোধে স্থায়ী সামাধান চাই।’
নদীভাঙনে বিলীন হওয়া সবচেয়ে বড় ও অত্যাধুনিক বাড়ির মালিক হচ্ছে শহীদ উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমি ব্যাপক সবজি চাষ করতাম। সেই সবজি বিক্রির টাকায় বিশাল আকারের বাড়ি করেছিলাম। উন্নতমানের টাইলসও ছিল। কিন্তু সেই বাড়ি আজ স্মৃতি হয়ে গেছে। এখন আর সেই বাড়ি নেই। হারিয়ে গেছে নদীগর্ভে।’
আমিলাইশ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সারওয়ার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আমার পার্শ্ববর্তী অর্ধ শতাধিক বসতঘর নদীতে হারিয়ে গেছে। নদীতে ঘর হারানো মানুষগুলো একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছে। তাদের শুধু ঘর গেছে তা নয়, তাদের ফসলী জমি, ধানের গোলা, গাছপালাও নদীতে হারিয়ে গেছে। জরুরী ভিত্তিতে তাদের জন্য থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।’
আমিলাইশের বাসিন্দা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য সামশুল ইসলাম বলেন, ‘যে হারে ভাঙন দেখা দিয়েছে তাতে পূর্ব আমিলাইশের ব্যাপক এলাকা নদীতে হারিয়ে যাবে। বাড়িঘর হারানো মানুষগুলো এখন নিঃস্ব। সরকারি খাস জায়গায় তাদের জরুরি ভিত্তিতে পুনর্বাসন করতে হবে।’
ভাঙনের বিষয়ে জানতে চাইলে সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোবারক হোসেন বলেন, ‘ভাঙনের খবর শুনেই আমি সরেজমিন পরির্দশনে গিয়েছিলাম। তখন ১৫টির মত বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছিল। এখন আরো বেশি। এখন ৩০/৪০টা বাড়ি বিলীন হয়ে গেছে বলে শুনেছি। জেলা প্রশাসকের নিকট এ ব্যাপারে রিপোর্ট প্রেরণ করব।’
তাদের জন্য কোন সহায়তা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ১শ পরিবারকে ২ মে. টন চাল বিতরণ করেছি। আরো সাহায্য চাওয়া হয়েছে। প্রাপ্তি সাপেক্ষে তা বিতরণ করা হবে।’
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী বিদ্যুৎ কুমার শাহা বলেন, ‘আমিলাইশসহ এতদঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে ভাঙনের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি। আমিলাইশ এলাকার ভাঙনের বিষয়ে প্রকল্প পাশ হয়ে আছে। এ বর্ষাতে তো আর কাজ করা যাবে না। বর্ষা মৌসুমের পরেই কাজ শুরু হবে। তবে ইমার্জেন্সিতে আমরা কিছু কাজ করার চেষ্টা করব।’