সর্বগ্রাসী অবক্ষয় : প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ ও মানবিক মূল্যবোধের জাগরণ

মোতাহার হোসেন

9

মানুষ যখন অন্যায়, অনাচার, অবিচার, অব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করার শক্তি ও সাহস হারিয়ে ফেলে তখন সমাজের সর্বস্তরে তথা রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিষবৃক্ষ হিসেবে বিস্তার ঘটে অন্যায়, অব্যবস্থা, অবিচার, অপরাধ, অনিয়ম প্রভৃতি। ১৯৭১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নের্তৃত্বে ও আহব্বানে ৭ কোটি বাঙালির ৯৯ ভাগ মানুষ পশ্চিম পাকিস্তানের সরকারের বিরুদ্ধে,তাদের অন্যায়, অবিচার, শোষণ, বঞ্চনা, তাদের দ্বারা বৈষম্য সৃষ্টির বিরুদ্ধে একই সাথে সশস্ত্র পাক জান্তাদের বিরুদ্ধে নিরস্ত্র বাঙালি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি ছিনিয়ে এনেছিল আমাদের স্বাধীনতা। ঠিক অনুরুপভাবে এক রক্তাক্ত আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালি ১৯৫২ সালে মায়ের ভাষা বাংলায় কথা বলার অধিকার আদায় করেছিল। তাই বাঙালির অতীত ইতিহাস গৌরবের,আত্মমর্যাদা বৃদ্ধির আর অহংকারের। যার কারণে বিশ্বে বাঙালিদের বীরের জাতি হিসেবে পৃথিবী ব্যাপী সমাদৃত,পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক কালের কিছু কিছু বিচ্ছিন্ন অথচ, হৃদয়বিদারক, লোম হর্ষক, মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায় এমন ঘটনা ঘটে চলেছে। এসব ঘটনার জন্য যারা ঘটাচ্ছে তারা যেমনি দায়ি, দোষি। ঠিক সমভাবে আমরা সবাই এজন্য অংশত দোষি,দায়ি। আমরা সবাই দোষি বা এ কারণে যে, প্রকাশ্যে সমাজে,সংসারে,দিনের আলোতে একদল ওঠতি তরুণ, যুŸক দলবেঁধে একজন তরুণকে কুপিয়ে হত্যায় লিপ্ত হয় আর হত্যার শিকার তরুণের পক্ষে তার সহধর্মিনী একাই মাঠে অস্ত্রধারীদের সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছেন তার স্বামীকে বাঁচাতে। আশপাশে অন্য পথচারিরা নিকটে, অদূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু দর্শক হিসেবে, উৎসুক দর্শক হিসেবে এই নির্মমতা, পৈশাচিকতা, অমানবিক তান্ডবলীলা প্রত্যক্ষ করছে সেখানে এই মহাঅন্যায়ের বিরুদ্ধে,পৈশাচিকতার বিরুদ্ধে, তান্ডবলিলার বিরুদ্ধে সম্মিলিত সামাজিক শক্তির নিলিপ্ততায় ঘটনার ভয়াবহতার চেয়ে উদ্বেগের,উৎকন্ঠার আর কি হতে পারে ? ঐ ফেশাচিকতায় যারা জড়িত,যারা ঘটনা ঘটাচ্ছে তারা যদি ঘটনাস্থলে প্রতিরোধের মুখে পড়তো তা হলে সেদিন অন্য কিছু লেখা হতো। প্রতিটি পরিবার থেকে এসমব নিয়ে তাদের নিজ নিজ সন্তান, আত্নীয়, বন্ধু, স্বজন, প্রতিবেশীদের শাসন, খবরদারী, নজরদারি না থাকায় এ ভাবে বহু নয়ন বন্ডদের উত্থান ঘটেছে পরিবারে, সমাজে, পাড়ায়, মহল্লায়। এজন্য যেমনি পরিবারের প্রধান, কর্তা ব্যক্তি, সমাজপতি, মুরুব্বিরাও সমাণ ভাবে দায়ি। তবুও কথা থাকে এসব অন্যায়, অনিয়ম, অব্যবস্থা, সন্ত্রাস, সহিংসতা, চাঁদাবাজি, মাস্তানী, ইয়াবা ব্যবসা, ইয়াবাহসহ যাবতীয় মাদক সেবন, মহিলা, নারীদের উত্ত্যক্ত করা, হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, গুম, খুন, অন্যের জমি, ব্যবসা, বাড়ি, দোকান দখল প্রভৃতি অপরাধ-অপকর্মে জড়াতে সাহস পাচ্ছে। কিন্তু এসব অনাচার, অব্যবস্থা, হত্যা, ধর্ষণ,নারী নির্যাতন প্রভৃতির মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধির নেপথ্যে সামাজিক শক্তির নির্লিপ্ততা, প্রতিরোধহীন এক কথায় অপ্রতিরোধ্যভাবে এই নরপশু রূপি তরুণদের রামদাও দিয়ে উপর্যুপরি কুপিয়ে অপর তরুণকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে দুঃসাহস দেখাবার সাহস দেখাতে সক্ষম হয়েছে। আর একটি কথা অনস্বীকার্য যে, এক দিনে বা রাতারাতি এই নয়ন বন্ডদের উত্থান ঘটেনি। এজন্য ধীরে ধীরে নয়ন বন্ড একজন অদি সাধারণ তরুণ,যুবক থেকে স্থানীয় রাজনৈতিক, প্রভাবশালী চক্র এবং আইন-শৃংখলা বাহিনীর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহায়তায়, আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে, মদদে, ইন্দনে অনেকটা বীরের দর্পে প্রশাসন, পুলিশ এবং জনসমক্ষে দাবড়িয়ে বেড়ায়। অপকর্ম, অপরাধ, অনিয়নম, তান্ডব, হত্যা রাহাজানি, চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ যাবতীয় অপকর্ম করে চলে। এইভাবে দেশের সর্বত্র পাড়ায় মহল্লায়, অলিতে গলিতে অসংখ্য নয়ন বন্ড,সন্ত্রাসী গ্রুপ, সংঘবদ্ধ বাহিনী গড়ে ওঠেছে। যা সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধি, মাতব্বর, মসজিদের মুসল্লি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান, শিক্ষক, রাজনীতিক, স্থানীয় প্রশাসন, স্থানীয় সকলেই অবগত, অবহিত। অংশত এ হিসেবে এ ভাবে গড়ে ওঠা কথিত নয়ন বন্ড বা এক এলাকায় একেক নামে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী গ্রুপ সম্পর্কে, তাদের অপরাধ, অপকর্ম, তান্ডব সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে ভক্তভোগীদের পক্ষ থেকে, আক্রান্তদের পক্ষ থেকে স্থানীয় পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পাড়ার মাতব্বরের কাছে নালিশ বা অভিযোগ বা বিচার চেয়েও তা পায়না। উপরন্ত বিচার প্রার্থীসহ তার পরিবারকে ঘর ছাড়া, গ্রাম ছাড়া করা, প্রাণনাশের হুমকীকে আতংকের জীবন যাপন করতে হয়। সেখানে প্রতিকারহীন, বাধাহীনভাবে এভাবে নয়ন বন্ডদের উত্থান ঘটে। পাশাপাশি এই ধরনের অপকর্ম, অপরাধ, সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের মাত্রা, ব্যাপকতা, বিস্তৃতি পায় অতিমাত্রায়, উদ্বেগজক হারে। এরই ধারাবাহিকতায় ঘটলো বরগুনার এই পৈশাচিক হত্যাকান্ড। যারা সংঘবদ্ধ হয়ে এই অপরাধ করেছে, করছে তারা উন্মাদ, অমানুষ, বর্বর, ভয়ঙ্কর অপরাধী, দর্শক হিসেবে আমরাও মানসিকভাবে এই দায় এড়াতে পারিনা। আমরা গণমাধ্যম তথা সংবাদপত্রের সঙ্গে যারা জড়িত তারা প্রতিদিন হত্যা, খুন, জখমের খবর কম্পাইল করতে করতে ক্লান্ত, অসুস্থবোধে আক্রান্ত হয়ে পড়ি। আমরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করছি প্রতিদিন খুনিরা অভিনব কায়দায়, অভিনব পদ্ধতিতে একের পর এক খুন করে চলেছে। ফেনীর নুসরাতকে হাত-পা বেঁধে, শরীরে কেরোসিন ঢেলে, আগুন দিয়ে পোড়ানো হয়েছে,একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে ঢাকার অদূরে নরসিংদীতে, বরিশালে, পঞ্চগড়ে।
চিহ্নিত এক সন্ত্রাসীর প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় সন্ত্রাসীর সহযোগিরা সংঘবদ্ধ হয়ে পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করার পর সেই হত্যাকান্ডকে আবার ‘আত্মহত্যার’ ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দেয়ার সমস্ত আয়োজনও সম্পন্ন করা হয়েছে। তাদের এই আয়োজনে স্থানীয় সংবাদ কর্মীরাও প্রাথমিক ভাবে একই ধারণা পোষণ করে। এমনকি খুনিদের পক্ষে আদালতে এ সাফাই গেয়েছে খুনিদের আইনজীবী পর্যন্ত। একইভাবে বরগুনায় রিফাতকে প্রকাশ্যে হত্যাকারীরা ফেসবুকে চরিত্রহনন করছে রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির। খুনের যে বহ্ন্যৎসব চলছে তাতে আতঙ্কিত না হয়ে উপায় নেই, আতংকিত হয়েছে পুরো সমাজ, রাষ্ট্র, জাতি। রিফাত হত্যার রক্তের দাগ না শুকাতেই চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে এক যুবলীগ নেতাকে প্রতিপক্ষের যুবলীগ নেতারা প্রকাশ্যে পিটিয়ে আহত করে। পরে প্রতিপক্ষের হামলাকারিরা তাকে মৃত ভেবে ফেলে চলে যায়। পরে এই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। এরি মধ্যে সাতক্ষীরার কেশবপুর মঙ্গলকোটের অটোরিকশাচালক শাহীনকে হত্যার উদ্দেশ্যে কুপিয়ে তার রিকশা ছিনতাই করে নিয়ে গেছে খুনিরা। মাত্র ১৪ বছরের একটা ছেলে যে তার অভাবের সংসারের ভার গোটাটাই তুলে নিয়েছে নিজের কাঁধে। তার উপার্জনের একমাত্র অবলম্বনটি ছিনিয়ে নিতে খুনিরা যাত্রী সেজে তার রিকশা ভাড়া করেছিল। শাহীন এখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে ঢাকা মেডিকেল কলেজের আইসিইউতে। সংজ্ঞাহীন হওয়ার আগে শাহীনের শেষ বাক্য- ‘এত করে কলাম আমারে মারিস না।’ ওরা কয়, ‘তোর নিস্তার নেই।’ খুনিদের বলা শব্দ তিনটি যেন সব খুনির জবানবন্দি তাদের শিকারদের উদ্দেশে- ‘তোর নিস্তার নেই।’এই আপ্ত বাক্যের মধ্য দিয়ে পুরো সমাজ,রাষ্ট্র ও দেশের সকল মানুষকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে বলা,‘‘তোর-তোদের নিস্তার নেই।’ একই সাথে সারা দেশে উন্মত্ত খুনিরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে আর জানিয়ে দিচ্ছে ‘নিস্তার নেই’, ‘নিস্তার নেই।’ এই নিয়তি শুধু নুসরাত, রিফাত শাহীনের নয়, আমাদের সকলের। মহান মুক্তি যুদ্ধে,মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে দেশের ত্রিশ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছিলেন দেশের এ অবস্থার জন্য নয়। তাদের সকলের স্বপ্ন ছিল একটি সুখী,সমৃদ্ধ,শান্তিকামি,উন্নত বাংলাদেশের জন্য। অথচ ঘটছে উল্টো ঘটনা প্রবাহ। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কবিতা প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়েছে, তিনি লিখেছিলেন- ‘ওরা সুখের লাগি চাহে প্রেম/প্রেম মেলে না, শুধু সুখ চলে যায়।’ প্রেমে, ক‚প্রস্তাবে, দৈহিক অবৈধ সম্পর্কে, কুমতলবের ডাকা নুসরাতের সাড়া না পেয়ে চিরতরে তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিলো তারা বাস্তবে নুসরাতকে পেলোই না বরং তাদের বিরুদ্ধে হত্যা প্রমাণ হলে কারো কারো ফাঁসিতে ঝুলতে হতে পারে। বোঝা যায় আদালতে সাক্ষী দিতে এসে তাদের যে আস্ফালন নিহত নুসরাতের পিতা ও ভাইয়ের প্রতি তা আরো বেদন দায়ক,কষ্ট দায়ক। অর্থাৎ মনুষ্যত্বের কোনো বোধ এই খুনিদের মাঝে নেই। কাউকে খুন করলে তার পরিবার, প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন সর্বোপরি দেশের মানুষের মনে কী প্রতিক্রিয়া হয় তা উপলব্ধির বিন্দু পরিমাণবোধ, বিবেক তাদের আছে বলে মনে হয় না। আর তা নেই বলেই আমরা দেখি যে, মাদকাসক্ত ব্যক্তি জামিনে ছাড়া পেয়ে বের হয়েই আবার থানায় গিয়ে হাজির হয় জ্যান্ত মানুষের মুন্ডু কেটে নিয়ে- এমন নৃশংসতার নজির আছে।
আমেরিকান কবি মায়া অ্যাঞ্জেলুর মতে, ‘আমরা যখন পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসা হারিয়ে ফেলি, তখনই আমাদের চূড়ান্ত মৃত্যু হয়।’ মৃত্যুকে চমৎকারভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন তিনি। মৃত্যু সম্পর্কে কবির সংজ্ঞা অনুযায়ী এ কথা আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি বর্তমানে আমরা এক ‘বিবেকহীন,বোধহীন মৃত সমাজে’র বাসিন্দা। আমাদের প্রাজ্ঞ ঋষি স্বামী বিবেকানন্দ প্রতিটি মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের সন্ধান পেয়েছিলেন। তাই তিনি বলেছিলেন, ‘জীবে দয়া করে যেজন সেজন সেবিছে ঈশ্বর।’ অর্থাৎ জীবকে দয়া,প্রেম করলে স্রষ্টাকে পাওয়া যায়। আর আমাদের এই জামানায় ওঠতি তরুণ-তরুণী-যুবক-যুবতী মানবতার শ্রেষ্ঠ ধর্ম মানব প্রেম,মানব সেবার মধ্য দিয়ে যেখানে স্রষ্টাকে সেবার কথা তানা করে উল্টো বিপদগামী হচ্ছে। স্রষ্টার সৃষ্টি শ্রেষ্ঠ মানুষ একে অন্যকে হত্যায়-নৃশংসতায় লিপ্ত হচ্ছে,নেশায় লিপ্ত হচ্ছে, বর্বরতায় লিপ্ত হচ্ছে। এই বৈরি পরিবেশ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ জরুরি। এ জন্য প্রয়োজন পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে কঠোর বিধি বিধান, নীতি নৈতিকতার চর্চ্চা,ধর্মীয়, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অনুসরণ, অনুকরণ। প্রয়োজন এসবের বিরুদ্ধে ব্যাপক জন সচেতনতা। পাশাপাশি সামাজিক এই অবক্ষয় রোধে পাড়া, মহল্লা, শহর বন্দর, গ্রাম অব্দি নাগরিক কমিটি,কমিউনিটি পুলিশিং, নিকটস্থ থানা পুৃলিশ, প্রশাসন, রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, জনপ্রতিনিধির সমন্বয়ে তদারকি এবং প্রকাশ্যে এসব চক্রকে প্রতিহত করা ,প্রতিরোধ দূর্গ গড়ে তোলা। পাশাপাশি এবং এসব কাজে লিপ্তদের থানায় সোপার্দ করা এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারকে সামাজিকভাবে বয়কট ও প্রত্যাখ্যাণ করা। এসব করতে ব্যর্থ হলে এই খুনিদের দায়ের কোপ থেকে কোনোভাবেই আমাদের ‘নিস্তার’ লাভের সম্ভাবনা নেই! আমরা অতীতের খুনি ইমদু’র কথা জানি- মানুষের কাটামুন্ডু নিয়ে যে কিনা ফুটবল খেলত। আমরা জানি খুনি এরশাদ শিকদারের কথা। যে প্রতিটি খুনের পর দুধ দিয়ে গোসল করত পবিত্র হওয়ার জন্য। আমরা তাদের শেষ পরিণতিও জানি। ফাঁসির কাষ্ঠে এদের মৃত্যু সত্তে¡ও ঠেকানো যাচ্ছে না নুসরাত, রিফাত, শাহীনের খুনিদের উদ্ভব,তান্ডব,ভয়ংকর অপকর্ম। এ ক্ষেত্রে আরেকটি কথা বলা প্রাসঙ্গিক যে, আগে কোথাও কেউ আক্রান্ত হলে মানুষ আক্রান্ত মানুষটিকে রক্ষা করতে এগিয়ে যেতেন,চেষ্টা করতে প্রাণ রক্ষা বা বিরোধ মেটানোর; তারপর বিচার-আচার। আর এখন কোনো এলাকায় অচেনা একজন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী কিংবা মানসিক রোগীকে ঘুরতে দেখা গেলে ‘চোর সন্দেহে’ পিটিয়ে মারার কর্মযজ্ঞে সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে গণখুনের উৎসবে মেতে ওঠে। একই ভাে ব টাকার লোভে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করে শিশুদের নির্মমভাবে হত্যা করছে আত্মীয়স্বজন তথা আপন মানুষরা। এমনই ঘটছে; কারণ আমরা একে অপরের ওপর শ্রদ্ধাবোধ হারিয়ে ফেলেছি। এসব লক্ষণই হচ্ছে ‘‘সামাজিক,মানবিক মূল্যবোধের অধ:পতন’’। এ ক্ষেত্রে সমাজ বিজ্ঞানীদের মত হচ্ছে, যৌথ পরিবারে ভাঙ্গন, ফেসবুক, ইমো, ইন্টারনেট প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তার,এর অপব্যবহার,সর্বনাশা মাদক,ইয়াবার বিস্তার,ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে ক্রমশ দূরে সরে আসা প্রভৃতি দায়ি। এক কথায় ‘মাদকাসক্তি’র সঙ্গে এখন ‘নেট আসক্তি’কে ‘ভার্চুয়াল আসক্তি’রূপে শনাক্ত করা হচ্ছে । ‘নেট আসক্তি’ ‘মাদকাসক্তি’র চেয়েও ভয়াবহ এবং ক্ষতিকর বলে অনুভূত হচ্ছে। অথচ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নানা আবিষ্কার উদ্ভাবন হয়েছে মানবকল্যাণের লক্ষ্যে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আমরা সেটা ব্যবহার করছি বিপরীত এবং নেতিবাচক কাজে। এর ফল হচ্ছে বর্তমানে সৃষ্ট সামাজিক অস্থিরতা। অবশ্য এর নেপথ্যে আরো বহু কারণ আছে তমধ্যে আমরা শিশুদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছি খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক মঞ্চ। তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছি বইয়ের বোঝা আর জিপিএ ফাইভের দৌড়। পাশাপাশি তাদের হাতে তুলে দিয়েছি অত্যাধুনিক ‘স্মার্টফোন’। এই স্মার্ট ফোনে ভার্চ্যুয়াল দুনিয়ার,তথা রঙ্গিন দুৃনিয়ায় প্রবেশ করে বিপদগামী হচ্ছে সম্ভাবনাময় তরুণ, যুবশক্তি।
শুধু তাই নয়, তারা পরবর্তী প্রজন্মের দ্রুতগতির স্মার্টফোনের জন্য মানসিকভাবে তৃষ্ণার্ত বুভুক্ষু হয়ে থাকছে কখন সেটা বাজারে আসবে আর তারা তাতে খেলবে ভার্চ্যুয়াল গেম ব্লু হোয়েল, অ্যান্ড গেম প্রভৃতি। আমরা হারিয়ে ফেলছি আমাদের সন্তানদের সঙ্গে পারস্পরিক যোগসূত্র। পরিবারের ভেতরেই সম্পর্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে ভোক্তার ক্রেতার মতো কৃত্রিম। পুরোনো দিনে শিশুরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গান করত, নাটক করত, আবৃত্তি করত, আঁকা শিখত, খেলাধুলার মধ্য দিয়ে সুস্থ ও সৃজনশীল কাজে সময় কাটাতো এখন তারা সময় কাটাচ্ছে ভার্চ্যুয়াল জগতে স্মার্ট ফোনে,বন্ধুদের সঙ্গে বাজে কাজে,বাজে নেশায়,ইয়াবায় মত্ত হচ্ছে,লিপ্ত হচ্ছে সামাজিক নানা রকম অনাচারে। এই শ্রেণীর তরুণ-তরুণী-যুবক-যুবতীদের কাছে বড়দের শ্রদ্ধা-সম্মান জানানো, ছোটদের আদার হে করা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, মানবতা, মানবিকতার বালাই নেই। এজন্য সরকারের-প্রশাসনের, আইন-শৃংখলা বাহিনীর যেমনি গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রয়েছে তেমনি, শিক্ষক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার, রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, জনপ্রতিানিধি, মসজিদের ইমাম, পুরোহিতসহ আসুন আমরা সম্মিলিতভাবে জনপ্রতিরোধে গড়ে তোলার পাশাপাশি এর বিরুদ্ধে দেশব্যাপী জনসচেতনতা গড়ে তুলি। পাশাপাশি শিশু, তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতীদের মধ্যে ধর্মীয় মূল্যবোধ, মানবতাবোধ, মানব প্রেম, মানব কল্যাণমূলক কর্মসূচিতে অনুপ্রাণিত, উৎসাহিত করি। তবেই সম্ভব সামাজিক এই অবক্ষয়-মানবিক এই অবক্ষয় থেকে পরিত্রাণ।

লেখক : সাংবাদিক, কলাম লেখক