সময় সচেতন ইমতিয়াজ, কিন্তু…

লিটন দাশগুপ্ত

6

ইমতিয়াজ এর সময়ানুবর্তিতা সম্পর্কে অনেকের জানা নেই, জানা থাকারও কথা নয়। তবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত অধিকাংশ শিক্ষক, ইমতিয়াজ এর সময় সচেতনতা সম্পর্কিত বিভিন্ন ঘটনা কম বেশী অবগত আছে। যদিও ইমতিয়াজকে অনেকেই এখনও পর্যন্ত চিনেনা। ইমতিয়াজ মানে সেই এলডিজি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন নিয়োগ প্রাপ্ত সহকারি শিক্ষকের কথাই বলছি। শৈশব হতে শহরে বড় হওয়া ইমতিয়াজ, সরকারি ভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে স্থায়ী ঠিকানা অনুযায়ী ‘অচীনপুর’ গ্রামের এই ‘এলডিজি’ নামক প্রাইমারি স্কুলে যোগদান করে। বন্ধু বান্ধব ও আত্মীয় স্বজনসহ সকলে ইমতিয়াজের সময় সচেতনতা সম্পর্কে ভালো ভাবে অবগত আছে। কারণ কাউকে কোন সময় দিলে নির্দিষ্ট সময়ের আগে পৌঁছে যায় ইমতিয়াজ। এমনকি দেরী হবার ভয়ে, প্রয়োজনে আধঘন্টা বা আরো বেশী সময় আগে বাইরে এসে ঘোরাফেরা করে, নির্দ্দিষ্ট সময়ে নির্দ্দিষ্ট স্থানে গিয়ে উপস্থিত হত। এই জন্যে বন্ধু বান্ধবদের মধ্যে, একে অন্যকে কোন অনুষ্ঠানে বা সভায় আগমন সম্পর্কে, কথায় কথায় বলতো এতটার সময় আসবে মানে বাংলাদেশী সময় হিসাবে নয় ‘ইমতিয়াজ টাইম’ হিসাবে আসতে হবে। অর্থাৎ ‘জাস্ট টাইম’ একেবারে ‘নো কমপ্লেইন’। এই ইমতিয়াজ এলডিজি স্কুলে যোগদান করার পর, সময়মত বিদ্যালয়ে আগমন প্রস্থান, শ্রেণি কার্যক্রমে অংশগ্রহনসহ প্রতিটি কাজে স্বভাবতই যথাযথ ও সুনির্দ্দিষ্ট সময় মেনে চলে আসছে।
সেই দিনের একটি ঘটনার কথা বলি। সেই দিন মানে গত অক্টোবর মাসের প্রধানশিক্ষকদের মাসিক সমন্বয় সভার কথা। ঐ মাসের সমন্বয় সভায় এলডিজি স্কুলের প্রধানশিক্ষক বেনজীর আহমেদ সাহেব জরুরী পারিবারিক কাজে নৈমিত্তিক ছুটিতে থাকায়, ইমতিয়াজকে সমন্বয় সভায় যাবার দায়িত্ব দেয়। প্রথমে নতুন শিক্ষক হিসাবে ভয়ে অপারগতা প্রকাশ করলেও হেড স্যারের বিশেষ অনুরোধে শেষ পর্যন্ত যেতে বাধ্য হয়। একই সাথে প্রধানশিক্ষক বেনজীর আহমেদ সমন্বয় সভায় কখন কিভাবে কি নিয়ে যেতে হবে, নতুন শিক্ষক হিসাবে সব ধরণের নির্দেশনা দিয়ে দেয়। সেই হিসাবে পরের দিন ইমতিয়াজ সাহেব সকাল ৯টার আগে সভাকক্ষে পৌঁছে যায়। কারণ প্রধানশিক্ষক বলেছে, সাড়ে ৯টায় সমন্বয় সভা শুরু হয়। এদিকে সভাকক্ষে বসতে বসতে, অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে অনেকক্ষণ পর দেখা গেল ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে দুয়েকজন করে শিক্ষক ধীরে ধীরে আসতে শুরু করেছে, তখন সময় ১১টা। সমন্বয় সভায় আগত প্রধানশিক্ষক ভারপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষকগণ নতুন এই শিক্ষককে দেখে বার বার তাকাচ্ছিল আর হাসছিল। ইমতিয়াজ প্রথমে ভাবছিল, নতুন শিক্ষক তাই সবাই তাকাচ্ছে। পরে কিন্তু বুঝতে পারল ব্যাপারটা তা নয়। কারণ তাদের দেখার অবস্থা এমন, যেন চিড়িয়াখানায় ‘বান্দর’ দেখার মত! শেষপর্যন্ত পদার্থ বিজ্ঞানের ¯œাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করা উচ্চশিক্ষিত ইমতিয়াজ নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করে নিল। অর্থাৎ টাইকোট পরে আসায় অন্যান্য শিক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ ও কটাক্ষ করার কারণ। যাক শেষ পর্যন্ত সভা শুরু হল, তখন ঘড়িতে সময় দেখল দুপুর সাড়ে বারোটা।
এর পরের দিন স্কুলে এসে অন্যান্য শিক্ষকদের সাথে সমন্বয় সভায় আলোচিত বিষয়সমূহ শিক্ষকদের মধ্যে আলোচনা ও সমন্বয় করতে থাকে। একই সাথে তরুণ এই শিক্ষক অভিনয়ের মাধ্যমে সেই সমন্বয় সভার ঘটনা উপস্থাপন করে অন্যান্য শিক্ষকদের হাসাতে থাকে। সে বলে, ‘আমরা এখানে স্কুলের শিক্ষক, আর সমন্বয় সভার ক্লাসে গিয়ে সবাই ছাত্রছাত্রী হয়ে গেলাম। তারপর টিইও হয়ে গেল প্রধানশিক্ষক আর এটিইও’রা হয়ে গেল সহকারি শিক্ষক। এরা ক্লাসে (মিটিং-এ) এসে একমুখী ভাবে লেখাপড়া শিখায়ে যাচ্ছিল আমাদের মত শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদেরকে। একেবারে সেকালের ‘জগ-মগ থিউরি’র মত। দুইটার সময় শব্দহীন ছুটির ঘন্টা বাজে। পড়ার সময় (মিটিং) দেখলাম মাঝে মধ্যে এরা আমাদের মত বুড়ো ছাত্রছাত্রীদের বকাবকিও করছে। কথাবার্তা হাবভাব দেখে মনে মনে ভাবছিলাম, শিক্ষকদের পিটানোর জন্যে বস’রা কোন বেত বা কঞ্চি টঞ্চি নিয়ে এলো কিনা! এটা নাকি সমন্বয় সভা! এটাকে সমন্বয় সভা না বলে ‘ক্লাস ফর টিচার’ বললে সমীচীন হত।’ অন্যান্য শিক্ষকরা তার কথা শুনে হাসতে থাকে।
এইতো গেল সেইদিন সমন্বয় সভায় সমন্বয়ের কথা। এর মাস দুয়েক পর, চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামে শুরু হল বিভাগীয় পর্যায়ে আন্তঃবিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু ফুটবল টুর্ণামেন্ট এর ফাইন্যাল খেলা। সেই দিন ছিল ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম স্কুল বন্ধের দিন। সকাল ৭:৩০ মিনিটে স্টেডিয়ামে পৌঁছতে হবে প্রধান শিক্ষক বলে দেয় ইমতিয়াজ’কে এবং উপস্থিতির স্বাক্ষর নেয়া হবে বলে জানায়। একইসাথে উর্দ্ধতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত থাকবেন, কোন ক্রমেই দেরী করা যাবেনা বলে দেয়। বিষয়টির গুরুত্ব ভালোভাবে বুঝানোর ফলে ইমতিয়াজ ঐদিন যথাসময়ের অনেক আগে পৌঁছে যায় চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামে। কিন্তু গিয়ে দেখে, কোনখানে জনমানব নাই! শীতের সকালে কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছে চট্টগ্রাম স্টেডিয়াম। এই দিকে স্টেডিয়ামের ভিতর ঢুকতে যাবার চেষ্টা করলে কুকুর একটা ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে আসে।
এই অবস্থায় এক পর্যায়ে দৌড়ে কুত্তা’র আক্রমণ থেকে বাঁচতে গিয়ে সামনে থাকা ড্রেনে লাফ দিতে বাধ্য হয়। ড্রেনে পড়ে কামড় থেকে রক্ষা পেল বটে, কিন্তু নোংড়া ময়লার আবর্জনার মধ্যে জুতা পেন্ট রক্ষা করা গেলনা। ড্রেনে জুতা একটা হারিয়ে গেল। অনেক চেষ্টার পরেও ড্রেন থেকে জুতাটা উদ্ধার করা গেলনা। রাগে ক্ষোভে শেষপর্যন্ত খুঁজে পাওয়া জুতোটাও ঐ ড্রেনে ফেলে দেয়। নিজের সময় জ্ঞান সম্পর্কে নিজেই প্রশ্ন তুলল। নিজেকে অসহায় ভাবতে লাগল। একই সাথে নিজেকে বোকা ও অজ্ঞানী মনে হল। কারণ সমন্বয় সভায়ও দেখা গেল একই অবস্থা। তাছাড়া বিভিন্ন দিবস পালনেও একই অবস্থা। এখানেও আসার ক্ষেত্রে দেখা গেল সবাই এক রকম, কেবল নিজে কেমন জানি অন্য রকম! ভাবতে থাকে কোনটি ‘সঠিক’ কোনটি ‘বেঠিক’। যথাযথ দায়িত্ব পালন, যথাসময়ে আগমন সঠিক; নাকি দেরীতে আসা বা উপস্থিত হওয়া সঠিক! এই সময় পত্রিকার হকার একটা দেখে পত্রিকা একটা কিনে নেয়। সময় কাটানোর জন্যে একপাশে বসে পত্রিকাটি পড়তে লাগল। বিভিন্ন সংবাদ পড়তে পড়তে, নিজের বিষয় ভাবতে ভাবতে ঘড়িতে সাড়ে দশটা বাজল। এমন সময় দুয়েকজন শিক্ষকের দেখা মিলল। এরই মধ্যে সাতকানিয়া উপজেলার সরোজ চক্রবর্তী নামে জনৈক শিক্ষকের সাথে পরিচয় হল। তাকে পুরো ঘটনা বুঝিয়ে বলল।
বন্ধুত্ব হবার পর সরোজ বাবু থেকে ইমতিয়াজ জানতে চাইল, সাতকানিয়া থেকে তাদের কয়টায় আসতে বলা হয়েছে?
সরোজ বলল, ‘সাড়ে সাতটার সময়ে পৌঁছতে হবে বলেছে।’
ইমতিয়াজ অবাক হয়ে জানতে চাই, ‘তাহলে সাড়ে দশটায় আসলেন কেন?’
সরোজ বলে, ‘এখানে একটা কাজ থাকাতে সাড়ে দশটায় এসেছি, না হলে আরো দেরীতে আসতাম।’
ইমতিয়াজ আরো অবাক হয়ে বলে, ‘আপনাকে আসতে বলা হয়েছে সাড়ে সাতটায়, আপনি এলেন সাড়ে দশটায়! তাও আবার বলছেন কাজ থাকাতে অন্যথায় আরো দেরীতে আসতেন! মানে তো বুঝলাম না ভাই’
সরোজ মাস্টার বলে, ‘যদি তাদের কথা মত সকাল ৭ টায় আসতাম, তাহলে আপনার মত জুতা হারাতে হত। তবে ভাগ্য ভালো আপনার, কারণ আপনি জুতা হারিয়েছেন, পা কিন্তু হারাননি! কারণ যে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছেন।’
এই দিকে সরোজ চক্রবর্তীর পূর্বপরিচিত, পটিয়ার আর একশিক্ষক আয়াতউল্লাহ সাহেব এসে তাদের সাথে যোগ দিল। তাদের মধ্যে কথার প্রসঙ্গে বিভিন্ন কথা চলে এল। কথা বলতে বলতে ইমতিয়াজকে সান্তনা দিতে লাগল, ‘পায়ে আঘাত পেয়েছেন, জুতা হারিয়েছেন ভাই তাতে কি হয়েছে! ভাগ্য ভালো নালাতে যে ভাবে জাম্প দিয়েছেন বলছেন, পা-ও হারানোর সম্ভাবনা ছিল।’
এদিকে তাদের দুজনের সাথে বন্ধুত্ব হবার পর ইমতিয়াজ সরলতার সাথে কথার প্রসঙ্গে জানতে চাইল, ‘প্রাইমারির বিভিন্ন কার্যক্রমে যে সময় নির্ধারণ করা হয়, নির্ধারিত সময়ের কত ঘন্টা পর অনুষ্ঠানে বা সভায় উপস্থিত হতে হয়?’
আয়াত উল্লাহ মাস্টার হেসে বলল, ‘অনুষ্ঠানের গুরুত্বের উপর নির্ভর করে এবং পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অনুমান করে কখন আধ ঘন্টা, কখনো এক-দুই ঘন্টা বা তিন ঘন্টা এই রকম আরকি!’
ইমতিয়াজ বলে, ‘যেমন’।
আয়াত উল্লাহ বলে, ‘যেমন- স্কুলে আগমন সময় সকাল ৯ টা, আপনি দুই ঘন্টা দেরী করে ১২ টার সময়ে পৌঁছলে তো আর হবেনা; তখন নিজের চাকুরীর বারোটা বেজে যাবে। বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।’
এরপর সরোজ চক্রবর্তী বলে, ‘যেমন-ধরুন আজকের বিষয় সম্পর্কে আপনাকে উদাহরণ দিয়ে বলতে পারি; প্রধানশিক্ষক আমাদের বলেছেন ৭:৩০ মিনিটে আসার জন্যে। সেটা আপনাকে গাণিতিক ভাবে হিসাব করতে হবে; আর এই হিসাব উৎস বা মূলজায়গা থেকে শুরু করে নিতে হবে।’
ইমতিয়াজ বলল, ‘বিষয়টি বুঝলাম না ভাই।’
সরোজ বাবু বলে, ‘যেমন আপনাকে ভাবতে হবে, যেহেতু বিভাগীয় উপ-পরিচালক বা ডিডি স্যার উদ্বোধন করবেন, তাই অনুমিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ধরে নিলাম ১২ টায় উদ্বোধন। নিশ্চয় তিনি স্বাভাবিক ভাবে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে বলেছেন, সকল শিক্ষক সাড়ে ১১টায় উপস্থিত থাকতে হবে।
এইদিকে জেলা শিক্ষাকর্মকর্তা ভাবছেন, সাড়ে ১১টায় প্রাথমিক শিক্ষককে আসতে বললেও কোনক্রমেই যথাসময়ে আসতে পারবেনা। তাই তিনি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে বললেন, সকাল ১০টায় শিক্ষকদের উপস্থিত থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।
এইদিকে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা চিন্তা করল, জেলা থেকে নির্দেশনা আছে ১০ টায়, তা কোনক্রমে শিক্ষকদের বলা যাবেনা, কারণ তারা গ্রাম থেকে ১০টায় শহরে আসতে বললে কখনো জাস্ট টাইমে আসতে পারবেনা। তাই তিনি সহকারি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের বলেন, স্কুলে আগমন সময় অনুযায়ী অর্থাৎ ৯ টার সময় সকল শিক্ষক স্টেডিয়ামে পৌঁছতে হবে। সেই হিসাবে সংশ্লিষ্ট এইউইও’দের নিজ নিজ ক্লাস্টারের শিক্ষকদের জানিয়ে দেবার নির্দেশনা দিলেন।
সহকারি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (এইউইও) একইভাবে ভাবলেন, একে তো বন্ধের দিন, তাছাড়া দেরী হলে উর্দ্ধতন কর্মকর্তাগণ ভাববেন এইভাবে দেরী করে স্কুলে আসে, স্কুল মনিটরিং হয়না। বাপরে বাপ, শিক্ষকদের সঠিক কথা বলা যাবেনা, আমরা এইউইও’রা শিক্ষকদের হাড়ে হাড়ে চিনি। এদের বলতে হবে একঘন্টা সময় এগিয়ে অর্থাৎ সকাল ৮ টায় স্টেডিয়ামের গেইটে হাজির হতে হবে বলব। এছাড়া আরো একটু বাড়িয়ে বলতে হবে উপস্থিতির স্বাক্ষর নেয়া হবে। সহকারি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার যেমন ভাবনা তেমন কাজ, সেই ভাবনা মোতাবেক প্রধানশিক্ষকদের বলে দিলেন গুরুত্বসহকারে।
এইদিকে হেডমাস্টার সাহেবও একই ধরণের ভাবনার বাইরে নয়। তিনিও ভাবলেন, বিদ্যালয় থেকে তিনজন শিক্ষক স্টেডিয়ামে পাঠাতে বলেছে। বিদ্যালয়ে বেশীর ভাগ শিক্ষক মহিলা, তাছাড়া শীতকাল, আবার গ্রাম থেকে শহরে যাওয়া। তাই সঠিক সময়ের সেই সত্য কথা বললে কাজ হবেনা। সহকারি শিক্ষকদের নিয়ে একসাথে স্কুলে কাজ করি আসা যাওয়া করি, আমার চেয়ে আর কেবা বুঝে বেশী? তাছাড়া গাড়ির রাস্তা জ্যাম হতে পারে, তাই তিনি শিক্ষকদের সাড়ে ৭টায় স্টেডিয়ামে উপস্থিতি হয়ে স্বাক্ষর করে প্রবেশ করতে হবে বলে জানিয়ে দেন। এইভাবে নির্ধারিত সময় পরিবর্তিত হয়ে, ধাপে ধাপে সামনের দিকে এগিয়ে, সহকারি শিক্ষকদের কানে আসে।’
সরোজবাবুর এই কথা’র সাথে তালমিলিয়ে আয়াতউল্লাহ মাস্টার বলে, ‘একদম ঠিক কথা, এইভাবে হিসাব নিকাশ করে আপনাকে সঠিক সময় খুঁজে বের করতে হবে বা নির্ধারণ করতে হবে।’
এরপর ইমতিয়াজ হাই তুলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘অনেক দিন পর বুঝলাম প্রাথমিক শিক্ষা সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠান সভা বা অন্যান্য কার্যক্রম গুলোতে কিভাবে সময় হিসাব নিকাশ করতে হয়। ধন্যবাদ আয়াতউল্লাহ ভাই, ধন্যবাদ সরোজ দা। আচ্ছা এবার বলুনতো স্কুল সময় ৯টায়, আসতে হবে কয়টায়?’
আয়াতউল্লাহ বলে, ‘ঐটা আবার অন্য নিয়ম। কারণ এটা হচ্ছে স্টেডিয়াম ফর্মূলা আর ওটা হচ্ছে স্কুল ফর্মূলা। সূত্রের মধ্যে পার্থক্য আছে।’
এদিকে সরোজ চক্রবর্তী বলে, ‘ঠিক তাই, আপনি পাটিগণিতের সূত্র বীজগণিতে প্রয়োগ করলে অংকতো হবে না, বরং আরো সমস্যা হতে পারে। এই যেমন স্কুল সময় সকাল ৯টা। সব স্কুল শুরুর সময় ৯টায় একই রকম হলেও শিক্ষকদের আগমন কিন্তু একই রকম হয়না।’
ইমতিয়াজ অবাক হয়ে জানতে চাই, ‘তাহলে কিভাবে বুঝা যাবে স্কুলে কয়টায় আসতে হবে?’ সরোজ বাবু বলে, ‘এখানে আপনাকে প্রথমে দেখতে হবে, ম্যানেজিং কমিটিতে কোন ভ্যানচালক, রিক্সাচালক, কোন প্রকারের শ্রমিক, বেকার বা দালাল শ্রেণির কোন সদস্য আছে কিনা! যদি থেকে থাকে, তাহলে আপনাকে স্কুলে পৌঁছতে হবে জাস্ট ৯টায়। কারণ এরা বিভিন্নভাবে আপনাকে হয়রানি করবে, অপমান করবে, কোন প্রকার অজুহাত শুনবেনা শুনতে চাইবেনা, কিছুই বলতে পারবেন না।’
একই সাথে আয়াতউল্লাহ বলে, ‘এখানে সরোজবাবু’র সাথে আর একটা কথা যুক্ত করতে চাই। যদি আপনার স্কুলে সুন্দরী কোন মহিলা শিক্ষিকা থেকে থাকে, কিংবা অবিবাহিত শিক্ষিকা থাকে, তাহলে আপনাকে পৌঁছতে হবে সকাল সাড়ে ৮টায়। কারণ সুন্দরী শিক্ষিকা থাকলে সংশ্লিষ্টদের আনাগোনা আরো বেড়ে যায়।’
এরই মধ্যে আয়াতউল্লাহ’র মোবাইলে রিং বেজে উঠে। কল রিসিভ করে জানতে পারে স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠান শুরু হচ্ছে। শিক্ষক বন্ধু মোবাইল করে তাড়াতাড়ি গ্যালারীতে যাবার জন্যে পরামর্শ দেয়। ইমতিয়াজ ঘড়ি দেখে তখন দুপুর ১২টা। এরপর তিন বন্ধু মিলে স্টেডিয়ামের দিকে হাঁটতে থাকে। এক পর্যায়ে স্টেডিয়ামে গিয়ে বসে সবাই খেলা দেখতে থাকে আর ইমতিয়াজ নতুন পরিচয় হওয়া বন্ধুদের বলা কথাগুলো ভাবতে ভাবতে বাস্তবতা খুঁজতে থাকে।