সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের কাব্যপ্রতিভা

মুহাম্মদ ইয়াকুব

42

মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর (২৪ অক্টোবর ১৭৭৫ – ৭ নভেম্বর ১৮৬২) ছিলেন অসাধারণ কাব্যপ্রতিভার অধিকারী একজন সম্রাট। ক্ষমতাহীন নামমাত্র এই সম্রাট মুঘলডেরা লালকেল্লায় সাহিত্যের আসর বসিয়ে সময় কাটাতেন। স্বাধীনতাহারা স্বজাতির দুঃখ-দুর্দশা এবং নিজের জীবনের কষ্ট ও বিষাদকে প্রতিপাদ্য করে তিনি কবিতা লিখতেন। সিপাহি বিদ্রোহে নেতৃত্ব প্রদানের অভিযোগে ইয়াঙ্গুনে নির্বাসিত হবার পর কাগজ ও কলম ব্যবহারে সম্রাটের উপর নিষেধাজ্ঞা ছিলো। এরপরও তিনি কয়লাকে কলমে পরিণত করে কবিতা লিখতেন, এমনকি ঘরের চার দেয়ালকে কবিতায় পরিপূর্ণ করে চিত্রকলায় পরিণত করেছিলেন।
বাহাদুর শাহ জাফর মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আকবর শাহ (১৮০৬-৩৭ খ্রিঃ) ও সম্রাজ্ঞী লাল বাঈর দ্বিতীয় পুত্র। তাঁর ঊর্ধ্বতন বংশ তালিকা বিশতম স্তরে গিয়ে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহিরুদ্দীন মুহাম্মদ বাবুরের সাথে মিলেছে। পিতামহ সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম (১৭৫৯-১৮০৬ খ্রিঃ) এবং পিতা সম্রাট দ্বিতীয় আকবর শাহ উভয়ের মতো দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পেনশনভোগী ছিলেন। পিতার মতো বাহাদুর শাহ নিজের ও মুঘল খান্দানের ভরণপোষণ ভাতা বৃদ্ধির জন্য অনেক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মুঘল রক্তধারা বহণকারী সম্রাট ‘বাদশাহ’ উপাধি ত্যাগ এবং লালকেল্লার বাইরে সাধারণ নাগরিকের মতো জীবনযাপনের শর্তে রাজি হননি। ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও সম্পদ সব কিছু হারিয়ে সম্রাট প্রাসাদের চার দেয়ালের অভ্যন্তরে জীবন কাটাতে বাধ্য হলেন। এসময় অমর্যাদার মনোবেদনা ভুলে থাকার জন্য তিনি গজল ও মুশায়েরায় নিমগ্ন থাকতেন।
সম্রাট নিষ্ফল জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘চার দিবসের আয়ু নিয়ে আমি এসেছি ধরায়/দু’দিন কেটে গেছে আকাক্সক্ষায়, বাকি দু’দিন অপেক্ষায়।’ হাতাশার সাথে প্রত্যাশার প্রকাশও ঘটে সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের কবিতায়। মুঘল আভিজাত্য ও ক্ষমতার সঙ্গে বড্ড বেমানান মান-মর্যাদা-ক্ষমতাহীন ‘সম্রাট’ উপাধিকে উপহাস করে বিষাদ ও বিষণœতার গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘রাজার সজ্জায় তুমি আমাকে সজ্জিত করো শুধু একবার/নতোবা মুকুট বানাও আজ, যা ভিখারীর শিরে খুব প্রয়োজন।’
উইলিয়াম ডালরিম্পিল ‘লাস্ট মুঘল’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘জাফরের গুণাবলীর মধ্যে অন্যতম ছিল বাস্তবতাকে গ্রহণ করা। জীবনের সকল দুঃখজনক ঘটনার মধ্যেও তিনি উপলদ্ধি করেছেন যে, পৃথিবী বদলে যাচ্ছে এবং কুকুর যতই ঘেউ ঘেউ করুক না কেন, জীবনের কাফেলা চলতেই থাকবে।’ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর এই চরম বাস্তবতাকে পরম করে নিতে পেরেছিলেন বলেই নির্বাসিত বন্দি জীবনেও লিখতে পেরেছিলেন এমন সব রোমান্টিক পদাবলী, ‘আমার ঠোঁটে তোমার ঠোঁট রেখেছ/আমার স্পন্দিত হৃদয়ের উপর/স্থাপন করেছ তোমার হৃদয়/আবার প্রেমে পড়ার ইচ্ছে নেই আমার।’
পরাজিত হয়েও বিজয়ী বীরের মতো চিত্রকল্প কয়জনই-বা আঁকতে পারে! সর্বশেষ মুঘল সম্রাট এঁকেছেন, ‘রেশমী কাপড় পরে তোমার বসন্তের রূপ/নিয়ে এসে আমার চোখ ধাঁধিয়ে দিলে/প্রস্ফুটিত হওয়ার একটি ফুল এনেছিলে/আমার অস্তিত্বে তা ছিল প্রেম।’
জীবনের বাঁকে বাঁেক এই সম্রাট কবি শুধু হারিয়েছেন, কিছুই পাননি। অথচ তাঁর পূর্বপ্রজন্ম ছিলো পৃথিবী কাঁপানো শাসকগোষ্ঠী। ন্যায়পরায়নতা, প্রভাব-প্রতিপত্তিতে মুঘলদের নাম শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উচ্চারিত হবে। হারানোর শোক মিছিলে জীবন পার করা সম্রাটের স্বজনহারা বেদনার প্রকাশ পায় তাঁর কবিতায়, ‘তুমি আমার সাথে ছিলে, আমার নিঃশ্বাসই/ছিলো তোমার নিঃশ্বাস, আমাদের মাঝেই তুমি/কখনো আমার পাশ ছেড়ে যাওনি/কিন্তু সময়ের চাকা ঘুরে গেছে/তুমি চলে গেছ, কেউ আনন্দ করেনি।’
বাহাদুর শাহ জাফর উপমহাদেশের প্রথম আজাদি আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী সেনাপতি ছিলেন। ১৮৫৭ সালের ২২ জানুয়ারি ইংরেজ দখলদারদের বিরুদ্ধে উপমহাদেশের স্বাধীনতাপ্রিয় সিপাহিদের শুরু হওয়া দাবানল ১১ মে ১৮৫৭ তারিখ দিল্লির লালকেল্লায় সমবেত হয়ে সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের আনুগত্য স্বীকার করে ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। ১১ মে সিপাহিরা দিল্লি অধিকার করে বহু ইংরেজ সেনাকে হত্যা ও বিতাড়ন করেন। দেশপ্রেমিক সিপাহিরা এ দিন লালকেল্লায় প্রবেশ করে ক্ষমতাহীন নামমাত্র সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরকে ভারতের স্বাধীন সম্রাট বলে ঘোষণা করে তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে শপথ নেন। এ দিন গভীর রাতে লালকেল্লায় একুশবার তোপধ্বনির মাধ্যমে ৮২ বছরের বয়োবৃদ্ধ সম্রাটকে দেওয়ান-ই খানোস এ সম্মান জানানো হয়। প্রকৃতপক্ষে এই বিপ্লবে নেতৃত্ব দেবার মতো অবস্থা বয়োবৃদ্ধ সম্রাটের ছিলো না। বিপ্রদাশ বড়–য়ার লেখা ‘বাহাদুর শাহ জাফরের শেষ দিনগুলি’ গ্রন্থেও উল্লেখ করা হয়েছে সম্রাটের বার্ধক্যজনিত অপারগতা এবং শাহজাদাদের নেতৃত্বের গুণাবলী শূন্যতার কথা। কিন্তু, ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের মাঝে এই বয়োবৃদ্ধ সম্রাটের এতো ব্যাপক প্রভাব ছিলো যে, বাহাদুর শাহ জাফর সিপাহি বিপ্লব তথা ভারতবর্ষের প্রথম স্বশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিচ্ছেন – এ সংবাদ সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়লে কানপুর, বিহার, ঝাঁশি, বেরিলি থেকে শুরু করে পশ্চিম ও প‚র্ববাংলার সর্বত্র হিন্দু-মুসলমান সিপাহিরা গর্জে ওঠে ‘খালক-ই খুদা, মুলক ই বাদশাহ, হুকুম ই সিপাহি’ অর্থাৎ আল্লাহর দুনিয়া, বাদশার রাজ্য, সিপাহির হুকুম ইত্যাদি ¯েøাগানে।
সম্রাটের রাসুল (সঃ) বংশীয় স্ত্রীর পুত্র শাহজাদা মির্জা মোগল এই বিদ্রোহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ঐতিহাসিক উইলিয়াম ডালরিম্পিল তাঁর ‘লাস্ট মুঘল’ গ্রন্থে শাহজাদা মির্জা মোগল এই বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছেন মর্মে তিন শতাধিক নথির সন্ধান পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। ইংরেজ সৈন্যরা কঠোর ও নির্দয়ভাবে এই বিদ্রোহ দমন করে। মীর্জা মোগল, মীর্জা খিজির সুলতান, মীর্জা আবু বকরসহ ২৯ জন মুঘল শাহজাদাসহ বহু আমির-ওমরাহ, সেনাপতি ও সৈন্যকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। সম্রাটকে বিচারের নামে প্রহসনের আদালতে দাঁড় করানো হয়। হাজির করা হয় বানোয়াট সাক্ষী। ইংরেজদের অনুগত বিচারকরা রায় দেয়, দিল্লির সাবেক সম্রাট ১০ মে থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংগঠনের দায়ে অপরাধী। তার শাস্তি চরম অর্থাৎ মৃত্যুদÐ হওয়া উচিত। কিন্তু তার বার্ধক্যের কথা বিবেচনা করে প্রাণ দÐাদেশ না নিয়ে নির্বাসনে পাঠানোর সুপারিশ করা হয়। ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ দখলদাররা সম্রাটকে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং রেঙ্গুনে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়।
কবি ও আধ্যাত্মিক সাধক সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর সম্পর্কে বিখ্যাত ইংরেজ ঐতিহাসিক উইলিয়াম ডালরিম্পিল তাঁর ‘লাস্ট মুঘল’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘বাহাদুর শাহ্ একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন সৃজনশীল মানুষ। তিনি ইসলামি শিল্পরীতিতে পারদর্শী, উর্দু কাব্য জগতের শক্তিমান কবি এবং সুফি সাধক। তিনি এ উপমহাদেশের হিন্দু-মুসলিম ঐক্যকে খুব গুরুত্ব দিতেন।’ সঙ্গত কারণেই উপমহাদেশের সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষের উপর কবি, দার্শনিক এবং আধ্যাত্মিক সাধক সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের ব্যাপক প্রভাব বিদ্যমান ছিলো, আছে এবং থাকবে। সর্বসাধারণের উপর তাঁর প্রভাব এতো বেশি ছিলো যে, নেতাজি সুবাস চন্দ্র বসু সম্রাটের কবর জিয়ারতের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করতেন। প্রিয় মাতৃভ‚মি থেকে বহু দ‚রে রেঙ্গুনের মাটিতে সম্রাটের জীবনের বাকি দিনগুলো চরম দুঃখ ও অভাব অনটনের মধ্যে কেটেছিলো।
সম্রাটের বিড়ম্বনাপ‚র্ণ জীবনের অবসান হয় ১৮৬২ খ্রিষ্টাব্দের ৭ নভেম্বর, শুক্রবার ভোর ৫টায়। দেশপ্রেমিক সম্রাটের ইচ্ছা ছিলো স্বদেশের মাটিতে সমাহিত হওয়া। কিন্তু তিনি বুঝতে পেরেছিলেন জীবনের শেষ সময় ঘনিয়ে আসছে। স্বদেশের মাটিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ কিংবা সমাহিত হওয়ার সাধ কোনোটাই প‚রণ হবে না। নিদারুণ দুঃখে তিনি লিখেন একের পর এক কালোত্তীর্ণ কবিতা, ‘কিতনা বদনসিব হ্যায় জাফর দাফন কে লিয়ে/দো গজ জামিন ভি মিলানা সাকে ক্যোয়ি ইয়ার মে’। ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী মায়ানমার সফরে গিয়ে তাঁর সমাধিসৌধের পরিদর্শন বইতে লিখেছিলেন একটি কালজয়ী কবিতা, ‘দু’গজ জমিন তো না মিলি হিন্দুস্তান মে/ফির তেরি কোরবানি সে উঠি আজাদি কি আওয়াজ/বদনসিব তো নাহি জাফর/জুড়া হ্যায় তেরা নাম ভারত কি শান/আউর শওকত মে, আজাদি কি পয়গাম সে।’ অর্থাৎ ‘হিন্দুস্তানে তুমি দু’গজ মাটি পাওনি সত্য। তবে তোমার আত্মত্যাগ থেকেই আমাদের স্বাধীনতার আওয়াজ উঠেছিলো। দুর্ভাগ্য তোমার নয় জাফর, স্বাধীনতার বার্তার মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষের সুনাম ও গৌরবের সঙ্গে তোমার নাম চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।’
সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের কবিতাগুলো কালের সাক্ষী হয়ে আজও বেঁচে আছে। সিপাহি বিপ্লব ও তাঁর অমর কবিতাগুলো তাঁেক বাঁচিয়ে রাখবে অনন্তকাল। দু’শো বছরের ইংরেজ শাসনে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের মতো হিন্দু-মুসলমান ঐক্যবদ্ধভাবে ইংরেজ বিরোধী কোন সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেনি। এখান থেকেই প্রতিয়মান হয়, সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের প্রতি উপমহাদেশের সর্বসাধারণের আনুগত্য, শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের ভিত্তি কতটা গভীরে প্রোথিত।