সম্পর্কের উচ্চমাত্রায় বাংলাদেশ-সৌদি আরব

12

১৯৭৬ সালে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতি সৌদি আরবের স্বীকৃতির পর থেকে বরাবরই সুসম্পর্ক বজায় রয়েছে উভয় দেশের মাঝে। মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় ইবাদতগা পবিত্র কাবা এবং ধর্মের প্রবর্তক মহানবী হজরত মুহাম্মদ (দ.) এর রওজা মুবারকের অবস্থান সৌদি আরবের যথাক্রমে মক্কা ও মদিনায় হওয়ায় বিশ্বের যেকোন মুসলমানদের ন্যায় বাঙালি মুসলমানদের কাছে সৌদি আরব পবিত্র স্থান হিসাবে মর্যাদা পেয়ে আসছে। অপরদিকে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তর মুসলিম দেশ হিসাবে সৌদি আরবের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসাবে বিবেচ্য। সংগতকারণে সম্পর্কের যৌক্তিকতা বিচারে সৌদি আরব দীর্ঘদিন দরে তাদের দেশের উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক কর্মকান্ড সম্পাদন করতে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি নিয়ে যাচ্ছে। যদিও মাঝেমধ্যে ভিসা বন্ধ বা জটিলতার কারণে জনশক্তি রফতানি বন্ধ হয়ে পড়ে, এরপরও সম্প্রতি এক বেসরকারি জরিপে দেখা গেছে সৌদি আরবে ২.৫ মিলিয়নের বেশি বাঙালি বসবাস করছে। যাদের পাঠানো রেমিটেন্স বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবাহকে সমৃদ্ধ করছে। গত কয়েকবছরে মধ্যপ্রাচ্যের নানা সংকটের নেতিবাচক প্রভাব সৌদি আরবেও আচঁড় লাগে। বিশেষ করে ইয়েমেন ও কাতারের সাথে সম্পর্কের অবনতি; ইয়েমেনর সাথে সৌদি জোটের যুদ্ধের দামামা সৌদি আরবের কোষাগারেও ছায়া পড়তে শুরু করেছে। ফলে সৌদি আরবে যেকোন দেশের প্রবাসীদের দিনকাল তেমনটি ভালো যাচ্ছে না। হকুমতের কলাকানুনের অতি প্রয়োগ, সৌদি (আরব) জাতীয়তাবাদের উন্মেষ, ভিসা জটিলতা ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশি প্রবাসীরা অনেকটা হতাশ জীবন কাটাচ্ছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সৌদি আরবে রাষ্ট্রীয় সফর সৌদি বাংলাদেশি প্রবাসীরা দারুণ উচ্চসিত ও আনন্দিত হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সৌদি আরব সফর সংক্রান্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সৌদি বাদশাহ ও যুবরাজের সাথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রবাসীদের ভিসা নিয়ে কোন চুক্তি না হলেও এ সফর প্রবাসীদের প্রতি সৌদি সরকারের সহানুভূতি ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করবে। কিছুটা হলেও তাদের স্বস্তিতে দিন কাটবে। উল্লেখ্য যে, গত ১৫ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাদশাহ সোলায়মান বিন আবদুল আজিজের আমন্ত্রণে চারদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে সৌদি আরবে যান। এসময় তিনি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ ও যুবরাজের সাথে করে উভয়দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনাসহ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে দু’টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ)সহ মোট পাঁচটি চুক্তি সই করেন। প্রধানমন্ত্রী জেদ্দায় কাউন্সিল অব সৌদি চেম্বার এবং রিয়াদ চেম্বার অব কমার্সের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকের পর ঢাকা ও রিয়াদের মধ্যে শিল্প ও বিদ্যুৎখাতে সহযোগিতার ব্যাপারে পাঁচটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। রিয়াদে কূটনীতিক পাড়ায় বাংলাদেশ চ্যান্সেরি ভবনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী এবং জেদ্দায় বাংলাদেশ কন্সুলেট জেনারেলের চ্যান্সেরি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এর পাশাপাশি সফরের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী ওমরাহ পালন ও মদিনায় মসজিদে নববীতে গিয়ে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (দ.) এর রওজা মুবারক জিয়ারত করেন। উল্লেখ্য যে, প্রধানমন্ত্রী দ্বিতীয়বার সরকার গঠনের পর সৌদি আরবে এটি তাঁর তৃতীয় সফর । এর আগে তিনি ২০১৬ সালে এবং চলতি বছরের এপ্রিল মাসে আরো দুইবার সৌদি আরব সফর করেন।
বাংলাদেশের কূটনেতিক সূত্র এই সফরকে অত্যন্ত সফল ও তাৎপর্যবহ বলা হচ্ছে। তাদের ভাষায় প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরব সফরকালে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক খাতে অর্জিত সাফল্য সৌদি নেতৃবৃন্দের কাছে তুলে ধরেছেন। এবং দারিদ্র্য ও শোষণমুক্ত জ্ঞানভিত্তিক উন্নত সোনার বাংলা নির্মাণে আগামী দিনগুলোতে বিভিন্ন খাতে সৌদি আরবের আরো বেশি অংশীদারিত্বের উপায় ও কৌশল নিয়ে আলোচনা করেছেন। শ্রমখাত, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহায়তা, মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর ঐক্য ও সমৃদ্ধি, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ইত্যাদি বিষয় আলোচনা হয়।
উল্লেখ্য যে, আবহমান ধর্মীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের পাশাপাশি সামরিক ক্ষেত্রেও সৌদি আরবের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক স¤প্রসারিত হচ্ছে। ইতোপূর্বে সৌদি নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসবিরোধী ইসলামি সামরিক জোটে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রীর সর্বশেষ সৌদি আরব সফর দেশটির সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন যেকোন সময়ের চেয়ে উচ্চ মাত্রায় অবস্থান করছে। আমরা আশা করি, নতুন মাত্রা পাওয়া সৌদি আরবের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরো সুদূরপ্রসারী হবে ।