সম্পদ বিক্রির হিড়িক মাদক মাফিয়াদের

তুষার দেব

70

অপ্রদর্শিত বা জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের মধ্যেই তালিকাভুক্ত মাদক মাফিয়াদের নামে-বেনামে থাকা সম্পদ বিক্রি বা হাতবদলের হিড়িক পড়েছে। মাদকবিরোধী অভিযানে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়া কিংবা ভিনদেশে আত্মগোপনে চলে যাওয়া শীর্ষ মাদক চোরাকারবারিদের ঘনিষ্ঠজনরা এজন্য বিত্তশালীদের কাছে ধর্ণা দিচ্ছেন। দুদকের হাতে জব্দ হওয়ার আগেই সম্পদ বিক্রি করে অর্থ সরিয়ে নেয়াসহ নানা কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে অনেকে। কারও কারও বিরুদ্ধে সম্পদ বিক্রির অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগও রয়েছে।
তবে মাদক চোরাকারবারিসহ সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজনদের কারও বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলাকালীন সময়ে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন সম্পর্কিত অভিযোগের সত্যতা পেলে তা জব্দের জন্য অনুমতি চেয়ে দুদক আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছে। আদালতের অনুমতি বা আদেশ পেলে তার সত্যায়িত অনুলিপি পাঠানো হচ্ছে সংশ্লিষ্ট সার্কেলের সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে। এর মধ্য দিয়ে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের জ্ঞাত আয় বহির্ভূত অর্থের বিনিময়ে নামে-বেনামে অর্জিত সম্পদ হাতবদলের প্রক্রিয়া ঠেকানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন দুদক কর্মকর্তারা। কিন্তু সম্পদের অনুসন্ধান থেকে শুরু করে তা জব্দে আদালতের আদেশ প্রাপ্তি পর্যন্ত দুদকের বিদ্যমান কার্যক্রম ও আইনি প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হওয়ায় তার আগেই নানা কৌশলে মাদক মাফিয়াদের নামে-বেনামে থাকা সম্পদ হাতবদলের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে তাদের ঘনিষ্ঠজনরা। সম্পদ বিক্রির অর্থ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাচার এবং সেখানে বিনিয়োগের অভিযোগ রয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক বা সনাক চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি এডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী পূর্বদেশকে বলেন, ‘যিনি বা যারা অবৈধ প্রক্রিয়ায় সম্পদ অর্জন করেছেন তিনি ও তারা সবসময় নিজের ভেতরে সেসব সম্পদ হারানোর শঙ্কাও অনুভব করেন। সম্পদ সুরক্ষার তাগিদ থেকেই পরিবার-পরিজন বা ঘনিষ্ঠদেরও তাতে ব্যবহার করেন। তেমনি দুদকের গতিবিধিও তাদের নজরের বাইরে নয়। দুদকের বিদ্যমান কার্যক্রম ও আইনি প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হলেও দুর্নীতিবাজরা তাদের অর্জিত সম্পদ রক্ষায় কৌশল ও সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে মোটেও সময় নেয় না।’
আদালতে নিযুক্ত দুদকের আইনজীবী সানোয়ার হোসেন লাভলু জানান, পটিয়া থানার সাবেক ওসি (বর্তমানে রাজশাহী রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত) এবং স্ত্রীর দায়ের করা নারী নির্যাতন মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ করে কারাভোগকারী পুলিশ পরিদর্শক মো. রেফায়েত উল্লাহ চৌধুরী বিগত ২০১৬ সালে নগরীর নাসিরাবাদ আবাসিক এলাকায় ‘জুমাইরা গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন’ নামের একটি আবাসিক ভবনের পঞ্চম তলায় দুই হাজার একশ’ ৫০ বর্গফুট আয়তনের একটি ফ্ল্যাট ক্রয় করেন। নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রায় অর্ধকোটি টাকায় কেনা ফ্ল্যাটে একশ’ পাঁচ বর্গফুট আয়তনের পার্কিং রয়েছে তার নামে। পরের বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পায় দুদক। অভিযোগ আমলে নিয়ে দুদকের সহকারী পরিচালক মো. হুমায়ুন কবীরকে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়। অনুসন্ধানকালে পুলিশ কর্মকর্তা রেফায়েত ফ্ল্যাট কেনার অর্থের বৈধ উৎস এবং এ সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রদর্শনে ব্যর্থ হন। এরপর গত ৮ জুলাই ফ্ল্যাটটি ক্রোক বা জব্দপূর্বক দুদককে রিসিভার নিয়োগ দেয়ার আদালতে আবেদন করা হয়। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৮ জুলাই মহানগর দায়রা জজ মো. আকবর হোসেন মৃধা ফ্ল্যাট ক্রোকের আদেশ দেন।
দুদকের জেলা সমন্বিত কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগ অনুসন্ধান কিংবা মামলা তদন্তাধীন থাকাবস্থায় চট্টগ্রামের তালিকাভুক্ত শীর্ষ কয়েক মাদক চোরাকারবারির নামে-বেনামে থাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ জব্দের অনুমতির জন্য আদালতে দ্বারস্থ হওয়ায় প্রক্রিয়ায় রয়েছে দুদক। এর মধ্যে রয়েছেন টেকনাফে পুলিশের সাথে গত ৩০ মে দিবাগত রাতে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত শীর্ষ ইয়াবা চোরাকারবারি সাইফুল করিম, বিদেশে আত্মগোপন করা একই এলাকার আরেক মাদক মাফিয়া মো. আমিন ওরফে ইয়াবা আমিন এবং নগরীর আইস ফ্যাক্টরি রোডের ধোপার মাঠে র‌্যাবের সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত তালিকাভুক্ত মাদক মাফিয়া মো. ফারুক ওরফে বাইট্টা ফারুকের তিন ভাই মো. সেলিম, মো. শুক্কুর ও মোক্তার হোসেন। আত্মগোপনে থাকা ইয়াবা আমিনের বিরুদ্ধে সাত কোটি টাকারও বেশি মূল্যের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে গত ১৯ জুন ডবলমুরিং থানায় মামলা করেছে দুদক। আর কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত সাইফুল করিমের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে ১১ কোটি টাকা মূল্যের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের তথ্য মিলেছে। এছাড়া, র‌্যাবের সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত মাদক মাফিয়া মো. ফারুকের তিন ভাই ইতোমধ্যে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ হাতবদল করে তা সৌদি আরবে পাচার ও সেখানে ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন বলেও অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে। পটিয়ার ধলঘাটের নন্দেরখীলে প্রাসাদোপম বাড়ি ছাড়াও পটিয়া সদর ও নগরীতে ফারুকের স্ত্রী ফারজানাসহ ভাইদের নামে মার্কেট এবং একাধিক দোকান ও ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া, দুটি কাভার্ড ভ্যানও রয়েছে তাদের মালিকানায়। দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক মুহাম্মদ জাফর সাদেক শিবলী তিনভাইয়ের বিরুদ্ধে ইয়াবা ও হুন্ডির কারবারের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের বিষয়ে দুই দফা দলিলাদিসহ তার দপ্তরে হাজির হয়ে বক্তব্য প্রদানের জন্য নোটিশ দিলেও তারা কেউ হাজির হন নি।
উল্লেখ্য, দুদক আইন অনুযায়ী দুর্নীতি, প্রতারণা, ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অভিযোগে দেশের যে কোনও নাগরিকের আবাসিক ভবন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও আস্তানা তল্লাশি করতে পারেন দুদকের কর্মকর্তারা। অনুসন্ধান চলাকালীন সময়েই তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি আদালতের অনুমতি নিয়ে অবৈধভাবে অর্জিত যে কোনও সম্পদ জব্দ ও রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতাও রয়েছে দুদকের।