সমাজ সংস্কারক শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.)

3

 

মো. মাহবুব উল আলম

পটভূমি : ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, নবী-রাসূলগণ নিজেরা শত যাতনা-নির্যাতন সহ্য করে নিজ নিজ কওমের জনগণের ব্যক্তিগত পরিশুদ্ধি থেকে শুরু করে সমাজে বিদ্যমান সকল প্রকার অশুচি-অন্যায়-অবিচার-পীড়ন-অসাম্যের মূলোৎপাটন করে ঐশী কিতাবসমূহে বর্ণিত প্রত্যাশিত এই শান্তি মাটির পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়েছেন। আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদের (দ.) মাধ্যমে নবী-রাসূলদের দায়িত্ব নির্দিষ্ট কওম কিম্বা অঞ্চলের স্থলে সমগ্র পৃথিবী তথা বিশ্বজগতের কল্যাণের অন্তহীনতায় বিস্তার লাভ করে এবং সেজন্যে তিনি রহমতুল্লিল আলামিন বা ‘বিশ্বভুবনের জন্য রহমত’ হিসেবে ভূষিত। ইতিহাসের পৃষ্ঠায় বিধৃত তথ্যাদি তাঁর এই অভিধার যথার্থতার সাক্ষ্য দিচ্ছে এবং এসব বাস্তবতার আলোকে বিংশ শতাব্দী থেকে এক শ্রেণীর প্রগতিবাদী ইতিহাসবিদ ও সমাজবিদ তাঁকে আক্ষরিকভাবেই ‘জনগণের নবী’ (নবী উল উম্মি) হিসেবে পরিচিহ্নিত করার ঐতিহ্য প্রবর্তন করছেন। তাঁর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনেও একই অভিধা প্রযোজ্য হয়েছে। নবুয়ত-রেসালতের ধারা নবীজীর (দ.) মাধ্যমে পরিপূর্ণতা লাভ করার পর মহান রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে তা চিরতরে রুদ্ধ করে দেওয়া হয়। তবে পৃথিবীর মানুষ তথা সৃষ্ট প্রাণ ও পদার্থ সমূহের প্রয়োজনে বেলায়তের ধারা নবীজীর (দ.) মিশনের অনুসরণে অব্যাহত থাকে। আমাদের মহান ওলী-আল্লাহ-আওলিয়া-দরবেশ-ফকির-আবদাল-আওতাদ এই বেলায়তী ধারারই মহান ধারক ও বাহক। এই ওলী-আওলিয়ারা নিজ নিজ সময়কালে রহমানুর রহীম’ এবং ‘রহমতুল্লিল আলামিনের’ কল্যাণধারায় পৃথিবীকে, মানুষকে, প্রাণী জগৎ ও বস্তু জগৎকে সিক্ত করেন। তাঁদের জীবনেতিহাসে এর সাক্ষ্য বিদ্যমান। শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী (ক) এই মহান বেলায়তী ধারারই একজন মহান সার্থক প্রতিভূ, যিনি একই সাথে তাঁর পূর্বসূরি হযরত গাউসুল আযম মাইজভান্ডারী শাহসুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (ক.), বিল বেরাছত গাউসুল আযম হযরত শাহসুফি সৈয়দ গোলামুর রহমান বাবা ভান্ডারী (ক.), খাদেমুল ফোকরা হযরত শাহ সুফি সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভান্ডারীর (ক.) মহান উত্তরাধিকারও ধারন করেন। মহান ওলী-আওলিয়াদের ইতিহাসে দেখা যায় যে, তাঁরা কোথাও প্রতিবাদী- সংগ্রামী, কোথাওবা জীবনবাজি রাখা যোদ্ধা। কোথাওবা মমতাময় সমাজসেবক, কোথাওবা নীরব ধ্যানী সংস্কারক, কোথাওবা ‘শাশ্বত শান্তিবারির ঐশী ভিশতী’। তাঁরা একাধারে প্রত্যক্ষ কিম্বা পরোক্ষভাবে সমাজ সংস্কারক এবং সংস্কার অভিযান কিম্বা আন্দোলনের উৎস। শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী (ক.) এই বৈশিষ্ট্যের ব্যতিক্রম নন।
২. সমাজ সংস্কারে আউলিয়াল্লাহদের দৃষ্টান্ত : কেবল ব্যক্তি চিত্ত নয়, ব্যাপক সমাজ সংস্কার তথা রাষ্ট্র-প্রশাসন সংস্কারের ইতিহাসে ওলী-আল্লাহদের সিদ্ধান্তমূলক ভূমিকার উদাহরণ আমাদের বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান উপমহাদেশেও অনেক। হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (র.), হযরত শেখ নিজামউদ্দিন আউলিয়া (র.), হযরত শাহ জালাল (র.) হযরত শাহ মখদুম (র.), হযরত খান জাহান আলী (র.) প্রমুখ সকলের ভূমিকা আত্মিক, আধ্যাত্মিক, সামাজিক, রাজনৈতিক তথা বহুমুখী। একইভাবে এ তালিকায় চলে আসেন হযরত মোজাদ্দেদ আলফেসানী (র.), হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী (র.) থেকে অতীতের হযরত জাফর সাদেক (র.) পর্যন্ত। অনেক আওলিয়া-বুজুর্গ যারা এশিয়া মাইনর, মধ্যপ্রাচ্য, এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপাঞ্চল, উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে স্বৈরাচারী, সামন্ততান্ত্রিক রাজতান্ত্রিক পীড়ন-শোষণের বিরুদ্ধে সমূহ ঝুঁকি নিয়ে প্রবল শক্তিতে আবির্ভুত হন। ইতিহাসের অনেকগুলো পৃষ্ঠা তাঁদের চরম ত্যাগের রক্তে রঞ্জিত। তাঁদের এসব সুদূর প্রসারী ভূমিকার যথার্থ ঐতিহাসিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সংস্কৃতিক মূল্যায়ন এখনো সম্পন্ন হয়েছে বলে আমরা দাবি করতে পারিনা। আমাদের প্রতাশা, আমাদের বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিজ্ঞ শিক্ষাবিদরা এই আয়াসসাধ্য গবেষণা যজ্ঞে অবতীর্ণ হবেন। বলা অপ্রাসঙ্গিক হবেনা যে, আমাদের বাংলাদেশে গণ্ডগ্রামের তৃণমূল পর্যায়ে সঞ্চরণশীল ফকির-দরবেশদেরও অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে একটা প্রতিবাদী ভূমিকা ফলপ্রসূভাবে কার্যকর থাকে। একটু মনোযোগ সহকারে অবলোকন ও বিশ্লেষণ করলে তা সন্ধানী দৃষ্টিতে প্রতিভাত হয়ে উঠবে।
যতটুকু তথ্য-উপাত্ত আমাদের হাতে এসেছে এবং সাংবাদিক হিসেবে একদা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নির্মাণ করতে গিয়ে হযরত গাউসুল আযম মাইজভান্ডারী (ক.) থেকে শুরু করে হযরত শাহসুফি দেলাওয়ার হোসাইন মাইজভান্ডারী (ক.) পর্যন্ত সবার আত্মিক, সামাজিক এমনকি আর্থিক সংস্কার প্রবণতার উপাত্তের সাথে পরিচিত হবার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। যা বিভিন্ন মাধ্যমে মুদ্রিত আকারে রয়েছে। স্থানস্বল্পতা হেতু ক্ষুদ্র মাত্র দু’একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া গেল। (ক) আত্মিক পরিশুদ্ধির প্রথম উপকরণ ব্যবহারিক সাংস্কৃতিক পরিশুদ্ধি। পরিশুদ্ধ মানুষের সংখ্যাধিক্যই পরিশুদ্ধ সমাজ বিনির্মাণের প্রধান উপাত্ত। তাই হযরত গাউসুল আযম মাইজভান্ডারী তৎকালীন বিনোদনের সহজলভ্য উপকরণ গান বাজনা থেকে অশুচি, কদর্যতা দূর করার মানসে একই ধরনের বাদ্য-বাজনা সহকারে সুচি-স্নিগ্ধ-ভাব বিভোর সেমা মাহফিল চালু করেন সফলভাবে এবং তা সাধারণ মানুষকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে। মনে রাখা দরকার, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই সৎ, শুদ্ধ ও শুভ প্রবণতাসম্পন্ন। (খ) তৎকালীন পশ্চাদপদ ও অতি সীমিত আর্থ-সামাজিক পরিবেশে বিপদাপন্ন, অভাবী, রুগ্ন বিবিধ প্রতিবন্ধকতায় বন্দী অসহায় মানুষের ত্রাণ ও সাহায্যার্থে তাঁকে অহোরাত্র সক্রিয় দেখা গেছে; (গ) তিনি কোলকাতায় অবস্থানকালে পূর্ববঙ্গীয় ডকশ্রমিকদের দুর্দশাসহ বিভিন্ন অন্যায্যতা অবলোকন করে সিয়াসত বা প্রশাসনকে পূর্বদিকে স্থানান্তরের সুস্পষ্ট ইংগিত দিয়েছিলেন। যার বাস্তরূপ ১৯০৬, ১৯৪৭, ১৯৭১- এ দেখা গেছে। এটা তাঁর রাষ্ট্র-প্রশাসন ব্যবস্থা সচেতনার পরিচায়ক। (ঘ) মৌনী তাপস হযরত বাবা ভান্ডারীর (ক.) ইঙ্গিত অনুসারে সমকালে সংঘটিত বিভিন্ন কার্যের মধ্যে উপমহাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তণের গতিশীলতার স্বাক্ষর নিহিত ছিল, তা পরবর্তীকালের ইতিহাসে সপ্রমাণিত। (ঙ) হযরত শাহসুফি সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভান্ডারী (ক.) মানুষের আত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য রূহানী অনুশীলনের পাশাপাশি উসূলে সাবওয়া বা সপ্ত পদ্ধতিতে ব্যবহারিক-প্রকাশ্য জীবনে মানবিক উৎকর্ষ হাসিলের তাগিদ দিয়েছেন এবং রূহানী ভ্রাতৃত্বের পাশাপাশি সংগঠনিকভাবে সামাজিক ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঐক্যবদ্ধতার বিকাশের লক্ষ্যে ‘আঞ্জুমানে মোত্তাবেয়ীনে মাইজভান্ডারী’ নামক সংগঠনও প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। তিনি তাঁর কর্মজীবনকে মানুষ ও সমাজের একেবারে ব্যবহারিক ক্ষেত্র পর্যন্ত স¤প্রসারিত করেছেন। যেখানে সমাজ ও রাষ্ট্র চিন্তারও যথেষ্ট স্থান ছিল। তিনি স্বীয় জন্মস্থানের প্রতি শরিয়তী কর্তব্যবোধ বশতঃ স্থানীয়ভাবে কৃষি উন্নয়ন, সেচ ব্যবস্থা, যোগাযোগ উন্নয়ন প্রভৃতি ব্যবহারিক কাজ যেমন করেছেন, তেমনি আমাদের বাংলাভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্বশাসন আন্দোলন, শোষণ-পীড়ন বিরোধী সংগ্রাম এবং সর্বশেষ বাংলাদেশের মহান মুক্তি সংগ্রামে সোচ্চার ও নির্ভীকভাবে শরীক থেকেছেন। সাহস, প্রেরণা ও অভয় যুগিয়েছেন। (মাইজভান্ডার দরাবর শরিফের এই মহান ওলী-আওলিয়াদের সামাজিক তথা রাষ্ট্র প্রশাসনে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যবহারিক ভূমিকার যৎকিঞ্চিত বিবরণ ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে মাইজভান্ডার দরবার শরিফ’ গ্রন্থে ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।)
ইসলামী রূহানী ও সামাজিক পরিমণ্ডলের সুউচ্চ মার্গীয় ওলী আওলিয়াদের বহুমুখী সৃজনশীল ভূমিকা সম্পর্কে প্রখ্যাত স্কলার রেবেন লেভী তাঁর “সোস্যাল স্ট্রাকচার অব ইসলাম” গ্রন্থে যে অভিমত ব্যক্ত করেছেন, মাইজভান্ডারী উপরোক্ত মহান ওলীগণ এর ভাস্বর দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন। রেবেন লেভী বলেন, “অধিকতর উচ্চ মর্যাদা ও জ্ঞানালোক প্রাপ্ত অনেক সুফি দৃঢ়তা সহকারে বলেন যে, প্রকৃত সুফি বা দরবেশ তঁঅর স্বজাতি বা পারিপার্শ্বিকতার মধ্যেই বাস করেন, তাদের সাথে কাজ ও কায়-কারবার করেন, তাদের সাথে সম্পর্ক রাখেন এবং সামাজিক কাজ কর্মে অংশ নেন, অথচ এক মুহূর্তের জন্যও আল্লাহর স্মরণ বিচ্যুত হননা।” বলাবাহুল্য, মাওলানা রুমীও বলেছেন, “সংসার সামগ্রী টাকা পয়সা নয়, স্রষ্টাকে ভুলে যাবার নামই দুনিয়া।” অর্থাৎ সমাজ বা জনবিচ্ছিন্ন অবস্থায় আল্লাহ বা ধর্মপোরস্তির মধ্যে আবদ্ধ থাকা নয়, সমাজ ও মানুষের সাথে তাদের সুখ-দুঃখ-আশা-প্রত্যাশার সাথে একাকার হয়ে কল্যাণময়তার মধ্যে ব্যস্ত ও নিমগ্ধ থাকাই ওলীয়ে কামেলদের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
৩। জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী (ক.) একাধারে সংস্কারক ও অব্যাহত সংস্কার চেতনার উৎসও বটে : এই আলোচনাটা আমরা শুরু করছি কুরআনের সূরা বাকারার এই আয়াত দিয়ে যাতে বলা হয়েছে, “হাঁ, যিনি আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পিত হয়েছেন এবং (অপরের প্রতি) কল্যাণকর্মশীল, তাঁর জন্য স্বীয় রবের পক্ষ থেকে পুরস্কার রয়েছে এবং তাঁর জন্য কোন ভয় নেই, কিম্বা তিনি দুঃখ-পীড়িতও হবেননা। (বালা, মান্ আসলামা ওয়াজ্বহাহু লিল্লাহে ওয়া হুয়া মুহছিনুন ফালাহু আযরুহু এন্দা রাব্বিহী, ওয়ালা খাওফুন আলাইহিম ওয়ালাহুম ইয়াহযানূন, ২ঃ১১২)।
এ আয়াতে আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পিত এবং কল্যাণকর্মশীলতার কথা বলা হয়েছে। বুখারী শরিফের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: ‘সদুপদেশ ও মঙ্গল কামনা-কর্মই ধর্ম’ (আরো দ্রষ্টব্য: কিতাবুল আমওয়াল বা ইসলামে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাঃ হযরত আবু ওবায়দ আল-কাসিম ইবনে সাল্লাম)। প্রখ্যাত দার্শনিক তাপস প্রবর হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (র.) আল্লাহর খাস বান্দাদের দু’টো প্রধান বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করে বলেন, “আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে দু’টো জ্ঞানে পারদর্শী দেখতে চান: (১) আবুদিয়াত বা আল্লাহর দাসত্ব বিদ্যা, (২) রবুবিয়াত বা আল্লাহর সৃজন-পালন-বিবর্তনতত্ত¡ বিদ্যা, যা পার্থিব জীবনের জন্য প্রয়োজন। তাঁর মতে (ক) মানুষের সংশোধন ও (খ) খাঁটি জনসেবাই হওয়া উচিৎ সকল বিদ্যার উদ্দিষ্ট। কামরস সুফিয়া হযরত আবুল হাসান নূরীর (র.) মূলনীতি। এর বিপরীত করাকে তিনি হারাম বা অন্যায্য জ্ঞান করতেন। নবীজীর (দ.) উপরোল্লিখিত হাদীস, হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (র.) এবং হযরত আবুল হাসান নূরীর (র.) উক্তিতে আমরা কুরআনের উপরোদ্ধৃত ২ঃ১১২ আয়াতে নিহিত দর্শন ও শিক্ষারই প্রতিফলন দেখতে পাই, যার প্রতিফলন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শাহানশাহ মাইজভাÐারীর (ক.) জীবন, কর্ম ও কল্যাণ সাধনায় দৃশ্যমান। (এই আকিঞ্চন নিবন্ধকার ২৬-১২-১৯৮৩ ইং সনে দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত ‘সম্পদের মালিকানা ও সুফি জীবন-দর্শন সম্পর্কে শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী (ক.) দৃষ্টিভঙ্গী’ শীর্ষক এক নিবন্ধে সংক্ষেপে পুরো বিষয়ের উপর আলোকপাত করার চেষ্টা করেন। তিনি (শাহানশাহ মাইজভান্ডারী ) তখন জীবিত ছিলেন। ঐ নিবন্ধটা ‘শাহানশাহ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী : ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব’ গ্রন্থে সন্নিবেশিত আছে)।
এই অধ্যায়ের শুরুতেই আমরা বলেছি যে, শাহানশাহ মাইজভান্ডারী তাঁর পূর্বসূরি ওলী-বুজুর্গদের ন্যায় ফলিত অর্থে একাধারে সংস্কারক এবং অব্যাহত প্রগতিশীলভাবে বিবর্তনশীল সংস্কার ঐতিহ্যের উৎসও বটে। আধ্যাত্ম জীবনের বাঁকে বাঁকে তিনি তাঁর কাছে আগত ব্যক্তি-মানুষ, প্রশাসক, রাজনীতিবিদ, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, ছাত্র, শিক্ষক, সমাজসেবক, গৃহী, গৃহিণী, শ্রমিক, মালিক তথা সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত প্রত্যেক মানুষকে তাৎক্ষনিক আত্ম সংস্কারমূলক প্রক্রিয়ায় উদ্বুদ্ধ করেছেন, যার প্রভাব ব্যক্তির নিজস্ব জীবন ও সমাজ জীবনে বিস্তৃত হয়। এ ধরনের অগণিত দৃষ্টান্ত তাঁর জীবনী গ্রন্থসহ বিভিন্ন রচনায় লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। এসব তথ্য আমাদের এ অধ্যায়ের প্রপোজিশনের অর্থাৎ তিনি ‘একাধারে সমাজসংস্কারক ও অব্যাহত সংস্কারের উৎস- এই উক্তির যথার্থতার প্রমাণ। তিনি ২ঃ১১২ আয়াতের মর্ম অনুযায়ী একাধারে আল্লাহতে সমর্পিত এবং অন্যের কল্যাণে নিবেদিত।
সমকালীন সমাজের বাস্তবতার আলোকে তাঁর তিনটা উক্তি এখানে উদ্ধৃত করছি; (ক) কবি জসীমউদ্দিনের একটি কবিতার প্রথম দু’চরণÑ ‘আমার এঘর ভাঙ্গিয়াছে যেবা আমি বাঁধি তার ঘর। আপন করিতে খুঁজিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর’- উচ্চারণ করে তিনি বলেন, ‘এটাই আমাদের নীতি। কেউ খারাপ করলেও তাদের ভালোটা করা উচিৎ।’ (খ) ‘মহাজ্ঞানী মহাজন, যে পথে করে গমন হয়েছেন চিরস্মরণীয়/ সেই পথ লক্ষ্য করে সেই কীর্তি ধ্বজা ধরে আমরাও হবো বরণীয়’- অতঃপর বললেন, অবশ্যই আমাদের লক্ষ্যবস্তু বা পথ সেটাই হওয়া উচিৎ।’ বলাবাহুল্য, তাঁর এই উক্তিতে সূরা ফাতেহায় ইঙ্গিতায়িত ‘সিরাতুল মোস্তাকীমের’ জন্য আকুতি ও প্রেরণারই বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্যষীয়। (গ) ইংরেজিতে বললেন, ‘রিমেমবার! এ ম্যান ক্যাননট্ লাভ ইন সোসাইটি উইদআউট কো-অপারেশন (মনে রাখবেন, কোন মানুষই সমাজে সহযোগিতা ব্যতীত বাস করতে পারেনা)। বলা বাহুল্য, এই উক্তি সেই সুপ্রাচীনকাল থেকে আজকের ইলেক্ট্রনিক কাল পর্যন্ত সর্বাবস্থায়, সব সমাজের জন্য প্রযোজ্য, কার্যকর এবং সমযুগের সমাজতত্ত¡বিদ, ধর্মতত্ত¡বিদ তথা কল্যাণকামী সব মানুষের অতি প্রত্যাশিত আকাক্সক্ষা। নবীজীর (দ.) ঐতিহাসিক মদীনা সনদ ব্যক্তিগত, সমাজগত, রাষ্ট্রগত, ধর্মগত, সাংস্কৃতিগত তথা সর্ববিষয়ে প্রত্যেক মানুষের শান্তিপূর্ণ যুক্তিসিদ্ধ, ভারসাম্যপূর্ণ সহযোগিতা ও সহাবস্থানেরই দলিল। শাহানশাহ মাইজভান্ডারী (ক.) সহযোগিতার দর্শনের শিকড় এই গভীরতা পর্যন্ত বিস্তৃত।
হযরত সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভান্ডারী (ক.) তাঁর বিখ্যাত ‘বেলায়তে মোতলাকা’ গ্রন্থে অর্জন প্রণালী ভেদে বেলয়তের চারটি প্রকরণের উল্লেখ করেছেন: (ক) বিল আছালত বা প্রকৃতিগত, (খ) বিল বেরাছাত বা রূহানী উত্তরাধিকারী রূপে প্রাপ্ত, (গ) বিদ দারাছত বা জাহেরী-বাতেনী শিক্ষা-দীক্ষার মাধ্যমে অর্জিত এলমে লদুনী, (ঘ) বিল মালামাত বা প্রবৃত্তি দমনপূর্বক অর্জিত বেলায়ত। বলাবাহুল্য, শাহানশাহ মাইজভান্ডারী (ক.) মধ্যে এই চার প্রকার বেলায়তেরই মহিমাময় সমাহার ঘটেছে। তাঁর জীবন ও কর্ম এবং এই আকিঞ্চন নিবদ্ধকারের মতো আরো অগণিত যেসব মানুষ তাঁর জীবন ও কর্মের প্রত্যক্ষ্য দর্শন ও অভিজ্ঞতা লাভে সৌভাগ্যবান, তাঁদের সবার উপলব্ধি ও অভিব্যক্তিত্বে তিনি আল্লাহতে সমর্পিত ও পরকল্যাণে নিবেদিত হিসেবে বিদ্যমান। দর্শনশাস্ত্র, সমাজ বিজ্ঞান, আধ্যাত্মিকবিদ্যা প্রভৃতি যেকোন মানদন্ডে ব্যাপক অর্থে তিনি একজন ক্রিয়াশীল সমাজ সংস্কারক এবং একই সাথে প্রগতিশীলভাবে বিবর্তনমুখী সমাজ সংস্কার চেতনার উৎসও বটে।

লেখক: সাংবাদিক