সমকালীন ছড়ায় মিজানুর রহমান শামীম

অনার্য আমিন

3

‘ছড়া পারে শোষকের
মিথ্যা ঘোষকের
টুটি চেপে ধরতে
ছড়া থাকে মানুষের পাশে বিনা শর্তে’
হ্যাঁ, ছড়াই মানুষের পাশে থাকে শোষণ, নির্যাতন অন্যায় অবিচার আর সুখের বার্তা পৌঁছে দিতে সবসময়। ছড়ার শৈল্পিক রূপ- দ্রোহের তেজদ্বীপ্ত লাইন শেষকের মসন্দ যেভাবে কাঁপায় ঠিক তেমনি আবার দোলনায় দুলতে থাকা ছোট্ট শিশুটির ঘুম পড়ানির গান হিসেবে কাজ করে। তাই ছড়া শুধু ছোটদের মনের খোরাক নয়। সব শ্রেণির মানুষের মনের কথাই প্রকাশ পায় ছড়ায়। বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি শাখাই জনপ্রিয়। কিন্তু ছড়ার মতো নয়। ছোট বেলা থেকেই আমরা ছড়ার সাথে পরিচিত হই। যখন একটি শিশু আধো আধো কথা বলতে পারে তখন থেকেই এই শিশুটির হৃদয়ে জায়গা করে নেয় ছড়া। আর সবাই জানে বারবার জানে ছড়াই বাংলা সাহিত্যের আদি স্তর। সেই প্রাচিন থেকেই ছড়া দ্রোহ-বিদ্রোহ, নির্যাতন ইংরেজ বর্গী তাড়াতে, অবিচার রুখতে আবার ছোট্ট সোনামনীদের স্বপ্নীল আকাশে দ্রæবতারা হয়ে জ্বলেছে এই ছড়া।
‘ছড়া দিয়ে সময়কে ধরা যায়
প্রতিবাদ প্রতিরোধ করা যায়
ছড়া দিয়ে বাঁচা যায় মরা যায়
কবিতার আগে আগে ছড়া যায়’
আসলেই কবিতার আগেই ছড়া পৌঁছে যায় মানুষের বোধগম্মের সদর দরজায়। ইংরেজদের এই উপমহাদেশ থেকে তাড়াতে ছড়াই অগ্রগামী ভ‚মিকা পালন করেছে। পরবর্তীতে ভাষা আন্দোলন স্বাধীনতা প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছড়া-ছড়াকাররা ভূমিকা রেখেছ। একজন ছড়াকার যখন দেশপ্রেমকে বুকে ধরে দেশের অনাচার রুখতে চায় তখন তার কলমের নিবে দ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। বিশেষ করে যখন মাতৃভ‚মিতে স্বাধীনুা হুমকির মুখে পড়ে তখন কবি সাহিত্যিকরা বসে থাকতে পারে না। তাদের অন্তরে ছন্দেরা জেগে ওঠে। জ্বালাময়ী রূপ নেয় ছন্দ। অরাজকতার ভ‚খন্ডে নজরুলের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। তার উত্তর সুরীরাও ধাপে ধাপে কার্যক্ষেত্রে ভ‚মিকা রাখছে ছড়া দিয়ে অন্যায় প্রতিহত করতে। সময়কে বুকে ধারণ করে সময়ের নানা অসংঘতি তুলে ধরছে তারা। তেমনি এক সাহসী লেখক- ছড়াকার মিজানুর রহমান শামীম। তার ছড়ায়-ছড়ার অন্তমিল রচনায় তিনি এক নতুন মাত্র সৃষ্টি করেছেন। অন্তমিল সৃষ্টির কুশলী বুননে মিজানুর রহমান শামীম অন্যদের থেকে আলাদা। শব্দের ডাঙ্গুলি ছড়ায় ছন্দের ভাংচুর, সমকালিন বিষয় চয়ন সবকিছুর তীক্ষèতা যেন এক একটি গতিমান মিসাইল। তিনি আপাদমস্তক একজন ছড়াকার। সাহিত্যের অন্যান্য দিকে তাঁর পদচারনা থাকলেও আমরা তাকে একজন সফল ছড়াকার হিসেবে চিনেছি। তিনি তার লেখনিতে এটাই প্রমাণ করেছেন। তিনি একজন সময় সচেতন লেখক। সময়ের চাহিদা ও পাঠকের রুচির বিষয়টি তিনি ধরতে পেরেছেন খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে। তাইতো তার জীবনের প্রথম দিকের ছড়াগুলো আর এখনকার ছড়াগুলো পাঠগ্রহণে একাই স্বাদের মুখরোচক। শিশুদের জন্য কিংবা বড়দের জন্য তার প্রতিটি লেখাই পাঠকের মনের দুয়ারটা খুলে দেয়। ভাবনায় ডুব দেয় পাঠক কিছুটা সময়। আর একজন শিল্পী এতেই তার শিল্পের সফলুা দেখতে পান। দীর্ঘদিন ধরে লেখ-লেখিতে আসা মিজানুর রহমান শামীমের প্রকাশিত গ্রন্থগলো হলো- সব পেটুকের দল, নুন আনতে পান্তা ফুরায়, রেল গাড়ি ঝিক ঝিক, হাল্কা কড়া লিমেরিক, দস্যি ছেলে, ঝিঁঝিঁ পোকার পাঠশালা, নির্বাচিত ছড়া, বালক খোজে পাখির পালক, ইরল বিরল চিরল পাতা ইত্যাদি। যাপিত জীবনের নানা অসংঘতি তার ইচ্ছাশক্তির দুয়ারে কড়া নাড়ছিল আর তিনি তা লেখনি শক্তিতে রূপদান করেছেন খুবই নিখটুত ও চমৎকার ভাবে। তাইতো তার ছড়াগুলো পাঠকের মনের দিগন্ত ছোঁয়ে যায় ভোরের আলোর মতো। জ্বলজ্বল করতে থাকে পাঠকের দুচোখ জুড়ে।
বর্তমান নগর জীবনটা দুরবর্তীসহ কালো ধোঁয়া হয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়তই। অপরিকল্পীত নগরায়ন, যট লাগা জানের বহর, লোডশেডিং এখনাকার নিত্যদিনের নগর চিত্র। এগুলোর মধ্যে আবার নতুন বিরক্তিরূপ নিচ্ছে ওয়াসা কর্তৃক রাস্তা খুড়ে জ্যাম সৃষ্টি করার চিত্র। কবি এই চিত্র তুলে ধরেছেন এভাবে-
আজ যদি হয় রাস্তা পাকা
কাল খুঁড়ে হয় বিল
আজ যদি হয় গুলিস্তানে
কালকে মতিঝিল।
নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। ঋতুভেদে নদী হাসে খেলে জলের সাথে। কিন্তু এই নদীর পানি নিয়েও হয় আমাদের দেশে রাজনীতি-ষড়যন্ত্র। প্রতিবেশী দেশ ভারত আমাদের নদীজল নিয়ে দীর্ঘদিন উপহাস করে আসছে। যা আমাদের জন্য ভীষণ হুমকির কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। বর্ষায় ডুবে মরা আর খরায় পুড়ে মরা। আমাদের তাগ্যের পরিণতি হচ্ছে। বর্ষায় ডুবে মরা আর খরায় পুড়ে মরা। আমাদের তাগ্যের পরিণতি হচ্ছে। ফারাঙ্কা বাঁধ নিয়ে ভারতের যে অনৈতিক ষড়যন্ত্র তা নিয়ে মিজানুর রহমান শামিম লিখেছেনÑ
আমার জলে ডুব সাঁতারে
বাধা কেন দাও?
আমায় জলে আমার নৌকা
তাতেও চোখ লাল।
দাদা
আসার জলের উৎস মুখে
দিচ্ছো কেন বাধা?
কিংবা,
টিপাই মুখের চিপায় পড়ে
বারাক নদী কান্দে
ধিনাক ধিনাক পিনাক বাবু
ফেলছে নতুন ফান্দে।
ক্ষমতায় দ্ব›দ্ব সেই সভ্যতা সৃষ্টির শুরো থেকেই চলে আসছে ফলাফলে দাড়িয়েছে রক্তের নদী, অসহায় নারী শিশুদের আহাজারী। আজ আমরা সভ্য জাতিতে নিজেদের পরিচয় দিচ্ছি। কিন্তু কোন লজ্জায় আজও জ্বলছে আগুন লেবানন, ফিলিস্থিত, ইরাক, আফগানিস্থান, মায়নমারের মতো দেশে, যেখান থেকে মা-শিশুদের কান্নায় আকাশ কান্নায় মেঘে জমে যায়। বোমা আর যুদ্ধ বিমানের ধোঁয়া আঁকাশ ছেঁয়ে যায় প্রতিদিন্য।
সেখানে আমরা নিজেকে সভ্য বলে দাবি করি। ভাবতে পারা যায় কতটা নিষ্ঠুর আমরা। তাইতো কবি দুঃখভরা ক্রান্ত হৃদয়ে কারো কাছে বিচার না দিতে পেরে ঐ নিরব আকাশের কাছে জানতে চেয়েছেন এভাবেÑ
জ্বলছে দেখো আজ লেবানন
জ্বলছে ফিলিস্তিন
কে মিঠাবে আজ ইরাকের ক্ষত
কুয়েত এখন রক্ত নদী
বহে নিরবধি
পথের ধূলোয় লুটের বাণী
বৌদ্ধ বিশুদের।
আকাশ তোমার বুক থেকে আজ
যুদ্ধ বিমান তাড়াও,
দুহাত তুলে দাঁড়াও
এক ফুঁকাতে বিমানগুলো দূর সাগরে ফেলো
বাতাস নিয়ে খেলো
আর কারো না শিশুর জীবন
যুদ্ধে এলোমেলো।
এবার তুমি শুদ্ধ বাতাস নাও।
দুর্নীতি বাংলাদেশের পুরনো একটি রোগ। অফিসের কেরানী থেকে শুরু করে বড়বাবু পর্যন্ত সবাইকে এরোগের ভাইরাসে আক্রান্ত। শারীরিজক রোগের যেমন বিভিন্ন রূপ নিচ্ছে তেমন দুস্তীরিত বিভিন্ন কয়দা আমাদের সমাজে প্রচলিত হয়ে আসছে। মিজানুর রহমান শামীম তার ঘুষ ছাড়ায় চমৎকার ভাবে একজন দুর্নীতিগ্রস্থ লোকের নিত্যদিনের খাবার রুটিনের কথা বলেছেন এভাবে-
চান আলী খান মতো ভাজা চমচম
দুধ চিনি খান তিনি খুব কম কম
বাকা নেই জানা তার
রোগ আছে নানা তার
খান কম তবে চলে ঘুষ হরদম।
মিজানুর রহমান শামীম লেখালেখির পাশাপাশি একজন নিষ্ঠাবান প্রকাশকও। দীর্ঘদিন ধরে কলম সৈনিকদের সাধনালি ফসলগুলো মলাবৈন্দী করে আসছেন তিনি। তাই তিনি সকল লেখকদের লেখা সম্পর্ক স্যামক স্থান রাখেন বিশেষ করে যারা তাঁর কাছে বই প্রকাশ করতে আসে। কবি লেখকদের পাশাপাশি তার প্রকাশনে প্রবেশ করেন নবীন লেখকরাও কেউ আবার আসেন কবি হিসেবে নিজের নাম জাহির করার জন্য। লেখার মান যাই হোক না কেন মোটা অংকের টাকা দিয়ে বই প্রকাশ করতে চান এমন অনেক নামধারী কবি ও শামীমের দারস্ত হন। কবি এমন কিছু কবিদের পরিচয় তুলে ধরেছেন এভাবে –
দিন নেই রাত নেই
ছন্দের হাত নেই
তবু লেখে ছড়া
ছড়া দেখে সকলের
চোখ ছানাবড়া
আমাদের দেশ যতটা না ছোট তার চেয়ে আমরা বেশি রাজনীতি করছি। দিনে দিনে তৈরি হচ্ছে একএকটি রাজনৈতিক দল। জনবল থুকুক আর না থাকুক তিনি একজন রাজনৈতিক দলের প্রধান এটাই তার পরিচয়। এই সব ক্ষমতা লোভী নেুাদের জনবল প্রয়োজন হয় না। টাকা আর অস্ত্রের বাহাদুরিতে তারা ক্ষমতার শিখরে আহরোন করতে চায়। কেউ কেউ করেছেন ও বটে। কবি তাদের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে।
লোকটার দল আছে
নেই জনবল
অস্ত্রের বাহাদুরি
তার সম্বল।
মিজানুর রহমান শামীমের অসংখ্য ছড়ায় এ রকম নানা অসংঘতি এ বাস্তব অনিয়মের চিত্র পরিষ্কার আয়নার মতো প্রতিয়মান হয়েছে।আমাদের আশা শুধু শামীম নয় তার মতো হাজারো ছড়াসৈনিক যদি সমাজ ও দেশের অসংঘতি তীর্যকভাবে সাহিত্যে তুলে ধরে তাহলে এ দেশটা সত্যিকারের সোনার দেশে পরিণত হবে।
আর যদি অন্যায়কে বুক পকেটে রেখে তেল নিয়ে ব্যস্ত থাকে তাহলে ব্দুচার টাকার পুরুস্কার নিয়ে দেশকে রূপকথার সোনার কাঠি রূপোর কাঠি দেখানোর মতোই হবে।
পরিশেষে বলবো- মিজানুর রহমান শামীমের এই বেগবান ছড়াচর্চা অব্যাহত থাকুক। সকল সাহিত্যেসেবী কবিরা প্রকৃত মানুষ হউক, সকল কবি সবার কবি হউক -..
রক্ত গোলাপ জলের কবি
মহতি এ সবার কবি
সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে
কবি তুমি সবার কবি হও…।