সব ধরনের জুয়া নিষিদ্ধ হাইকোর্টের এ রায় ঐতিহাসিক

43

ঢাকা-চট্টগ্রামসহ পাঁচ জেলার অভিজাত ১৩ ক্লাবসহ সারা দেশে সব ধরনের জুয়া খেলা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। একইসঙ্গে দেশের কোথাও জুয়ার উপকরণ পাওয়া গেলে তা জব্দ ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। ১৩ ক্লাবে জুয়া খেলা বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চার বছর আগে দেওয়া রুল যথাযথ ঘোষণা করে গত সোমবার বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি মো. মাহমুদ হাসান তালুকদারের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়। রায়ের পাশাপাশি হাইকোর্ট যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন তাও প্রণিধানযোগ্য। রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছে, যেসব খেলার ফলাফল শারীরিক কসরত বা দক্ষতার পরিবর্তে অর্থের বিনিময়ে ‘চান্স’ কিংবা ভাগ্য দিয়ে নির্ধারিত হয়, সেগুলোই জুয়া। এছাড়া প্রচলিত জুয়া আইন (পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট-১৮৬৭) অনতিবিলম্বে সংশোধনের জন্য সরকারকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, হাইকোর্টের এ রায় ঐতিহাসিক। এ রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্ট একটি সামাজিক অপরাধকে চিরতরে বন্ধ করেছে। যে অপরাধের কারণে সমাজে সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানিসহ নানা অসঙ্গতির বিস্তার ঘটে। সংসারে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। আগামীর সম্ভাবনাময় যুবক ও তরুণসমাজ নীতি ও নৈতিকতা হারা হয়। আমরা জানি, বর্তমান সরকার গত বছরের শেষের দিকে ঢাকা ও চট্টগ্রামের অভিজাত ক্লাবগুলোতে ক্যাসিনো নামক জুয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করে, যে অভিযানে সরকারের সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ অনেক নেতাকর্মী ধরাসয়ী হন। সরকার প্রধান নিজ দলের অপরাধীদের প্রতি শূণ্য সহানুভূতি প্রদর্শন করে জুয়ার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করেন। আমরা আমা করি, পবিত্র ইসলাম ধর্ম ও নৈতিকতা বিরোধী অপরাধ জুয়ার বিরুদ্ধে হাইকোর্টের এ রায় কার্যকরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো আন্তরিক হলে দেশ থেকে জুয়া নামক সামাজিক অপরাধ টির বিদায় নিবে।
উল্লেখ্য যে, আইন অমান্য করে রাজধানীসহ দেশের ১৩টি অভিজাত ক্লাবে অর্থের বিনিময়ে নিয়মিত হাউজি, ডাইস ও কার্ডের মতো অভ্যন্তরীণ খেলা আয়োজনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ ও তা বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন দুই আইনজীবী মোহাম্মদ সামিউল হক ও রুকনউদ্দিন মো. ফারুক। শুনানি শেষে একই বছরের ৪ ডিসেম্বর ১৩ ক্লাবে হাউজি, ডাইস ও কার্ড খেলা আয়োজনে নিষেধাজ্ঞা দেয় হাইকোর্ট। পাশাপাশি ওই ক্লাবগুলোতে অর্থের বিনিময়ে এসব খেলা বন্ধ ও আয়োজকদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়। পরে ঢাকা ক্লাবের করা আপিলের ওপর শুনানি নিয়ে একই বছরের ১১ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ হাইকোর্টের ওই আদেশ স্থগিতের পাশাপাশি রুল নিষ্পত্তির আদেশ দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় হাইকোর্ট এ রায় হলো।
রায়ের অপর এক পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছে, ‘ঢাকা মহানগর ও এর বাইরে থ্রি কার্ড, ফ্লাশ, হাউজি খেলার আয়োজন করা অপরাধ। হাউজি, ডাইস, ওয়ান টেন, চরচরির মতো অন্যান্য খেলা দক্ষতা ও শারীরিক কসরতের পরিবর্তে ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে। আইনে এগুলো নিষেধ আছে।’
পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়েছে, ‘সরকার ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে। আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয় যে, এ অভিযানের মুখ্য উদ্দেশ্য হলো ক্যাসিনো ও জুয়াকে নিরুৎসাহিত করা। আদালতের মতে, যারা এ ধরনের কর্মকান্ডে জড়িত, আইনের দৃষ্টিতে তারা অপরাধী। কেননা সংশ্লিষ্ট আইন ও মহানগর পুলিশ আইনে এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।’
প্রচলিত জুয়া আইন যুগোপযোগি করার তাগিদ দিয়ে হাইকোর্ট বলে, ‘এমন আইন তৈরি করতে হবে যাতে সব শ্রেণির মানুষের জন্য তা সমানভাবে প্রয়োগ হয়। কেননা অপরাধ ধনী ও দরিদ্রের ক্ষেত্রে সমান। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদেও বলা আছে, কারও সঙ্গে বৈষম্য করা যাবে না। সংশ্লিষ্ট আইন (পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট-১৮৬৭) সংশোধনের মাধ্যমে শাস্তির মেয়াদ বাড়ানো উচিত। সরকার এ ব্যাপারে অনতিবিলম্বে পদক্ষেপ নেবে বলে আদালত প্রত্যাশা করে।’