জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি

সব দেশকে এগিয়ে আসতে হবে

3

‘বিশ্ব এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। তাকে বাঁচাও, এটাই শেষ সময়’ এমনই আকুতি, উৎকণ্ঠা ও আর্তনাদে পোল্যান্ডের ক্যাটওয়াইচ শহরে শুরু হয়েছে ‘বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন-২০১৮’ বা ‘কপ-২৪’। সোমবার ২০০ টিরও বেশি দেশের ২৪ হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী এই আর্তি নিয়ে হাজির হয়েছেন সেখানে। দুই সপ্তাহের এ সম্মেলন শেষ হবে আগামী ১৬ ডিসেম্বর। জাতিসংঘের জলবায়ুু বিষয়ক সংস্থা ইউএনএফসিসিসি থেকে পাঠানো বার্তা সূত্রে মঙ্গলবার দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত সংবাদে বলা হয়েছে, সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেওয়া দেশগুলোকে সহায়তায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। গত কয়েক বছর ধরে এমন একটি ঘোষণার কথা আমরা শুনে আসছি, সে তহবিলের অংশ বাংলাদেশও পাচ্ছে- এমনটি সংবাদ বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকাগুলো প্রকাশ করে আসছে, কিন্তু পরবর্তিতে সেই ঘোষণা বাস্তবায়ন হয়েছিল কিনা তা আমাদের জানা নেই। এবারও যে তহবিল গঠনের কথা বলা হচ্ছে- কবে নাগাদ, কিভাবে এই টাকার সংস্থান ও ব্যবহার হবে তা কিন্তু জানায়নি সংস্থাটি। শেষ পর্যন্ত তহবিলের সংস্থান হলেও কারা এ তহবিলের অংশ পাবে তারও কোন তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। আমরা উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত যত সিদ্ধান্ত হচ্ছে তা বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈশ্বিক রাজনৈতিক পটভূমি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জলবায়ু পরিবর্তনের কথা অস্বীকার করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র জলবায়ু চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেছে। এদিকে ব্রাজিলে সদ্য নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বোলসোনারোর প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রকে অনুসরণ করার ঘোষণা দেওয়ায় জাতিসংঘের নেওয়া প্রক্রিয়াকে আক্রমণ করেছেন ট্রাম্প। এ পরিপ্রেক্ষিতে কারিতাস ইন্টারন্যাশনালের আদ্রিয়ানা অপরোমোলা সূচনা বক্তৃতায় যে কথা বলেছেন তা প্রনিধানযোগ্য। তার মতে, প্রতিদিন গোটা বিশ্বের দরিদ্র ও মানবেতর জীবনযাপন করা ব্যক্তিরা জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবের সম্মুখীন হচ্ছেন। এর রূপান্তর সম্ভব কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছাই পারে এই পরিবর্তনকে সম্ভব করতে।
বাংলাদেশের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের কী প্রভাব পড়বে- এ বিষয়ে বেশকিছু উদ্বেগজনক পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। ‘জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকিপূর্ণ দক্ষিণ এশিয়া’ শীর্ষক বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের ‘বাংলাদেশ চ্যাপ্টারে’ বলা হয়েছে, দেশে প্রতিবছর তাপমাত্রা ও অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ যেভাবে বাড়ছে, তা মোকাবেলায় ব্যবস্থা না নিলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে অর্থনীতি, জনগণের জীবনযাত্রা ও অবকাঠামো খাতের ওপর। সূত্র জানায়, ২০৫০ সালের মধ্যে বার্ষিক গড় তাপমাত্রা এক থেকে দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। এতে বাংলাদেশের ১৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। আর্থিক মূল্যে ক্ষতির পরিমাণ হতে পারে জিডিপির ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন প্রসপেক্টস দ্য ২০১৭ রিভিশন’ শীর্ষক বৈশ্বিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা দাঁড়াবে ২০ কোটি ২০ লাখে। অর্থাৎ তখন জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকবে দেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ। এটি বাস্তবিকই এক মহা দুশ্চিন্তার বিষয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যে এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে, তা স¤প্রতি বিশ্বব্যাংকেরই আরেক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ‘ইনহ্যান্সিং অপরচুনিটিজ ফর ক্লিন অ্যান্ড রিজেলিয়েন্ট গ্রোথ ইন আরবান বাংলাদেশ : কান্ট্রি এনভায়রনমেন্টাল অ্যানালাইসিস-২০১৮’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে সারা বিশ্বে পরিবেশ দূষণগত কারণে মৃত্যু হয়েছে ১৬ শতাংশ মানুষের। বাংলাদেশে এ হার অনেক বেশি। ২০১৫ সালে দেশের শহরাঞ্চলে পরিবেশ দূষণগত কারণে ক্ষতির শিকার হয়েছেন ২৬ লক্ষাধিক মানুষ।
এক বছরে দেশের অর্থনীতিতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা। এ অবস্থায় ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বেশকিছু অংশ তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা। এমনটি ঘটলে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের বাস্তুচু্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কাজেই জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলার পদক্ষেপ নেয়া দরকার জরুরি ভিত্তিতে। এক্ষেত্রে অধিক তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাত নিয়ন্ত্রণের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। আমরা আশা করছি সরকার এ বিষয়ে অত্যন্ত সজাগ, তবে বৈশ্বিক সহযোগিতা ছাড়া এ সমস্যা উত্তরণের কোন সুযোগ আমাদের আছে বলে মনে হয় না। কেননা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর ঝুঁকির দায়ভার বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলো এড়াতে পারে না।
পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য মূলত শিল্পোন্নত দেশগুলোই দায়ী। ইতোপূর্বে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের হার কমিয়ে আনার বিষয়ে যে মতৈক্য হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে বিশ্বের সব দেশকে এগিয়ে আসতে হবে।