দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে কর্মশালা

সবকিছু হারিয়ে বেঁচে রয়েছেন পঙ্গুত্বে

ওয়াসিম আহমেদ

17

সেদিন আমার স্বামী বাড়িতে ছিল না। তাই তাড়াতাড়ি বাচ্চাদের খাইয়ে ঘুমিয়ে যায়। মধ্যরাতের আগে শুনি পানি আসার উত্তাল শব্দ। কিছু বুঝে উঠার আগেই দেখি বাড়ির ভিতরে পানি। কিন্তু সে পানির স্রোত এত প্রবল ছিল যে, মিনিটেই বাড়ি তলিয়ে যাচ্ছিল। আমার তিন মেয়েকে সাথে সাথে গাছে তুলে দিই। তারপর একমাত্র ছেলেটিকেও। তাদের তুলে দিয়ে আমি ওঠার সুযোগ পাচ্ছিলাম না। পানির স্রোত আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। তাই তাড়াতাড়ি জীবন বাঁচাতে গাছের ডালে ঝুলে যায়।
কিছুক্ষণের মধ্যে পানির স্রোতের একের পর এক ধাক্কায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় আমার দুই মেয়ে ও একমাত্র ছেলে। সারারাত পানির মধ্যেই গাছের ডাল ধরে ঝুলেছিলাম। তখন থেকে আমি আর পা দুটো নাড়াতে পারি না। সকালে এক মেয়েকে জীবিত পাই আর নিজে বরণ করি আজীবনের পঙ্গুত্ব। মেয়ে আর ছেলেটির লাশও খুঁজে পাইনি। বেঁচে যাওয়া মেয়েটির বয়স তখন ৭ বছর। আমি হাঁটতে পারতাম না। তাই রিলিফ যেখানে দিত সেখানেও যেতে পারতাম না। আমার মেয়েটি হাতে হাতে যা পেত, তা দু’জনে মিলে খেতাম। চোখে অবিরাম জল আর কান্না চাপা কন্ঠে ৯১’র দুঃসহ স্মৃতির কথা বলছিলেন বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নের আরেফা খাতুন। তার দুঃখ এখানেও শেষ হয়নি। ঘূর্ণিঝড়ের পর তার স্বামী এসেছিল। তাকে দেখে দুঃখও প্রকাশ করেছিল। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই সংসার বাঁধলেন আরেক বউয়ের সাথে। ঘূর্ণিঝড়ের করাল গ্রাস থেকে বেঁচে যাওয়া মেয়েটিকে বিয়ে দিয়েছেন আরেফা। মেয়ে আর পঙ্গুত্ব নিয়ে এখনও দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে দিন গুণছেন জীবনাবসানের। গতকাল সকালে জেএসইউএস সিডিডি আয়োজিত ‘দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও মানসিক স্বাস্থ্য : প্রেক্ষাপট ও করণীয়’ কর্মশালায় ঘূর্ণিঝড়ের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক মিলনায়তনে বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন যুগান্তর সমাজ উন্নয়ন সংস্থা ও সেন্টার ফর ডিজএ্যবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্ট সিডিডির আইএসএফডিআরবি প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত ‘দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও মানসিক স্বাস্থ্য : প্রেক্ষাপট ও করণীয়’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (উপসচিব) ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী। চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কবি ও সাংবাদিক নাজিমুদ্দীন শ্যামলের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. শহীদুল ইসলাম, জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ, জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা অঞ্জনা ভট্টাচার্য, মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সুরজিত রায় চৌধুরী, দৈনিক প্রথম আলোর প্রতিনিধি উপ-সহকারী প্রকৌশলী (প্রশাসন) জুয়েল মজুমদার।
জেএসইউএস পরিচালক সাঈদুল আরেফীনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন যুগান্তর সমাজ উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ইয়াসমীন পারভীন।
ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেছেন, সবার মতামতের ভিত্তিতে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ফলে আগামীদিন দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতায় অগ্রগতি আসবে। এতে সমাজের প্রত্যেক শ্রেণী পেশার মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বর্তমানে দেশের আর্থ সামাজিক অবস্থার অনেক উন্নতি ঘটেছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের অনেক বাজেট ধরা হয়েছে। বর্তমানে সরকারের উদ্যোগে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্ঠনির আওতায় মানুষের জীবনযাত্রার মান অনেক সহায়ক হয়েছে।
এছাড়া প্রকল্পের মনিটরিং কর্মকর্তা ফারহান আরেফীন করিমের পরিচালনায় মুক্ত আলোচনার আয়োজন করা হয়। এতে বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের ঘূর্ণিঝড় উপদ্রæত প্রতিবন্ধি ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ জীবনের নানা ঘটনা বর্ণনা করেন।
বাহারছড়া ইউনিয়ন থেকে আগত দুর্যোগকালীন মুহূর্তের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন, আমান উল্যাহ, আশরাফ মিয়া, আরেফা খাতুন, সিপিপি সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান। মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন সিডিসি প্রতিনিধি লুৎফুন্নেছা রূপসা, সিডিএ প্রতিনিধি হাসান মনসুর, এইউডিসি প্রতিনিধি আলী আহমদ, ইপসা প্রতিনিধি শ্যামা প্রসাদ শ্রেয়া, উৎস প্রতিনিধি তাসলিমা আক্তার, এফডিপিও প্রতিনিধি জয়নাল আবেদীন।