সপ্তডিঙায় চড়ে এলো ঈদ

রুনা তাসমিনা

28

ওই তো! সে আসছে! টেলিভিশন খুললেই এখন তাকেই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। বড্ড বিরক্ত এখন অনিক ওটার ওপর। গোল চাকতিটা যখন চারপাশে মোরগ ফুলের মতো ঝুঁটি নিয়ে টেলিভিশনের পর্দায় আসে ভয়ের বদলে বিরক্তি। রাগ চেপে বসে অনিকের মনে।
-ওফ! আর দেখতে ইচ্ছে করেনা। বিরক্তিকর এই বিতিকিচ্ছিরি বলটাকে।
অনিকের কথায় হেসে দেয় বাবা।
-কি রে! বাবা! হঠাত এমন রাগ করছিস কেনো?
-করবো না তো কী? ঈদের আর কয়দিন বাকি আছে বলো? এই শয়তান বলটা আমাদের ঘর থেকে বেরোনো বন্ধ করে দিয়েছে। ঈদের ছুটিতে বন্ধুরা সবাই ঘুরতে যাবো প্ল্যান করেছিলাম। সব প্ল্যান ক্যান্সেল ওই বদমাশ বলের জন্য। টেলিভিশনের পর্দায় তখন অনিকের বদমাশ বল নামের করোনা ভাইরাসের ছবিটি ভাসছে। ওদিকে তাকিয়েই মনের ক্ষোভ ঝাড়ছিল।
অনিক খেয়ালই করেনি,তার দিকে গভীর মায়া নিয়ে তাকিয়ে আছে বাবা। ছেলে বড় হয়েছে কাজের ব্যস্ততায় চোখেই পড়েনি তার। সেদিনের সেই টুকটুক করে হাঁটা অনিক আজ দুরন্ত কিশোর।
-কী দেখছ এমন করে? বাবা হাসিমুখে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দেখে রাগ ভুলে হেসে দেয় অনিক।
-দেখছি,তোকে। তুই বড় হয়ে গেছিস। তা-ই দেখছি।
বাবার কথায় লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে অনিকের কান। কথার মোড় অন্যদিকে ঘুরানোর জন্য বলে,
-একটা আইডিয়া বের করতে হবে। দৈত্যটাকে আমরা জিততে দেবোনা। বাবা,তোমার ফোন থেকে ডাক্তার আংকেলের সঙ্গে একটু কথা বলবো। অফিসের ব্যস্ততা এত বেশি ছিল, খেয়ালই করেনি যে দিনে দিনে ছেলে শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পা রেখেছে। এমনিতেই অনিকের বয়সী ছেলেরা একটু জেদি হয়। চঞ্চল হয়। ছেলের কথামতো ফোন দেয় ডাক্তার বন্ধুকে। ডাক্তার আংকেলের সঙ্গে কথা বলেই খুশিতে চিৎকার দেয় অনিক।
-ইউরেকা! পেয়ে গেছি। বাবা, আমাদের মিশন সফল হলে আমরা সবাই ফ্যান্টাস্টিক একটা ঈদ করবো!
– কী পেয়েছিস? তোর ডাক্তার আংকেল কী বললো?
-বলবো। আগে বন্ধুদের ফোন দিই। ওদের সবাইকে না পেলে হবেনা। যেন সোনার হরিণ পেয়েছে। নিজের কামরার দিকে ছুটে যাচ্ছে বাতাসের মতো।
বেশ কিছুক্ষণ পর বাবার পাশে এসে বসে আবার। মুখটা খুশিতে জ্বলজ্বল করছে।
-ঈদি দাও বাবা।
-মানে! রোজা মাত্র শুরু হলো। ঈদি তো ঈদের দিন!
-না। এবার এখনই দিতে হবে। মা তোমারটাও।
মা ডায়নিং টেবিলে। ইফতারে খাওয়া থালাবাসন তুলে টেবিল গুছিয়ে রাখছিল। বললো,
-আমরা বিরাট প্ল্যান করছি বন্ধুরা মিলে। মা প্লিজ! হেল্প করো!
-আগে শুনিতো কী প্ল্যান করছিস।
-শুনবে। একটু পর বাবার ফোনে আমরা ভিডিও কনফারেন্স করবো।
মায়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই বাবার ফোনে রিং। অর্ঘ্য ফোন দিয়েছে। অনিক রিসিভ করার সঙ্গে সঙ্গে একে একে যোগ দিল সাহিল, ফারদিন, দীপ্ত,সৌম্য, ঋদ্ধ।
-আমি কিন্তু বাবা-মা’র সঙ্গে কথা বলে নিয়েছি। তোরা?
-আমরাও কথা বলেছি। তাহলে মিশন কবে থেকে শুরু?
-প্রথমেই টাকা যোগাড় করতে হবে। তিনদিনের বেশি সময় কাউকে দেয়া যাবেনা। অনিক বললো।
-সে তো হবে। চল্ একটা লিস্ট করে ে ফলি। ফারদিনের কথার জের ধরে ঋদ্ধ বললো,
-তোরা বল্। আমি লিখছি কী কী লাগবে।
-চা-পাতা, লেবু,ডেটল সাবান এই তিনটা। এগুলো দিয়েই আমরা কাবু করে ফেলবো ওই দৈত্যকে।
-সবাই কিন্তু মাস্ক আর গøাভস পরেই বের হবো। মনে থাকে যেনো।
-আমাদের এই কাজের ছবি যদি ইন্সটাগ্রামে পোস্ট করি তাহলে কেমন হয়? সাহিল বললো।
-গুড আইডিয়া। আরো অনেকেই আমাদের দেখাদেখি করবে। দেখিস।
-ঠিক আছে। তাহলে সবাই প্রস্তুতি নাও। আজ এই পর্যন্ত। কাল আবার কথা হবে।
ছেলে কী করতে চায় কৌতুহল অনিকের মা-বাবার। পাশে বসে শুনছে ওদের আলাপ।
-এবার বলি তোমাদের। ত্রাণ তো সবাই পেলো। কিন্তু তারপরেও কিছু মানুষ লকডাউন মানছে না। তাদের কারণে আক্রান্ত হচ্ছে অন্যরা। ডাক্তার আংকেল বলেছেন দিনে চারবার চা পান করলে, বিশ মিনিট পর পর সাবান দিয়ে হাত ধু’লে ওই দৈত্য ভয়ে পালাবে। চায়ের এন্টি এক্সিডেন্ট শরীরের ফ্রি রেডিক্যালস কার্যক্রম থামিয়ে মানুষের ভাইরাস থেকে রক্ষা করে। লেবুতে ভিটামিন সি। আর সাবানে হাত ধু’লে হাত থাকবে জীবানু মুক্ত। আমরা সাতজন সাতটা টিমের লিডার থাকবো। প্রত্যেক ঘরে ঘরে একবার এসব জিনিস দিয়ে আসবো। এবং চা পান করার সময় ও হাত ধোয়ার সময় ফিক্সড করে দেবো। এরপর প্রতিদিন খবর নেবো সবাই নিয়মগুলো মানছে কি-না। এভাবে আমরা আমাদের শহরটাকে করোনা দৈত্য মুক্ত করতে পারি।
-চমৎকার আইডিয়া। কিন্তু এত বড় শহরে এটা কী করে সম্ভব? বাবার উৎসাহে অনিকের সাহস বেড়ে যায়।
-তোমরা সাহস দিলে কেন পারবো না। দেখোনি আমাদের সেই ট্রাফিক আন্দোলন?
-সাহসী ছেলে আমার। কিন্তু সাবধানে থাকতে হবে তোমাদের। ছেলের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বাবা বললো।
ব্যাপারটা এতদূর যাবে অনিক কল্পনাও করেনি। হঠাৎ করে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়লো তার ফোন। বাবার বন্ধু, মামা, চাচু,ফুপি সবাই অনিকের পাশে! বাবার বিকাশ নাম্বারে জমা হচ্ছে টাকা! প্রতিদিন বসছে সাত বন্ধু মিটিংয়ে। তিনদিনে সাতজনের কাছে জমা হলো পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা! এতো টাকা হবে কেউ ভাবেও নি। অনিকের বাবাও যোগ দিল ওদের সঙ্গে। ডাক্তার আংকেল দিচ্ছে নিজেদের সুরিক্ষিত রাখার উপদেশ। ঈদের মতোই উৎসব উৎসব ভাব সবার মধ্যে। বাজার করাও হয়ে গেছে। পরদিন শুরু অনিকদের মিশন। আজ শেষ মিটিংয়ে বসেছে সবাই।
-আচ্ছা আমাদের দলের একটি নাম রাখলে কেমন হয়? সৌম্যর প্রস্তাবের সঙ্গে সঙ্গে দীপ্ত বলে, সপ্তডিঙা।
-সপ্তডিঙা! বাহ! দারুণ তো! নামটি সবার পছন্দ হয়।
পরদিন শুরু হয় ঘরে ঘরে সপ্তডিঙার অভিযান। ইন্সটাগ্রামে ছবি পোস্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিনন্দনের জোয়ারে ভাসে সাত কিশোর। বাবার ফেসবুক পেজে স্ট্যাটাস যায় সপ্তডিঙা নিয়ে। একসপ্তাহের মধ্যে চারদিকে বেশ সাড়া পড়ে যায়। পত্রিকা,টেলিভিশনে দেখানো হয় অনিকদের ছবি। তাদের দেখাদেখি এগিয়ে আসে আরও অনেক কিশোর। সাহায্য করছে পুলিশ। বড়রা দিচ্ছেন উৎসাহ। ঈদের বাকি আর চারদিন। অনিকদের চমকে দিয়ে টেলিভিশনের খবরে প্রচারিত হয়,অনিকদের শহর করোনা মুক্ত!
খবর দেখে বাবা-মা দু’জনেই জড়িয়ে ধরেন অনিককে। ভিডিও কনফারেন্সে সে-কী উল্লাস সাত কিশোরের!
-অনিক,তোদের বাসায় আসছি সবাই। আজ জম্পেশ আড্ডা হবে আন্টির হাতে বানানো নাস্তা খেতে খেতে।
-চলে এসো তোমরা সবাই। অনিকের হয়ে বাবাই উত্তর দেয়। খুশিতে উজ্জ্বল বাবার মুখ। মুখে বিজয়ীর হাসি নিয়ে অনিক দেখে টেলিভিশনে ব্রেকিং নিউজে লেখা আসছে-সপ্তডিঙার অসাধারণ উদ্যোগে চট্টগ্রাম শহর করোনা মুক্ত। সরকারের পক্ষ থেকে অভিনন্দন সপ্তডিঙার কিশোরদলসহ সকল কিশোরদের।
চাঁদ রাত। নাস্তা বানাতে মা শুনছে ফোনে অনিকের কথা।
-এবারের ঈদ হবে সবচেয়ে বেশি আনন্দের। তাই না রে? তোরা ক’য়টায় আসবি? কাল সারা শহর ঘুরবো সবাই মিলে। কতদিন বাইরে ঘোরা হয়নি!