পর্যটন ও ডেইরি শিল্প বিকাশের সম্ভাবনা

সন্দ্বীপ-কোম্পানীগঞ্জ সড়ক হলে পাল্টে যাবে দৃশ্যপট

সাইফ রাব্বী , সন্দ্বীপ

734

স্থলভাগ থেকে বিচ্ছিন্ন এক জনপদের নাম সন্দ্বীপ। সাগরের উত্তাল ঢেউ পাড়ি দিয়ে এখানকার মানুষকে যুগ যুগ ধরে দেশের মূল ভূখন্ডের সাথে যোগাযোগ করতে হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে সাগরের রুদ্রমূর্তির সাথে যুদ্ধ করে নৌকা-সাম্পানে, লঞ্চ-স্টিমারে দ্বীপবাসীর যাতায়াতের তিক্ত অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিনের। সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে মৌ. আজিজ, কবিয়াল অজিউল্যা, সাবেক সাংসদ মুস্তাফিজের মাতা এবং গত বছরের এপ্রিল ট্রাজেডি সহ বিভিন্ন নৌ দুর্ঘটনায় শত শত মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। হাতেগোনা ক’জন ছাড়া অনেকের লাশই পাওয়া যায়নি। সন্দ্বীপের হতভাগ্য যাত্রীদের নিয়ে ঐতিহাসিক বাদুরা জাহাজ ট্র্যাজেডি, বাড়বকুন্ডের লঞ্চ ট্র্যাজেডিসহ অনেক ট্র্যাজেডিই রয়েছে। এসব দিবসে স্বজন হারানোর বেদনায় আত্মীয়দের বুক ভারি হয়ে ওঠে। সাগরের উত্তাল তরঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াত থেকে মুক্তি পেতে এখানকার মানুষ হাজার বছর ধরে সড়কপথে যাতায়াতের মাধ্যমে সাগর পাড়ির স্বপ্ন লালন করে আসছেন। কিন্তু তাদের স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেছে, বাস্তবে পরিণত হয়নি। মূল ভূখন্ডের সাথে যোগাযোগের স্বার্থে প্রস্তাবিত সন্দ্বীপ-উড়িরচর-কোম্পানীগঞ্জ সড়ক বাস্তবায়ন প্রকল্পটি বর্তমানে এলজিইডিতে ফাইলবন্দী অবস্থায় পড়ে আছে। এটি বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘদিন ধরে দ্বীপবাসী দাবি জানিয়ে আসছেন।
মূল ভূখন্ডের সাথে যোগাযোগের জন্য এখানে বিআইডবিøউটিসি ও জেলা পরিষদ নিয়ন্ত্রিত কয়েকটি রুটের মাধ্যমে লঞ্চ ও স্টিমার সার্ভিস রয়েছে। শুধুমাত্র দিনের বেলায় এ সকল রুটে যাতায়াত সম্ভব হয়। ফলে জরুরি প্রয়োজন ছাড়াও চিকিৎসা সুবিধাবঞ্চিত দ্বীপবাসীদের মুমূর্ষু রোগী নিয়ে মারাত্মক বিপাকে পড়তে হয়। সময়মত চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে অনেক মূল্যবান জীবন। বর্ষায় গর্ভবতী মহিলাদের নিয়ে দুর্ভোগের অন্ত থাকে না। অনেক সময় গর্ভবতী মহিলাকে স্যালাইন সংযোগ দিয়ে উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে জীবনবাজি রেখে পাড়ি দিতে হয়। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় ঝূঁকিসহ এ সকল অত্যাবশ্যকীয় যাত্রা সিন্দাবাদের এ্যাডভেঞ্চারের মতই, যা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। পারাপারের প্রতিটি মুহূর্তই যেন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা। এত দুর্ভোগ-দুর্ঘটনার পরও দ্বীপের অসহায় মানুষের কথা চিন্তা করে অতীতের কোন সরকারই সড়কপথে যোগাযোগের কোন উদ্যোগ নেয়নি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এলজিইডি’র আওতায় সন্দ্বীপের সাথে উরিরচর হয়ে কোম্পানীগঞ্জের সাথে সড়ক যোগাযোগের একটি পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছিল। এ পরিকল্পনায় স›দ্বীপ-উরিরচর-কোম্পানীগঞ্জ সড়ক বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে উত্তর ও দক্ষিণ উরিরচরকে ক্লোজারের মাধ্যমে একীভূত করা হয়েছে। উরিরচরের উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত একটি সড়কও পাকাকরণ করা হয়েছে। স›দ্বীপের উত্তরাংশে সন্তোষপুরের একটি প্রধান সড়কের সাথে সংযোগ করা নদীর তীর পর্যন্ত ‘একতা বাঁধ নামে একটি বিশাল সড়ক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। উক্ত বাঁধ প্রতিষ্ঠায় স›দ্বীপের স্থানীয় জনগণেরও আর্থিক সহযোগিতা রয়েছে। স›দ্বীপের উত্তরাংশের একতা বাঁধের প্রান্ত থেকে উরিরচরের দক্ষিণাংশে পাকা সড়কের প্রান্ত পর্যন্ত ব্যবধান খুবই কম। প্রকৃতির স্বাভাবিক আচরণে উভয় প্রান্তে বর্তমানে চর জেগে ওঠেছে। দিন দিন উরিরচর ও স›দ্বীপের দূরত্ব খুব কাছাকাছি চলে আসছে। এ অবস্থায় একটি সড়ক বাঁধের মাধ্যমে উরিরচর-স›দ্বীপ যোগাযোগের সহজ সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।
অপরদিকে বর্তমানে উরিরচরের উত্তরাংশে থেকে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ব্যবধান নদীপথে খুবই কম। মাত্র ৫/৭ মিনিটে নৌকা পাড়ি দিয়ে সেখানে যাতায়াত সম্ভব। তাছাড়া সরকারি সংস্থা সিডিএসপি’র সুপারিশ অনুযায়ী দু’অংশেই ক্রসড্যামের প্রস্তাব করা হয়েছিল এবং কোম্পানীগঞ্জ প্রান্ত দিয়ে ক্রসড্যাম করার ব্যাপারে সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও এটি বাস্তবায়নে এখনও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না। কোম্পানীগঞ্জ প্রান্তে নদীর প্রশস্ততা মাত্র ১ কি.মি. হওয়ায় ক্রসড্যাম না হলেও এখানে বেইলি ব্রিজ দিয়ে সড়ক যোগাযোগ সৃষ্টি করা সহজ বলে অভিজ্ঞরা মতামত ব্যক্ত করেছেন। ইতোমধ্যে এটি বাস্তবায়নের জন্য ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে বলে এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে।
সন্দ্বীপ উপজেলার প্রকৌশলী বোরহান উল্যা জানান, ‘বিষয়টি নিয়ে গবেষণা চলছে, আশা করি খুব শিঘ্রই এ প্রকল্পটি অনুমোদিত হবে।’
সন্দ্বীপ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতা বলেন, ‘সন্দ্বীপের পশ্চিমে এখন মেঘনা প্রণালীর নাব্যতা নেই বললেই চলে। অল্প খরচেই সড়ক বাঁধ তৈরি করে দেশের মূল ভূখন্ডের সাথে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করে দ্বীপবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন এখন পুরণ করা সম্ভব। আশা করি অচিরেই এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে।’
দু’টি কম দূরত্বের এ জলপথকে সড়ক বাঁধ ও বেইলি ব্রিজের মাধ্যমে সংযুক্ত করে সন্দ্বীপ-উরিরচর-কোম্পানীগঞ্জ মহাসড়কটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে স›দ্বীপবাসীর সড়কপথে যোগাযোগের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করা যাবে বলে অনেকের অভিমত। সড়ক বাঁধ ও বেইলি ব্রিজের নির্মাণ খরচ কম দূরত্বের কারণে কম হবে বিধায় এটি বাস্তবায়ন এখন আর অসম্ভব নয়। উক্ত সড়ক প্রতিষ্ঠা করা গেলে স›দ্বীপের সাথে মূল ভূ-খন্ডের সরাসরি যোগাযোগ ছাড়াও এ প্রান্ত দিয়ে কম খরচে জাতীয় গ্রিড লাইন থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্যাস সংযোগ প্রদানের সহজ পথ সৃষ্টি হবে। উপজেলাওয়ারী বাংলাদেশের সর্ব্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রেরণকারী দ্বীপের প্রবাসীরা এখানে বিনিয়োগে উৎসাহী হবেন। ফলে সন্দ্বীপ-হাতিয়া-নোয়াখালীর উপকূলজুড়ে যে বিশাল আয়তনের চর জেগে উঠছে তাতে ডেইরি ফার্ম, ছোট খাটো শিল্প কারখানা সহ একটি চমৎকার পর্যটন এলাকা গড়ে তোলার উজ্বল সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।