স্বীকৃতি নয় ‘টার্গেট’ : মেয়র নাছির

সত্যিকার অর্থে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পেতে, নগরীতে যে উন্নয়নের কর্মযজ্ঞ চলছে তা সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে

ওয়াসিম আহমেদ

64

বাণিজ্যিক রাজধানী স্বীকৃতি নয় ‘টার্গেট’-এমন মন্তব্য করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেছেন, ‘দেশের বাণিজ্যের সিংহভাগ বন্দরনগরী চট্টগ্রামে হয়ে থাকে। তাই একে দেশের অর্থনীতির সূতিকাগার বলা হয়। আওয়ামী লীগ সরকার চট্টগ্রামের গুরুত্ব অনুধাবন করে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে এটাকে জাতীয় সংসদে বিল উত্থাপন করে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। তাই স্বীকৃতি হিসেবে নিয়ে মানদণ্ড করার সুযোগ নেই। চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার লক্ষ্যে কাজ চলছে, এটিকে আরো বেগবান করতে ‘টার্গেট’ নিয়ে কাজ করতে হবে।
‘চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার বিষয়টি কি শুধুই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি’ এমন প্রশ্নের জবাবে মেয়র এ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
মেয়র মনে করেন, চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে বাস্তবপক্ষে প্রতিষ্ঠিত করতে নগরীতে ব্যবসার সঠিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবসায়িক সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অবকাঠামোর সুদূরপ্রসারি সমন্বিত উন্নয়নের প্রয়োজন। এর পাশাপাশি মানুষকে যুগোপযোগী মন-মানসিকতার চর্চা করতে হবে। এ জন্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান সরকার তারই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়ে চট্টগ্রামের উন্নয়নের ভার নিজে নিয়েছেন। তার পর থেকে চট্টগ্রামের সমন্বিত উন্নয়ন দৃশ্যমান। এমনকি তা পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় ‘রেকর্ড’। নগরীতে অনেকগুরো সরকারি সেবা সংস্থা কাজ করছে। শুধু আমাদের সিটি কর্পোরেশনে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে গত ৪ বছরে। যা সিটি কর্পোরেশনের ইতিহাসে প্রথম।
আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, বন্দরের কারণে নগরীতে প্রতিদিন প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার ভারী ট্রাক প্রবেশ করে। এমন বিপুল সংখ্যক ট্রাকের ভার সহ্য করার মতো রাস্তা আগে নগরীতে ছিল না। তাই নিত্যদুর্ভোগে ব্যবসায়িক সম্ভাবনা কমছিলো। আর এখন অধিক প্রশস্ত এবং টেকসই রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে। পোর্ট কানেক্টিং এবং আগ্রাবাদ এক্সেস রোডের কাজ প্রায় শেষের দিকে। সড়ক দুইটি নির্মাণ কাজ শেষ হলে বন্দরনগরী আরো এগিয়ে যাবে।
তিনি জানান, ইতোমধ্যে শহরের অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোর অনেক কাজ হয়েছে। সর্বশেষ আমাদের ১ হাজার ২৩০ কোটি টাকার সড়ক নেটওয়ার্কিং প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। শীঘ্রই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে। সে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্পন্ন হলে নগরীতে আর কোনো কাঁচা রাস্তা থাকবে না। তবে এক্ষেত্রে একটি কথা নগরবাসীকে জানিয়ে রাখতে চাই; তা হলো- নগরীর সবগুলো সড়ক সিটি কর্পোরেশনের আওতায় নেই। নগরীর অনেকগুলো সড়ক বিভিন্ন সংস্থার অধীনে রয়েছে। আরেকটি সমস্যা হলো- মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের আওতাধীন কাজ করতে মিনিমাম একটি প্রশস্ততা লাগে। আমাদের শহরটি অনেক পূরণো এবং অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠায় কিছু সড়কের কাজ সিটি কর্পোরেশন নিজস্ব অর্থায়নে করবে। এছাড়াও নগরীর প্রত্যেকটি ব্যস্ত মোড় থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে যাত্রী ছাউনি করছি। যেটার মাধ্যমে নগরীর যাত্রী উঠা-নামায় শৃঙ্খলা ফিরবে।
প্রকৃত বাণিজ্যিক রাজধানী বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে সিটি মেয়র বলেন, শহরকে সত্যিকার অর্থে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ‘কর্মঘণ্টা’ বাঁচাতে হবে। নগরী যানজটের কারণে প্রতিদিন কোটি টাকার কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। সেক্ষেত্রে যানবাহন নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। তাদেরও একটি টার্গেট নিয়ে কাজ করতে হবে। নতুবা গতানুগতিকভাবে পরিবর্তন সম্ভব না। কর্মমুখী মানুষের কর্মঘণ্টা বাঁচাতে আমরা তৈরি করছি দুইটি ট্রাক ও কার টার্মিনাল। ফলে নগরীতে প্রবেশ করা ট্রাকগুলো রাস্তায় পার্কিং করে যানজট তৈরি করবে না। যা নগরীতে যানজট কমাতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এছাড়াও নগরীকে শতভাগ আলোকায়নের লক্ষ্যে কাজ চলছে। এলইডি লাইটিংয়ের ধারণাটি আমরা প্রথম প্রয়োগ করেছি। চলমান এলইডি লাইটিংয়ের সবগুলো প্রকল্পের কাজ শেষ হলে নগরী শতভাগ আলোকায়নের আওতায় আসবে।
তিনি আরো বলেন, নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে নগরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কোনো বিকল্প নেই। সেজন্য আমরা চট্টগ্রামকে গ্রীন সিটি ক্লিন সিটি হিসেবে গড়তে কাজ করছি। ময়লা ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন এনেছি। এখন মানুষের বাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ করা হয়। ডোর টু ডোর ময়লা সংগ্রহের মাধ্যমে নগরীতে ময়লা ব্যবস্থাপনায় আমরা ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। সিটি কর্পোরেশন প্রতিটি বাড়িতে ময়লার বিন দিয়েছে। সেখানে আমরা সফল হয়েছি। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘ মেয়াদী পরিবর্তনের পথে আমরা হাঁটছি। এটি বাস্তবায়নে আমরা নগরবাসীকে আরো একটি করে বিন দিবো। আর এবারের বিন হবে লাল রংয়ের। সবুজ রংয়ের ঝুঁড়িতে পঁচনশীল ময়লা রাখবে, আর লাল রংয়ের ঝুঁড়িতে অপঁচনশীল ময়লা রাখবে। ময়লা সংগ্রহের সময় ঠিক একইভাবে আলাদা করে সংগ্রহ করা হবে। ফলে পঁচনশীল ময়লাকে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার উৎপাদন কাজে ব্যবহার করা হবে। আবার অপঁচনশীল ময়লাকে রিসাইক্লিং করে বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যবহার করা হবে। প্রথমদিকে এটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে প্রয়োগ করা হবে। পরে নগরীর সবক’টি ওয়ার্ডে এ প্রক্রিয়ায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা হবে। তিনি বলেন, আমরা মূল সড়কের পাশ থেকে ডাস্টবিন সরিয়ে নিচ্ছি এবং এবছরের মধ্যে প্রায় সবক’টি ডাস্টবিন সরানো হবে। ডাস্টবিনের জায়গায় আমরা সৌন্দর্য বর্ধন করছি। ইতোমধ্যে নগরীর অনেক ডাস্টবিন সরিয়ে নান্দনিক সবুজে রূপান্তরিত করা হয়েছে।
সিটি মেয়র জানান, নগরীর ৬০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বাস করছেন প্রায় ৬০ লাখ জনগোষ্ঠী; যা অনেক বেশি। এতো বেশি জনবহুল শহরে সমন্বিত উন্নয়কে ফলপ্রসূ করা অনেক কঠিন। তাই শহরের পরিধিকে আরো বাড়ানোর চিন্তা করতে হবে। জলাবদ্ধতা প্রসঙে তিনি জানান, বর্ষার সময় জলাবদ্ধতার কারণে আমাদের বাণিজ্যের অনেক ক্ষতি হয়। এ জলাবদ্ধতাকে নির্মূল করতে পুরো শহর জুড়ে হাজার কোটি টাকার কাজ চলছে। সিটি কর্পোরেশন পাহাড়ের ক্ষয়রোধে বিন্নাঘাস প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এছাড়াও নগরীতে বিদ্যামান নালা পরিষ্কার রাখতে কাজ করে যাচ্ছে সিটি কর্পোরেশন।
তাঁর মতে, চট্টগ্রামকে সত্যিকার অর্থে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পেতে, নগরীতে যে উন্নয়নের কর্মযজ্ঞ চলছে তা সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এছাড়াও নগরবাসীকে মানসিকতভাবে উন্নত হওয়ার চর্চা করতে হবে বলে তিনি মনে করেন।