সংলাপ সমঝোতাই গণতন্ত্রের পথ

মীর আব্দুল আলীম

7

দেশের মানুষ শান্তি চায়, রাজনৈতিক বিবাদ চায় না। হরতাল অবরোধ, ভাঙচুর, জ্বালাও পোড়াও চায় না। এ জন্য সংলাপের বিকল্প নেই। সংলাপ হচ্ছে, সংলাপ সফল হবে, সংঘাত হবে না এটাই প্রত্যাশা দেশবাসীর।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন দ্বারপ্রান্তে। নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে একাদশ সংসদ নির্বাচনের লক্ষে। এমতাবস্থায় রাজনৈতিক অঙ্গনেসহ সারাদেশে নির্বাচনী হাওয়া বৈতে শুরু করেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোট প্রস্তুতি নিচ্ছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্যে। এর মধ্যে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন দল ও দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল। আওয়ামী লীগের সাথে মহাজোটভুক্ত ১৪ দলসহ জাতীয় পার্টিও রয়েছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং মহাজোটের বাইরে রয়েছে জামায়াতের ইসলামী, বিকল্প ধারা, এলডিপি কল্যাণ পার্টিসহ কয়টি দল রয়েছে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও মহাজোটের সাথে মূল নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। এরিমধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সিলেট ও চট্টগ্রামে জনসভা করে তাদের ঐক্যের উদ্দেশ্য লক্ষ্যের কথা জনগণের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
নির্বাচন হবে। সরকারও বর্তমানে আশা করে সকল দলের অংশগ্রহণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হউক। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাইরে থাকা সাবেক শাসক দল বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্টভুক্ত হওয়ায় দেশের রাজনৈতিক দল কার্যত দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে নির্বাচনের ব্যাপারে নানা শর্ত বিরোধী শিবিরের। এসব মানা না মানা নিয়ে রাজনৈতিক মাঠ ক্রমশই ঘোলা হচ্ছিলো। এমন সময় সিলেটের জনসভার পরই আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাধারণ সম্পাদক সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে সংলাপ চেয়ে চিঠি পাঠান গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। চিঠির উদ্দেশ্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফা ও ১১টি লক্ষ সংযুক্ত হয়েছে। চিঠির উদ্দেশ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা ও দলের সাধারণ সম্পাদক ও প্রভাবশালী মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের দাবি জানিয়ে।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সংলাপের ইচ্ছাপূরণ হচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাতে কোন রাগঢাক না রেখেই সংলাপে বসতে রাজি হয়েছেন। একদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সভাপতি হিসেবে শাসক দল আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে সংলাপ চেয়ে চিঠি পাঠানোর ঘটনাকে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা অবশ্যই দেশের জনগণের কল্যাণের স্বার্থেই। কেন না এক এগারোর মতো কোন পরিস্থিতি এদেশে জনগণ আশা করে না। সংলাপ সবসময় যেকোন সমস্যা সমাধানের উত্তম পন্থা। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল ও ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে সংলাপ হতেই পারে। তবে শর্তসাপেক্ষে সংলাপ কখনো সমঝোতার পক্ষে শুভ নয়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অর্থবহ ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য দেশের সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমঝোতা প্রয়োজন।
আমরা মনে করি দেশের প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এবং হালসময়ে জাতীয় ঐক্যফ্্রন্ট দেশের শান্তি চায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে সংঘাত না সংলাপ? এ প্রশ্নে জবাব জানতে সংবাদপত্রের নিচের ক’টি শিরোনামই যথেষ্ট- (১) আলোচনায় না এলে আবারো সংঘাত, (২) সংলাপেই শান্তি স্বস্তি। কোনটা শ্রেয় ? সংলাপ নাকি সংঘাত। সংঘাতের পথ ধরেই হাঁটছিলো আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো। দেশের শান্তির লক্ষ্যে এ মুহূর্তে সংলাপের বিকল্প নাই। তবে সংলাপের জন্য সংলাপ নয়; সংলাপ হোক দেশ ও জাতির স্বার্থে। সংলাপের ব্যাপারে এ তাগিদ বিভিন্ন দেশের। সংঘাতময় এ মুহূর্তে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা খুবই প্রয়োজন। এ জন্য সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। সংলাপ হচ্ছে, সংলাপ সফল হবে আর তাতেই জনগণ তথা দেশের স্বার্থ রক্ষা হবে। আমরা বরাবরই যা দেখি, দেশপ্রেম, ধৈর্য, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ দেশের রাজনীতি থেকে উধাও। এ অবস্থায় বর্তমান রাজনীতিতে বেশি করে গণতন্ত্র চর্চা এবং দেশাত্মবোধ তৈরির জন্য আমাদের জোর দাবি তুলতে হবে এবং সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। তা না হলে দেশ দিন দিন আরো অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে, যা জনগণ ও গণতন্ত্রের জন্য কখনোই কাম্য নয়। এ পরিস্থিতি আবার অগণতান্ত্রিক শক্তির উত্থানকে সুযোগ করে দিতে পারে। দুই পক্ষই অনড়। বোঝা যাচ্ছে সংলাপ সফল না হলে সামনের দিনগুলো আর ভালো যাবে না। সংঘাত আর নৈরাজ্য দেশবাসীর নিত্য সাথী হয়েই থাকছে। নেতা-নেত্রী, আমলা-মন্ত্রীদের কথার জালেই আটকে আছে রাজনীতির সকল কপাট। এর আগেও দেশে রাজনৈতিক সংলাপ হয়েছে। ফলাফল ছিলো কেবলই শূন্য। এবার যেন সংলাপ বিফল না হয়। আমরা জানি সংলাপের বিপরীত তো সংঘাত। সেটা দেশের জন্য, সরকারের জন্য, কারো জন্যই মঙ্গলজনক হবে না। দেশের চলমান সঙ্কট দূর করতে আমাদের রাজনীতিবিদদের এগিয়ে আসতে হবে । সঙ্কট যদি দূর হয়, তার কৃতিত্বের দাবিদার অবশ্যই তাঁদের। যদি সঙ্কট বাড়ে, তার দায়ও তাঁদের ওপর বর্তাবে। জনগণ আশা করে, তাঁরা দেশের সঙ্কট দূর করতে এগিয়ে আসবেন, বর্তমান অস্থিরতা থেকে জাতিকে মুক্ত করবেন। সেই পরিবেশ অবশ্যই রাজনীতিবিদদের নিশ্চিত করতে হবে। দেশের বিরাজমান নৈরাজ্য দূরীকরণে একসঙ্গে বসবেন এমনটি আশা করছে দেশের মানুষ। তবে নিরাশবাদীরা বলছে বাংলাদেশে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কোনোদিন সফল সংলাপে বসবেন না, আর যদি নিদেনপক্ষে ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে বসেন, সে সংলাপ কখনো বিফল হবে না। আমরা মনে করি দুই পক্ষই আন্তরিকভাবে চাচ্ছে সংলাপের মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসুক। কে কাকে রাজনৈতিকভাবে পরাস্ত করতে পারবেন, কিভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবেন, আর ক্ষমতায় যেতে পারবেন সে লক্ষ্যেই তারা না এগিয়ে জনগণের স্বার্থে সংলাপকে সফল রূপ দিবেন এটাই সবাই কায়মনে চায়।
বাস্তবে দেশে ব্যাপক উন্নয়ন হলেও রাজনীতির ক্ষেত্রে আলোহীন অন্ধকার আর ভুল পথেই চলছে বাংলাদেশ। অন্ধকার থেকে আলোর পথে কি দেশের রাজনীতিকে ফিরিয়ে আনা যায় না ? কর্দমাক্ত রাজনীতি আর সংঘাতময় পরিস্থিতি থেকে দেশকে উদ্ধার করা অবশ্যই সম্ভব। এমন সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে দেশের গণতন্ত্র আর বাঁচা-মরা নির্ভর করছে আমাদের বড় দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ আর বিএনপি এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ওপর। কিন্তু তারা কেউই সুস্থ রাজনীতি করছে না। ক্ষমতার রাজনীতিই তাদের কাছে মুখ্য বলে মনে হচ্ছে।
মানুষ মরে; রক্তাক্ত হয় জনপদ। তাতে কেবল সম্পদই নষ্ট হয় না দেশের ভাবমূর্তি ক্ষয়ে ক্ষয়ে নিস্ব হয়। হোঁচট খায় দেশীয় অর্থনীতি। ব্যবসা বাণিজ্যে অচলাবস্থা দেখা দেয়। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর কোথাও কথায় কাজে মিল পাওয়া যাচ্ছে না। ক্ষমতায় টিকে থাকা আর ক্ষমতার লোভ আমাদের দলগুলোকে অন্ধ করে দিয়েছে। তাঁরা যা করছে তা কেবল ক্ষমতার জন্যই করছে। জনসম্পদ, রাষ্ট্রীয় সম্পদ, দেশের অর্থনীতি, দেশের ভাবমূর্তি কোনটারই তোয়াক্কা করেন না তাঁরা। এ অবস্থায় রাজনীতিকে সংঘাতময় পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করতেই হবে। এবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিওে যেন আর সংঘাত না হয় এটাই আমরা আমাদের রাজনীতিবিদদের কাছে প্রত্যাশা করছি। গণতন্ত্রে সরকার ও বিরোধী দল থাকবে এবং তাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে- এটাই স্বাভাবিক। আর এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। তবে তাদের মধ্যে সহনশীলতা অবশ্যই কাম্য। দেশের কথা, জনগণের কথাও ভাবতে হবে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে। ধৈর্য মহৎ গুণ। কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও শুধু নিজেদের অবস্থানে অনড় না থেকে জনগণের কথা ভেবে পরস্পর আলোচনায় বসতে হবে। ধৈর্য, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ইত্যাদি বর্তমান রাজনীতিতে বেশি করে চর্চা করার জন্য আমাদের জোর দাবি তুলতে হবে এবং সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। তা না হলে দেশ আরো অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে, যা জনগণ ও গণতন্ত্রের জন্য কখনোই কাম্য নয়। এ পরিস্থিতি আবার অগণতান্ত্রিক শক্তির উত্থানকে সুযোগ করে দিতে পারে, যা আমরা চাই না। ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি প্রবল গণআন্দোলনের মাধ্যমে সরকার উৎখাতের ঘোষণা দিয়েই চলছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কেউ কেউ বিরোধী দলকে নানাভাবে উসকানি দিচ্ছেন। এই বলে তাঁরা হুমকিও দিচ্ছেন যে বিরোধী দল রাস্তায় নামলে আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী বসে থাকবে না। এ ধরনের পাল্টাপাল্টি হুমকিতে নাগরিকরা উদ্বিগ্ন। কারণ, বিরোধী দল রাস্তায় নামলে সরকারি দল তা প্রতিহত করার চেষ্টা করবে। এ কাজে তারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করবে। এর কোনোটাই দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না। নিঃসন্দেহে এর ফলে সহিংসতার সৃষ্টি হবে। এর পরিণতিতে জনগণের জানমালের ক্ষয়-ক্ষতি হবে। শান্তিপ্রিয় নাগরিক হিসেবে আমরা রাজপথে আন্দোলনের নামে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা চাই না। সংঘাত নয়, সংলাপ ও সমঝোতাই গণতন্ত্রের পথ। সংলাপের জন্য উভয়পক্ষকে মুক্তমন নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। আর সেই দিনের প্রত্যাশায় রইলাম আমরা।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট