সংঘাত পরিহার ও সুন্দরের পথচলা

চৌধুরী মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম

74

এতিমের দুই কোটি টাকা দুর্নীতির দায়ে জেলে গেলেন তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়ার জেলে যাবার দিন ও পরবর্তী বিএনপি’র সহিংসতা নিয়ে মানুষের মনে যে গভীর শংকা ছিল বিএনপি’র শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কারণে তা আপাতত দূর হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ মনে করেছিল খালেদা জিয়ার কারারুদ্ধতার পর বিএনপি পুরানো সহিংস রুপে “পেট্রোল বোমা” পদ্ধতিতে ফিরে যাবে আর সরকার তাদের দমন করবে। কিন্তু বিএনপি অতীতের মানুষ পোড়ানোর মত অমানবিক সহিংসতা, আন্দোলনে মানুষের ঘৃণা, প্রত্যাখ্যান ও আওয়ামীলীগের ফাঁদের কথা চিন্তা করে সহিংসতা পরিহার করে শান্তিপূর্ণ কর্মসুচি পালন করে। যদিও আওয়ামীলীগ এটাকে দুর্বলতা বলছে। সহিংসতা পরিহারে মুলত এতে মানুষের মনের শংকা দূর হয়ে বিএনপি প্রশংসিত হয়েছে। নির্বাচনের বছরে বিএনপি শক্তি ক্ষয়ের পথে না গিয়ে আইনের পথে যাওয়াটাকে চাতুরতা, শুভবুদ্ধির উদয় ও রাজনীতির গুনগত পরিবর্তন বলা যেতে পারে। তাছাড়া আইনি বিষয় আইনিভাবে করাটাই শ্রেয় মনে করেছে বিএনপি। জ্বালাও পোড়াও, হরতাল, অবরোধের মত কর্মসূচিতে জনসমর্থন নেই তা দেরিতে অনুধাবনে বিএনপি তিন বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুক্তির দাবীতে মানববন্ধন, গণস্বাক্ষর, স্মারকলিপি প্রদানের মত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছে। এই সুন্দরের সরস উদাহরণ সব রাজনৈতিক দলের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। তবে তড়িঘড়ি করে দলের গঠনতন্ত্রের ৭ ধারা সংশোধন করে দুর্নীতির দায়ে লন্ডনে বসবাসরত ব্যক্তির ভাইস চেয়ারম্যান করাটা সাধারণ জনগণ যেমন সহজে নেয়নি। তেমনি দলটির একটি অংশ বিদেশীরাও মনে হয় ভাল ভাবে নেবেনা। কেননা তিনি দীর্ঘদিন দুর্নীতির মামলার সাজার খড়ক মাথায় নিয়ে তিনি লন্ডনে বাস করছেন । তিনি যদি দলের সভাপতি না হয়ে দলের ত্যাগী , বিশ্বস্ত, জৈষ্ঠ কেউ হতেন তাহলে বিএনপি দেশে বিদেশে আরো বেশী সমাদৃত ও প্রশংসিত হত। দুর্নীতির কথা বলতে গেলে হলমার্কের সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার নিয়ে কথা বলাতে বিরক্ত হয়ে অর্থমন্ত্রী এই টাকাকে সামান্য বলে অতি বিরক্ত প্রকাশ করেছিলেন। পরে অবশ্য সে বিরক্তির যথার্থ প্রমাণও হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। শেয়ার বাজারের ধস, বেসিক ব্যাংক , এবি ব্যাংক, ফরমাস ব্যাংক, সর্বশেষ জনতা ব্যাংকের দুর্নীতি ব্যাংকিং খাতকে ধ্বংস করে দিয়ে প্রমাণ করেছে সত্যিই চার হাজার কোটি টাকা কিছুই না!!!। হাজার হাজার কোটি টাকার লুটপাটকারীরা নিরাপদে আছেন। দেশের সাতাশি জনের নাম পানামা, প্যারাডাইস পেপারে আসলেও কোন সরকারের আমলে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে এসব জনঅর্থ লুটপাকারীরা বেপরোয়া, ধরাছোঁয়ার বাইরে। অপ্রতিরোধ্য মানসিকতায় নতুন নতুন খাতে জঘন্য থাবা দিয়ে দেশের অর্থনীতি মুমূর্ষু করে দেয়। নামে বেনামে জনগণের অর্থ লোপাট, বিদেশে পাচার করে। বেগম খালেদা জিয়ার কারারুদ্ধ, নির্বাচনে অংশগ্রহণ মূলত আদালতের এখতিয়ার। বিষয়টির রাজনৈতিক রং বাদ দিলে প্রমাণ হল অপরাধের ক্ষেত্রে প্রভাবশালীরা আইনের উর্ধ্বে নয়। প্রয়োজন সততা, সদিচ্ছা। এটি অন্যান্য দুর্নীতিবাজদের জন্য সতর্কবার্তাও বটে। সব দুর্নীতিবাজদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করাটা দরকার। দুর্নীতি হ্রাসের সূচকে বাংলাদেশের তিন ধাপ এগিয়ে আসাটা শুভকর হলেও রাঘব বোয়ালদের আইনের আওতায় আনা হয়নি। তাদের আইনের আওতায় আনলে দুর্নীতি অরো কমে আসবে। দেশ এগিয়ে যাবে। ২০১৮ সাল হল নির্বাচনের বছর। ২০১৪ সালে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে ঐক্যমতের প্রচন্ড অভাবে ৫ জানুয়ারি ভোটার বিহীন নির্বাচনের সংকটটি আবারো সামনে চলে এসেছে। বিএনপি নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে সরকারের সাথে আলোচনার কথা বললেও আওয়ামীলীগ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনের কথা বলে আসছে। বেগম খালেদা জিয়ার কারারুদ্ধতায় বিএনপি নতুন করে সংকটে পতিত হল। দেখার বিষয় সে সংকট বিএনপি কিভাবে মোকাবেলা করে এবং কোন পথে যায়। তাই বলা যায় এই সংকট নির্বাচনের সংকট। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, নির্বাচনে বিএনপি না এলেও সমস্যা নেই, নির্বাচন বয়কটের শক্তি বিএনপি’র নেই। বয়কটের শক্তি না থাকলেও বিএনপি’র মত বড় একটি দল নির্বাচনে না এলে অবশ্যই সংকটের সৃষ্টি করবে। সে সংকট দেশকে কোথায় নিয়ে যায় তা বলা মুশকিল। জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যে একটি সুষ্ট নির্বাচনের কথা বলেছে। বিএনপি বলছে খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচনে যাবে না। এটিও গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর নির্বাচনের বিষয়টি সম্পূর্ণ আদালতের উপর নির্ভরশীল। সুতরাং সকলের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিৎ। তাছাড়া দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটির বহু নেতাকর্মীরা জেলে থাকা অবস্থায় ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার মত ভুল করবে বলে মনে হয় না। বেগম খালেদা জিয়ার কারারুদ্ধতায় দলের ভাঙনের ঝুঁকিও উড়িয়ে দেয়া যায় না। ঘরে বাইরের সমস্যা বিএনপিকে অস্থির করে তুলবে তাতে সন্দেহ নেই। বিএনপি যেহেতু আইনের পথে হাটতে গিয়ে সহিংসতা পরিহার করেছে। তাই তাদের উচিৎ হবেনা নির্বাচনের ট্রেন মিস করা। বিএনপি’র সামনে এখন তিনটি কঠিন কাজ এক. তাদের নেত্রীকে জেল থেকে মুক্ত করা দুই. দলের ঐক্য অটুট রাখা। তিন. নির্বাচনে সরকারকে সমঝোতায় রাজি করা। নির্বাচন নিয়ে সংঘাত আমাদের দেশে পুরানো সংস্কৃতি। একদল ক্ষমতা ছাড়তে চায় না। অন্যদল ক্ষমতায় যেতে মরিয়া। দু’দলেরই লক্ষ্য ক্ষমতার স্বাদ নেয়া। এখন প্রশ্ন হল ক্ষমতায় যাওয়ার মাধ্যমে নির্বাচন কি সকল সমস্যার সমাধান, গণতন্ত্রের অন্যতম উপায়?। যদি সেটি হত তাহলে বাংলাদেশে নির্বাচন কম হয়নি। তাই বলে কি দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র, মুক্তি এসেছে?। একটি নির্বাচন দেশকে সাময়িক পরিবর্তন এনে দিলেও মূল সমস্যা থেকে যায় যুগ যুগ ধরে। নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে প্রাণঘাতি সংঘাতে প্রতি পাঁচ বছর পর পর দেশ সংকট, সংঘাতে নিমজ্জিত হয়। ক্ষমতার পালাবদল হয়। কিন্তু নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে কোন স্থায়ী সমঝোতা হয় না। স্বাধীনতার সাতচল্লিশ বছরে এসে শিক্ষা, প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তি, সমৃদ্ধির পথে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে আমরা এখনো নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে সংঘাতে জড়িয়ে প্রাণ, সম্পদ, ইমেজ ক্ষতি কিংবা পিছিয়ে যেতে পারি না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি’র নির্বাচনে বিএনপি’র না আসাটা যেমন ভুল ও দেশের সমৃদ্ধির জন্য ক্ষতিকর ছিল তেমনি ভোটার বিহীন নির্বাচনও দেশ বিদেশে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। সুতরাং দেশের মঙ্গলের জন্য একটি সুন্দর, অংশগ্রহণমূলক, নিরেপক্ষ নির্বাচন আবশ্যক। বিএনপি যেভাবে তাদের নেত্রীর মুক্তির দাবিতে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। তেমনি আওয়ামী লীগেরও উচিৎ একটি অংশগ্রহণমূলক, নিরেপক্ষ নির্বাচনের পথ খুঁজে বের করা। সকল দলের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে সংঘাত পরিহার ও সমৃদ্ধির পথে চলমান স্রোত প্রবাহিত রাখা। “কেউ নির্বাচনে না আসলে কিছু হবে না” যেমন শংকার তেমনি “নির্বাচন হবে না, হতে দেয়া হবে না” জাতীয় কথাবার্তাও শংকার। সে শংকা প্রাণহানির, সম্পদ নষ্টের, দেশ পিছিয়ে যাবার। দেশের, জনগণের জন্য রাজনীতি করার কথা বলে জনসংঘাতের দিকে দেশকে ঠেলে দেয়া কখনো শুভকর নয়। আমরা যদি আমাদের ইগো প্রবলেম বাদ দিয়ে উদার মানসিকতায় দেশের কল্যাণে এগিয়ে আসি। আলোচনার মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু, নিরেপক্ষ নির্বাচন করে দেশেকে সংঘাত, পিছিয়ে যাবার পথ থেকে টেনে তুলে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে দিয়ে একটি সমৃদ্ধ, সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব। আর সেটি হতে পারে কেবল রাজনীতিবিদদের হাত ধরে জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে। ষোলকোটি বাঙালি আর কোন সম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ, সংঘাতের বাংলাদেশ চায় না। আমরা সুন্দরের কথা বলতে চাই। সুন্দরের গল্প শুনতে চাই। চাই একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ, উন্নত গণতন্ত্রের দুর্নীতিমুক্ত শান্তির বাংলাদেশ। সে সুন্দরের পথচলা হোক ২০১৮ সালের নিরেপক্ষ, অংশগ্রহণমূলক একটি সুন্দর নির্বাচনের মাধ্যমে।

লেখক : প্রাবন্ধিক