সংকটে আবাসন খাত সমাধানে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে

20

বাসস্থান মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম একটি। ছোট্ট দেশ অথচ বিশাল জনসংখ্যা। মাতাগুজার ঠাই করতে মানুষ মরিয়া। কৃষি ও ফসলি জমি ভরাট করে যখন বাসস্থান তৈরিতে মানুষ ব্যাকুল তখন স্বল্প জমিতে বিশাল অট্টালিকা নির্মাণ করে তাতে একাধিক পরিবারের আবাসনের উদ্যোগ নেয় সরকার। এখাতটিকে বেসরকারি পর্যায়ে উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে এখাতটি মাত্র দুই দশকের কম সময়ে ব্যাপক সম্প্রসারিত হয়। এতে এ বেসরকারি আবাসন খাতটি মানুষের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবেও অবদান রেখে আসছে। দেশের অর্থনীতিতে জিডিপির শতকরা ১৫ ভাগ যোগান দিচ্ছে এই শিল্প খাত। কিন্তু ওয়ান ইলাভেনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এ বেসরকারি আবাসন খাতটি যেভাবে পিছিয়ে পড়ছে বর্তমান সরকার বেশকিছু ক্ষেত্রে প্রণোদনা দেয়ার পরও তা কাটিয়ে উঠা সম্ভব হচ্ছে না বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। এরফলে এখাতে বিনিয়োগকারী ব্যবসায়ী, অংশিদার, ফ্ল্যাটের বুকিংদাতা, ইট, বালি, সিমেন্ট, রট, রং, সিরামিক শিল্পকারখানাসহ এখাতে সংশ্লিষ্ট কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারি ব্যাপক ক্ষতির সন্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এতে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। কাজেই এখাতটিকে বাঁচাতে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। সূত্র জানায় এই শিল্পের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে আরো ২৬৯টি শিল্প খাতের ১২ হাজার প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে চট্টগ্রামে রয়েছে দেড় শতাধিক কোম্পানির প্রায় চারশতাধিক প্রতিষ্ঠান। শুক্রবার দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে রিহ্যাব সূত্রে উল্লেখ করা হয় যে, চট্টগ্রামে আবাসন ব্যবসায় রিহ্যাবের প্রায় দেড় শতাধিক কোম্পানি (ঢাকার কোম্পানিসহ) ব্যবসায় নিয়োজিত রয়েছে। চট্টগ্রামে এ খাতে মোট বিনিয়োগ ৫ হাজার কোটি টাকা। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিরাজমান অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে হস্তান্তরযোগ্য এবং নির্মাণাধীন প্রায় ২৭০ টি প্রকল্প হস্তান্তর বা নির্মাণ সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। যার কারণে শিল্পটি বর্তমানে চরমভাবে আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বর্তমানে এসব কোম্পানির অধীনে প্রায় দশ হাজার অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। যার মধ্যে সাড়ে ৪ হাজার অ্যাপার্টমেন্ট সমস্যাগ্রস্ত। সমস্যাগ্রস্ত এসব অ্যাপার্টমেন্টের অধীনে ভূমির মালিককে প্রতিমাসে ভাড়া দিতে হচ্ছে ৫ কোটি টাকা। ফ্ল্যাট গ্রহীতাকে মাসিক ভাড়া দিতে হচ্ছে ২০ কোটি টাকা। তাছাড়া মাসিক ব্যাংকের সুদ দিতে হচ্ছে প্রায় ১৫ কোটি টাকা। সমস্যাগ্রস্ত এসব অ্যাপার্টমেন্টে বিদ্যুতের মোট চাহিদা রয়েছে ৬০ হাজার কিলোওয়াট এবং গ্যাসের সংযোগের প্রয়োজন রয়েছে সাড়ে ৬ হাজারটি। সমস্যার মূল কারণ হচ্ছে ব্যাংক সুদ, পূঁজিবাজারের ধস, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ এবং সরকারের বিশেষ প্রণোদনা। আমাদের পত্রিকার প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম রিহাবের শীর্ষ এ কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ব্যাংক সুদের হার কমানোর কথা বলা হয়েছে, কিন্তু এখনো ব্যাংকগুলো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। কিছু কিছু ব্যাংক সুদের হার কমালেও এখনো বেশিরভাগ ব্যাংক কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। এটা খুবই প্রয়োজনীয়। সামগ্রিকভাবে আবাসন খাতের জন্য সরকার একটি ফান্ড সৃষ্টি না করলে এ সেক্টর ঘুরে দাঁড়াবে না। দিন দিন এ সেক্টর খুবই খারাপের দিকে যাচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান আবাসিক ভবনের নির্মাণকাজ ধরেও শেষ করতে পারেনি। এমনকি রিহ্যাব ফেয়ারে ফ্ল্যাট বুকিং দিয়েছিলেন এমন অনেক ক্রেতাই এখন বুকিং বাতিল করে দিচ্ছেন। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে আবাসন শিল্পকে আবারও সজিব করতে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের যেসব প্রস্তাবনা রয়েছে সরকারের উচিৎ হবে তা বিবেচনায় নেয়া। বিশেষ করে, স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশে রয়েছে। শিল্পঋণ সুবিধা প্রচলন, নগদ ও খুচরা পণ্য ক্রয়ে ভ্যাট ও উৎস কর বন্ধ, রেজিস্ট্রেশন ব্যয় ৪ শতাংশে নামিয়ে আনা, সেকেন্ডারি মার্কেটে রেজিস্ট্রেশন ব্যয় আরো কমানোর বিষয়টি নিশ্চিত করা। এসব দাবি ব্যবসায়ীদের হলেও আমাদের কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয়। আমরা আশা করব, দেশের এই উদীয়মান খাতকে এগিয়ে নিতে সরকার সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।