শ্রীশ্রী চন্ডীতীর্থ মেধস আশ্রম

8

প্রকৃতির লীলাভূমি, সৌন্দর্যের প্রতীক, পাহাড়ী অঞ্চলে অবস্থিত সনাতন ধর্মের শ্রীশ্রী চন্ডীতীর্থ মেধস আশ্রম। এখানে পুরাকালে সাধনা করতেন
ঋষি মেধস মুনি।
ইতিহাস : পুরাকালে রাজা সুরথ রাজ্যহারা হয়ে বনে বনে ঘুরছিলেন। আর সমাধি বৈশ্য তাঁর পারিবারিক অশান্তিতে অতিষ্ঠ হয়ে তিনিও বনে চলে যান। একদিন গভীর বনের মধ্যে দু’জনের দেখা হয়ে যায়। তখন একে অপরকে তাঁদের দুঃখের কথা জানান। দু’জনে দুঃখ থেকে পরিত্রাণের জন্য পরামর্শ করে বনে থাকা মেধস আশ্রমে যান এবং ঋষি মেধস মুনির আর্শীবাদ প্রার্থনা করেন। তখন মেধস মুনি তাঁদেরকে শ্রীশ্রী দূর্গা দেবীর আরাধনা করার জন্য পরামর্শ দেন। মেধস মুনির পরামর্শ মত সুরথ রাজা ও বৈশ্য সমাধি শ্রী শ্রী দূর্গাদেবীর সাধনা করতে থাকেন। তাঁদের দু’জনের সাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে দুর্গাদেবী তাঁদের দু’জনকে আর্শীবাদ করেন। আর তখন থেকে দুর্গোপূজার উৎপত্তি হয়। তারপর রাজা সুরথ রাজ্যে ফিরে গিয়ে পুনরায় রাজ্য লাভ করলেও সমাধি বৈশ্য নিজ পরিবারে ফিরে যায়নি।
মেধস আশ্রমের পুনঃআবিষ্কার: ঋষি মেধস মুনি দেহত্যাগের পর এই গভীর অরণ্যে আর কারও আগমন ঘটেনি। তাই এখানে কোন লোকালয় বা কোন জনমানব না থাকায় কালের পরিক্রমায় মেধস আশ্রম জনমানবের অন্তরালে থেকে যায়। তারপর সংস্কৃত বিষয়ে পন্ডিত সিদ্ধিঋষি স্বামীজী বেদান্ত মহারাজ ধর্মগ্রন্থ চন্ডী পাঠের পর তিনি মেধম আশ্রম সম্পর্কে জানতে পারেন এবং তা খুঁজে বের করতে আগ্রহী হন। এই মেধস আশ্রম ভারতবর্ষের কোথাও খুঁজে না পেয়ে গভীর সাধনায় মগ্ন হন। এরপর তিনি চট্টগ্রাম জেলার সারোয়াতলী গ্রামে আসেন। এখানে একদিন তিনি গভীর সাধনায় মগ্ন থাকার পর হঠাৎ পূর্ব দিকের পাহাড়ের দিকে দৌড়াতে থাকেন। তাঁকে অনসুরণ করে অনেকে সে পাহাড়ের দিকে এগিয়ে যান। এই দুর্গম পাহাড়ে যাওয়ার বা উঠার কোন পথ না থাকায় অনেক কষ্ট করে তিনি এবং অন্যান্যরা পাহাড়ের চূড়ায় উঠে যান এবং তিনি ঘোষণা করেন এটিই দূর্গাপূজার উৎপত্তিস্থল মেধস আশ্রম। তাঁর ঘোষণায় এখানে অনেকে সমবেত হলেও বেশি ঘনিষ্ঠতা লাভ করেন কানুনগোপাড়া নিবাসী বাবু অন্নদা সর্ববিদ্যা। স্বামী বেদান্ত মহারাজ বাবু অন্নদা সর্ববিদ্যাকে সেখানে একটি কুটির স্থাপন করার জন্য নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশমত বর্তমান মেধস আশ্রমের পাহাড়ের চুড়ায় লম্বায় ৮ ফুট প্রস্থে ৬ ফুট একটি টিনের গৃহ নির্মাণ করেন। এখানেই চলতে থাকে ধর্মীয় কার্যাদি।
মেধস আশ্রম হিসাবে এটাকে ঘোষণা করার পর এটার যথার্থতা নির্ণয়ের জন্য তৎকালীন বার্মার বর্তমান মায়নমার থেকে হিন্দু বিচারকেরা পরীক্ষা করার জন্য এই মেধস আশ্রম এলাকায় আসেন। এখানে ধর্মীয় গ্রন্থ চন্ডীর বর্ণনা অনুযায়ী নাভীকুন্ড, মার্কেয়কুন্ডসহ বিভিন্ন চিহ্নাদি দেখতে পান এবং এটাকে মেধস আশ্রম হিসাবে সমর্থন করেন।
স্থাপত্য: বর্তমানে মেধস আশ্রমে অনেক স্থাপত্যের নির্দশন দেখা যায়। যেটির প্রথম কাজে হাত দেন কাসিম রাজ্যের রাজা। তিনি এই মেধস আশ্রমের মূল মন্দিরটি নিজ ব্যয়ে করে দেন। পরবর্তীতে এই মেধস আশ্রমের উন্নয়ন কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করেন।
মেধস আশ্রমে যা আছে : এখানে শুরুতে গেইটের পাশে রয়েছে গনেশ মন্দির। পাহাড়ের চুড়ার উপর রয়েছে মেধস মুনির মন্দির, এটি নির্মাণ করেছেন ধোরলা নিবাসী মিলন বৈদ্য (ভান্ডারী)। এই মন্দিরে রয়েছে মেধস মুনি, রাজা সুরথ ও সমাধি ধৈশ্যের মূর্তি। এই মন্দির নির্মাণে আর্থিক সহযোগিতা দান করেন বাবু দিলীপ সেন মহোদয়। এখানে শ্রম ও সেবা দিয়ে সহযোগিতা দান করেছেন কর্মবীর সাধক বর্তমান মেধস আশ্রমের অধ্যক্ষ বুলবুল মহারাজ।
মেধস মুনির মন্দিরের উত্তর দিকে অগ্রসর হলে আরেক পাহাড়ের উপর রয়েছে দশভূষা মন্দির। এখানে মা দুর্গাদেবীর মূর্তি আছে। প্রতিদিন ভক্তদের উপস্থিতিতে এখানে পূজা অর্চনা হয়ে থাকে। মন্দিরের পূর্ব পাশে রয়েছে স্বামী বেদান্ত মহারাজেয় মন্দির এটি প্রতিষ্ঠা করেন স্বামী নির্মলানন্দ মহারাজের মন্দির। নির্মলানন্দ মহারাজা এখানে প্রায় ৩৫ বৎসর অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন এবং এই মেধস আশ্রমের উন্নয়নে নিজেকে উৎসর্গ করেন। মন্দিরের সামনে রয়েছে ষড় নাট মন্দির এবং মন্দিরের পিছনে রয়েছে ভোগষর, যাত্রীদের জন্য ঘর, মাহারাজের ঘর, গোমাতার ঘর। এখানের উন্নয়ন কর্মকান্ডের সাবেক সম্পাদক প্রয়াত বাবু অশ্বিনী বিশ্বাস ও তাঁর পুত্রগণ বড় ভূমিকা রেখেছেন। বর্তমানে মেধস আশ্রমের কার্যকরি পরিষদ এখানকার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন।
দশভুজা মন্দির থেকে প্রায় ২০০ গজ পূর্বদিকে রয়েছে মা কামাক্ষা দেবীর মন্দির। এখানে মা কাম্যক্ষা দেবীসহ বিভিন্ন দেব দেবীর মূর্তি রয়েছে। এই মন্দির নির্মাণ করেন চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার জৈষ্ঠ্যপুরা নিবাসী বর্তমানে অনেকটা কাটে প্রবাসে, এই দানশীল ব্যক্তি অদুল চৌধুরী।
বর্তমান আশ্রম পরিচালনা কমিটির সুযোগ্য সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাবু সুকোমল চৌধুরী মহোদয় মা কামাক্ষ্য দেবীর মন্দির থেকে প্রায় ৩০০ গজ পূর্বে পাহাড়ের চূড়ায় রয়েছে শিব মন্দির। এই সুউচ্চ মন্দির থেকে অনেক দুরপর্যন্ত সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য অবলোকন করা যায়। এই মন্দিরের পূর্ব দিক দিয়ে বয়ে গেছে বেতসা নদী (স্থানীয় নাম ভানডালজুরী খাল) পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ চন্ডীতে বেতসার নদীর উল্লেখ রয়েছে। শিব মন্দিরের প্রায় ৪০০ গজ দক্ষিণে রয়েছে সুুউচ্চ পাহাড়ের চূড়ায় তারা দেবীর মন্দির। এই মন্দির নির্মাণ করেন দানশীল ব্যক্তি প্রয়াত বাবু অন্নদা মহাজন ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। বর্তমানে তাঁদের পরিবারের সদস্য মেধস আশ্রমের বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক সশ্চিদানন্দ রায় চৌধুরী মহোদয় এই তারা দেবীর মন্দির সংস্কার করে এটিকে অপূর্ব সৌন্দর্যের মন্দির করেছেন। তার মন্দির থেকে প্রায় ৫০০ গজ পশ্চিমে রয়েছে সীতা বাড়ি, এখানে রাম, সীতা, লক্ষণ ও হনুমানের মূর্তি রয়েছে। এই মন্দিরটি প্রথম অবস্থায় বাঁশের বেড়ার হলেও অনেকের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠায় এটি অপূর্ব সৌন্দর্য মন্ডিত মন্দির হয়েছে। বিশেষ করে এই মন্দির নির্মাণে কানুনগোপাড়া নিবাসী দানশীন ব্যক্তি বাবু অজয় কানুনগো মহোদয় আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। দশভুজা মন্দির থেকে প্রায় ৫০০ গজ পশ্চিমে পাহাড়ের চূড়ায় রয়েছে কালিমাতা মন্দির। এই মন্দির নির্মাণ করেছেন প্রবাসী শারদা গীতা সংঘ। মেধস আশ্রমের প্রবেশের রাস্তার পার্শ্বে রয়েছে মা মগস্বেশ্বরী মন্দির। এখানে ভক্তরা তাঁদের মনোবাসনা পূর্ণ হওয়ার জন্য পূজা অর্চনা দিয়ে যায়। এই আশ্রমে পূর্ণেন্দু মহারাজ ও বজেন্দ্র মহারাজসহ অনেকে আশ্রম উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন।
মেধস আশ্রমের ভূমি : মেধস আশ্রম এলাকাটি পাহাড়ী এবং ঘন অরণ্যময়। জায়গার পরিমাণ প্রায় ৬৮.১৯ একর। কিছু ধানী জমি এবং ছোট বড় তিনটি পুকুর রয়েছে।
বৃক্ষরোপন: মেধস আশ্রমে একসময় পাহাড়ী অরণ্য থাকলেও বর্তমানে মেধস আশ্রম কর্তৃপক্ষ এখানে ঝোপ ঝাড় পরিস্কার করে প্রায় ৫০ হাজার ফলজ, বনজ, সৌন্দর্যবর্ধন, ঔষধি, বিলুপ্ত প্রজাতির গাছ রোপন করেছেন এবং এটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। এখানে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র উন্নয়নে কাজ করা হচ্ছে।
বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল: মেধস আশ্রম এলাকায় কোন বন্য প্রাণী ধরা, হত্যা বা রক্তপাত করার নিষেধ আছে। শুধু মানুষ নয় যে কোন পশু বা প্রাণী বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে এখানে এই নীতিতে বিশ্বাসী। তাই বন্যপ্রাণীরা নির্বিঘেœ এখানে চলাফেরা করতে পারে। এখানে সুযোােগ দেখা যায় হাতি, ছোট বাঘ, ভল্লুক, শুকর, সাপ, হরিণ, শেয়াল, বনমোরগ, বেজি, সজারুসহ প্রভৃতি প্রাণী। মেধস আশ্রম এলাকায় আমিষ খাওয়ার নিষেধ রয়েছে।
মানুষের সমাগম: মেধস আশ্রমে এখন সারাবছর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাধক ধ্যান করতে আসেন, আবার কেউ পাহাড়ী সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য আমন বিশেষ করে পাহাড়ের জ্যোৎসাময়ী রাত, পাহাড় থেকে সূর্য উঠা ও অস্ত যাওয়ার দৃশ্য উপভোগ করে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান যেমন-উত্তরায়ন, দুর্গাপূজা ও মহালয়া, বাসন্তীপূজা, কামাক্ষ্যপূজা, শিবপূজা, কালিপূজা, সীতাপূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় দিবসে মানুষের সমাগম বেশি হয়। এখানে অন্নপ্রাসনসহ মহাদু চন্ডী যোগ্য সহ বিভিন্ন ধর্মীয় কাজের সুবিধা রয়েছে।
অন্যান্য সুযোগ সুবিধা: মেধস আশ্রমে ভক্তদের জন্য কিছু আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে প্রতিদিন মায়ের প্রাসাদের ব্যবস্থা আছে। ভক্তদের জন্য বিনা খরচে রাত্রি যাপনের ব্যবস্থা রয়েছে।
যাওয়ার ব্যবস্থা: মেধস আশ্রম চট্টগ্রাম শহর থেকে পূর্বে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এখানে বাসে করে গেলে বাস থেকে নেমে প্রায় ২০ মিনিট পায়ে হেটে মেধস আশ্রমে যাওয়া যায়। ছোট গাড়ী যেমন-মাইক্রো, কার, টেম্পু, টেক্সি করে মেধস আশ্রমের মুল গেইট পর্যন্ত যাওয়া যায়। বর্তমানে এখানে কয়েকটি দোকান রয়েছে। এখানে পানিসহ বিভিন্ন খাবার পাওয়া যায়।
মেধস আশ্রমে বিভিন্ন কার্যক্রম: মেধস আশ্রমে প্রতি বৎসর বাংলাদেশ রোভার স্কাউটসের এডভেঞ্জার ক্যাম্প হয়ে থাকে। একবার রোভার স্কাউটসের এডভান্স কোর্স অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তাছাড়া বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এর সেমিনার, সিম্পোজিয়ামসহ শিক্ষা সফরের ব্যবস্থা করে থাকে। এখানে মেধস আশ্রম কর্তৃপক্ষ যথাসাধ্য সহযোগিতা দিয়ে থাকেন।
আশ্রমের সমস্যাসমূহ : মেধস আশ্রমের যাতায়াতের রাস্তাটি এখনও পর্যন্ত সথাযথভাবে সংস্কার হয়নি। এখানে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করেছেন, রাউজান উপজেলার নিবাসী বাবু আশু মহাজন এবং সহযোগিতা করেছেন দীপু দাশ (চন্ডী বাবু)। এখানে বর্তমানে একটি সুন্দর গঙ্গা মন্দির নির্মাণের কাজ হচ্ছে যা করছেন রাউজান নেওয়াপাড়া নিবাসী বাবু আশু মহাজন ও বোয়ালখালী উপজেলা শাকপুরা গ্রামের বাবু দীপু দাশ (চন্ডী বাবু)। ­
বুলবুলানন্দ মহারাজ
অধ্যক্ষ
চন্ডীতীর্থ মেধস মুনি আশ্রম