শোকাবহ ১৫ আগস্ট

13

আজ ১৫ আগস্ট, জাতীয় শোক দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে বাঙালি জাতি হারিয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে। আজ আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি বঙ্গবন্ধুসহ ১৫ আগস্টের সকল শহীদকে।
বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, শতাব্দির সবচেয়ে নির্মম ও বর্বর ঘটনা ছিল ১৫ আগস্টের এ হত্যাকাÐ। ঘৃণ্য নরপিশাচরা শুধু একজন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেনি, তারা একে একে হত্যা করেছে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশুপুত্র শেখ রাসেলসহ পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামালকে। জঘন্যতম এ হত্যাকাÐ থেকে রক্ষা পাননি বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, ভাগ্নে যুবনেতা ও সাংবাদিক শেখ ফজলুল হক মণি, বেগম আরজু মণি, কর্নেল জামিলসহ ১৬ জন। স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিনবছরের মাথায় এমন নৃশংস হত্যাকাÐের পেছনে কাজ করেছিল দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্র। যারা এদেশের স্বাধীনতার স‚র্যকে আরেকবার স্তমিত করে দেয়ার অপপ্রয়াস চালিয়েছিল। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে যদিও তারা বিফল হয়েছিল কিন্তু এসব হত্যার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের মহান আদর্শ ও চেতনাকে মুছে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। যা দুই দশকের অধিক সময়ধরে অব্যাহত ছিল।
অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে, যেকোন বিচারেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এক অনন্য ও অসাধারণ নেতা। সহজ-সরল, সাদামাটা অথচ দৃঢ়চেতা এক মানুষ। দেহসৌষ্ঠবে এবং বজ্রকণ্ঠের বিস্ময়কর শক্তি এই মানুষটিকে সহজেই এবং আলাদাভাবে চেনা যেত। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির জন্মের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে তাঁর নাম। বায়ান্ন থেকে একাত্তর পর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু ছিলেন সংগ্রামী জনতার পুরোভাগে। বজ্রকণ্ঠে তিনি ডাক দিয়েছিলেন স্বাধীনতার। তাঁর আদর্শ, ত্যাগ, দূরদর্শিতা এবং অকুতোভয় আপোসহীন নেতৃত্বে দেশ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হয়, বাঙালি জাতি লাভ করে হাজার বছরের লালিত স্বপ্ন, কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা, লাল সবুজের পতাকা ও স্বাধীন মানচিত্র। পাকিস্তানি হানাদাররা এই বিশাল হৃদয়ের মানুষটিকে কারাগারে বন্দী রেখে, নির্যাতন করে দমাতে পারেনি। নীতি থেকে, সংগ্রামের পথ থেকে এক চুলও নড়াতে পারেনি। অথচ স্বাধীন বাংলার মাটিতেই তাঁকে একদল বিপথগামী সেনা সদস্যের হাতে নির্মমভাবে জীবন দিতে হয়েছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে যারা নবীন রাষ্ট্রটির অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে চেয়েছিল, তারা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হারানোর অপরিমেয় ক্ষতি ও গভীর শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। ইতিহাসের নৃশংসতম সেই হত্যাকাÐের ফলে জাতির অস্তিত্ব ও মননে যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল, তার পূর্ণ উপশম ঘটেনি। অনেক দেরিতে ও পাহাড়সম বাধাবিপত্তি পেরিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাÐের বিচার সম্পন্ন হয়েছে। পিতৃহত্যার কলঙ্ক থেকে জাতি মুক্তি পেয়েছে। তবে বঙ্গবন্ধু হত্যার সেই ষড়যন্ত্র যেন শেষ হয়নি।
খুনিদের মধ্যে পাঁচজনের ফাঁসির দÐ কার্যকর হয়েছে, কিন্তু দÐিত বাকি ছয় খুনি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তিনজনের অবস্থান সরকার জানলেও বাকি তিনজনের অবস্থানই অজানা। দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছরেও এই খুনিদের দেশে ফিরিয়ে দÐ কার্যকর করতে না পারাটা জাতির জন্য হতাশার। আমরা আশা করব, সরকার বিদেশে পলাতক খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রয়াস জোরদার করবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন একটি সুখী-সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও অসা¤প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। জাতীয় শোক দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত গণতান্ত্রিক, শোষণমুক্ত ও অসা¤প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যার স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন।