শেকল ছেঁড়ার মাস

নিজস্ব প্রতিবেদক

20

জয় জয় নবজাত বাংলাদেশ/ জয় জয় মুক্তিবাহিনী/ ভারতীয় সৈন্যের সাথে/ রচিলে মৈত্রীর কাহিনী/ ধর্মান্ধতার বিপরীতে ধর্মনিরপেক্ষতা/ বিভেদগামী শক্তির বদলে/ গঙ্গা পদ্মার একতা/ বিশাল ভলগা, গঙ্গা-পদ্মার/ পাড় ভেঙে এক হল পানি/ সামন্ততন্ত্রের বিপরীতে/ এক নতুন প্রজাতন্ত্র/ সমরতন্ত্রের বিপরীতে/ এক অভিনব সমাজতন্ত্র/ স্থাপনা করে রক্তে লিখিলে/ শেখ মুজিবরের বাণী…
বাঙালি জাতি মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানিদের দুঃশাসন আর শোষণের পাশাপাশি সাম্প্রদায়িকতার বীভৎসতারও কবর রচনা করেছিল। ধর্মীয় বিশ্বাস
আর যাই হোক- তা যে জাতীয়তাবাদের চেতনা আর রাষ্ট্রপরিচালনার সনদের থেকে যে অনেক ঊর্ধ্বে, সেটা বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠা করেছিল। তাই বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ অর্জন মহান মুক্তিযুদ্ধের শ্লোগান ছিল, ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রীষ্টান, বাংলার মুসলমান-আমরা সবাই বাঙালি। আর স্বাধীন বাংলার সেøাগান, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।’ বাঙালির উত্তাল সেই অগ্নিঝরা মার্চ তাই বার বার ফিরে আসে অসাম্প্রাদায়িক ও গণতান্ত্রিকতার পথে এগিয়ে চলার প্রেরণা নিয়ে।
মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঠে জানা যায়, তৎকালীন পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি চূড়ান্ত নাটকীয়তার মুখোমুখি হয়; যখন ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় দল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। দলটি পূর্ব পাকিস্তানের একশ’ ৬৯ টি আসনের মধ্যে একশ’ ৬৭ টি আসনে জয়লাভ করে এবং তিনশ’ ১৩ আসনবিশিষ্ট জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, যা আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনের অধিকার প্রদান করে। কিন্তু নির্বাচনে দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাপ্রাপ্ত দল পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো শেখ মুজিবের পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিরোধিতা করেন। তিনি প্রস্তাব করেন পাকিস্তানের দুই প্রদেশের জন্যে থাকবে দু’জন প্রধানমন্ত্রী। ‘এক ইউনিট কাঠামো’ নিয়ে ক্ষুব্ধ পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে এরূপ অভিনব প্রস্তাব নতুন করে ক্ষোভের সঞ্চার করে। ভুট্টো এমনকি মুজিবের ছয় দফা দাবি মেনে নিতেও অস্বীকৃতি প্রকাশ করেন। ৩ মার্চ পূর্ব ও পশ্চিম অংশের এই দুই নেতা পাকিস্তানের ভাগ্য নির্ধারণে ঢাকায় বৈঠকে মিলিত হন। তবে বৈঠক ফলপ্রসু হয় নি। শেখ মুজিব সারা দেশে ধর্মঘটের ডাক দেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। এই ভাষণে তিনি ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের আগেই বাস্তবায়নের জন্য চার দফা দাবি পেশ করেন। দাবিগুলো হল, অবিলম্বে মার্শাল ল’ প্রত্যাহার করতে হবে। সামরিক বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরে যেতে হবে। নিহত ব্যক্তিদের সঠিক সংখ্যা অনুসন্ধান করতে হবে এবং ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের আগে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।
কিন্তু, পাকিস্তানের সামরিক সরকার রাষ্ট্রক্ষমতা কোন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের হাতে দিতে রাজি ছিলনা। যদিও ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের তারিখ নির্ধারিত হয়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পশ্চিম পাকিস্তানের নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং সামরিক বাহিনীর অফিসারদের নিয়ে ষড়যন্ত্রের নীলনকশা বোনা শুরু করে। ১৯৭১ সালের পয়লা মার্চ কোন কারণ ছাড়াই ৩ তারিখের নির্ধারিত অধিবেশন বাতিল করা হয়। ক্ষুব্ধ পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ধৈর্য্যরে শেষ সীমা ছাড়িয়ে গেল এই সিদ্ধান্ত। সারা দেশে বিক্ষোভের বিস্ফোরণ হয়। ঢাকা পরিণত হয় মিছিলের নগরীতে। বঙ্গবন্ধু সারা দেশে পাঁচদিনের হরতাল এবং অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। তার আহবানে সারা পূর্ব পাকিস্তান কার্যতঃ অচল হয়ে যায়। সামরিক সরকার কারফিউ জারি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে কিন্তু বুলেটের ভয় দেখিয়ে বাঙালিদের রাজপথ থেকে সরানো যায় না। পাঁচদিন হরতাল শেষে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। ভাষণে তিনি ঘোষণা করলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তাঁর এই ভাষণ গোটা বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার আকাঙ্খায় উন্মাতাল করে তোলে।