শুভ সূচনা হোক রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের

20

অবশেষে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অধিবাসী রোহিঙ্গাদের ফেরত প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। আগামী ১৫ নভেম্বর ১ম ব্যাচ মিয়ানমারে ফেরত যাবে বলে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের উবয় কূটনৈতিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। জানা যায় এদিন ১ম দফায় ২২৬০জন রোহিঙ্গাকে ফেরত নেয়া হবে। দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আগামী ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গাদের ১ম ব্যাচটিকে প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে চূড়ান্তভাবে সম্মত হয়ে সম্মতিপত্র পাঠিয়েছে মিয়ানমার। বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। উভয় দেশের পদক্ষেপ ও মিয়ানমারের চূড়ান্ত সম্মতি অনুযায়ী ১ম ব্যাচে ৪৮৫টি পরিবারের ২ হাজার ২৬০ জন রোহিঙ্গা ফেরত যাবেন। এর আগে গত ৩ নভেম্বর রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব জানিয়েছিলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য ভারত রাখাইনে ২৮৫টি বাড়ি তৈরি করে দিয়েছে এবং চীন ১ হাজার বাড়ি তৈরির সরঞ্জাম দিয়েছে। আমরা এ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার শুভ সূচনা কামনা করছি। তবে উভয়দেশ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে প্রস্তুত থাকলেও রোহিঙ্গাদের মধ্যে এক ধরনের ভয় ও শংকা কাজ করছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মতে, নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও নিজ জমিতে ফেরার কোনও নিশ্চয়তা না দেওয়ায় মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তাদের এখনও সৃষ্টি হয়নি। এ কারণে প্রত্যাবাসন নিয়ে ভয়ে আছে রোহিঙ্গারা। আমরা এ বিষয়ে বেশ কিছুদিন থেকে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার উদ্বেগের কথাও জেনে আসছি। তারা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশসহ মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক পরিবেশ ও জাতিসত্তার স্বীকৃতি নিশ্চিত করেই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার আহবান জানিয়ে আসছে। এরপরও উভয়দেশ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে একমত হয়েছে এবং অতি সম্প্রতি প্রত্যাবাসন কার্যক্রমও শুরু করতে যাচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার, ধ্বংস করে ফেলা বাড়িঘর ইত্যাদি অর্জনে প্রতিশ্রæতি অর্জন করতে সক্ষম হবে।
রাখাইন থেকে রোহিঙ্গা বিতাড়ন, হত্যা ও ধর্ষণসহ সব অপকর্মের নাটের গুরু মিয়ানমার সেনাবাহিনী, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে তা স্পষ্ট উঠে এসেছে। বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে দশকের পর দশক ধরে শাসনক্ষমতায় প্রভাব বিস্তার করে আসছে সেনাবাহিনী। ২০১৫ সালে একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আংশিক গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেও সেখানকার পার্লামেন্টের এক-চতুর্থাংশ আসন এখনও সেনা দখলে। তাছাড়া মন্ত্রিসভার তিন সদস্যও সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গা নামক মুসলিম জাতিসত্তার ধ্বংস ও বিতাড়নের অভিপ্রায় থেকেই নির্বিচারে হত্যা ও ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটেছে। মিয়ানমারের সেনা চৌকিতে তথাকথিত বিচ্ছিন্নতাবাদীর হামলার অভিযোগ এনে আইন প্রয়োগের নামে ভয়ংকর এসব অপরাধ সংঘটনের জন্য মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংসহ জ্যেষ্ঠ পাঁচ জেনারেলকে বিচারের মুখোমুখি করার যে সুপারিশ করেছে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন, তা যথার্থই মনে করি আমরা। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর যা ঘটেছে, তা যে গণহত্যা- জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদনে তা স্পষ্ট হয়েছে। রোহিঙ্গাদের ঘরের ভেতর আটকে রেখে আগুন দেয়া হয়েছে। খুব কাছ থেকে গ্রেনেড হামলা ও গুলি করে তাদের হত্যা করা হয়েছে। এসময় রোহিঙ্গাদের বিশাল একটি গোষ্ঠী বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলা কক্সবাজারে আশ্রয়গ্রহণ করে। যার সংখ্যা প্রায় এগারো লাখের অধিক। বাংলাদেশ সরকার উদার মনে, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত উন্মুক্ত করাসহ সার্বিক সহযোগিতা শরণার্থীদের জন্য দিয়ে আসলেও বলতে দ্বিধা নেই যে, তারা মানবেতর জীবন-যাপন করছে। যা জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিশ্ব সরেজমিনে দেখে গেছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ জাতিসংঘের অনুসন্ধানেও রোহিঙ্গা নিপীড়নের প্রমাণ মিলেছে। তাদের ওপর যে নির্যাতন, নিপীড়ন, হত্যা ও ধর্ষণসহ অন্যান্য পৈশাচিক ঘটনা ঘটানো হয়েছে, যা রুয়ান্ডার গণহত্যার সঙ্গে তুলনীয় বলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মনে করছেন। এ অবস্থায় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার পাশাপাশি আমরা মনে করি, মানবতা বিরোধী অপরাধের কারণে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিচারও নিশ্চিত করা জরুরি। যা জাতিসংঘই একমাত্র করতে পারে।