শীর্ষ ইয়াবা কারবারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে

রতন কান্তি দেবাশীষ

29

চট্টগ্রামের শীর্ষ ইয়াবা কারবারিরা এখনো অধরা। তাদের অনেকে ইতিমধ্যে বিদেশ পাড়ি দিয়েছেন। সেখানে বসে ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। অর্থলগ্নিও করছেন সেখান থেকে। ফলে কোনোভাবেই ইয়াবা কারবার থামানো যাচ্ছে না।
জানা যায়, গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে ‘চল যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে’ স্লোগানে ইয়াবাসহ মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যায় সরকার। একের পর এক বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটতে থাকে। সেসময় বন্দুকযুদ্ধে চট্টগ্রামের কানা মঞ্জু, শুক্কুরসহ ৫ জন শীর্ষ ইয়াবা কারবারি নিহত হন। অবস্থা বেগতিক দেখে শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ীরা পালিয়ে যেতে থাকেন। এরমধ্যে কেউ বিদেশে পালিয়ে যান আর কেউ কেউ দেশেই আত্মগোপন করেন।
এদিকে গত ফেব্রæয়ারিতে কক্সবাজারে আত্মসমর্পণ করেন ১০২ ইয়াবা কারবারি। তাদের মধ্যে গডফাদার ছিলেন ২৫ জন। তবে সেসময় চট্টগ্রামের কোনো গডফাদার বা ইয়াবা কারবারি আত্মসমর্পণ করেননি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামে তালিকাভুক্ত ১৬০ জন মাদক ব্যবসায়ী রয়েছেন। এদের মধ্যে শীর্ষ কারবারি বা গডফাদার রয়েছেন ২০ জন। এ ২০ জনের নিয়ন্ত্রণেই জেলা ও নগরীতে ইয়াবা ব্যবসা চলে। তাদের অধীনে ৩ শতাধিক খুচরা ব্যবসায়ী রয়েছেন। তারাই ইয়াবা বাজারজাত করেন।
সূত্র জানায়, এ দু’সংস্থার তালিকায় চট্টগ্রামে শীর্ষে রয়েছে সাইফুল করিমের নাম। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণারয়ের তালিকায়ও তার নাম দুই নম্বরে। দু’ভাই ও স্বজনরাসহ তিনি ইয়াবা কারবারে যুক্ত। সরাসরি টেকনাফ থেকে ইয়াবা এনে তিনি সারা দেশে সরবরাহ করেন।
গত বছর হালিশহরস্থ তার বাসা থেকে ২০ লাখ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এসময় তার দু’ভাইকে গ্রেপ্তার করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার দুই ভাই র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছিলেন, সাইফুল করিম প্রতি মাসে কোটিরও বেশি ইয়াবা সারাদেশে পাচার করেন।
এরই মধ্যে সাইফুল করিমের নামে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। গত ৩০ এপ্রিল দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম-২ এর উপ সহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন বাদি হয়ে দুদক আইন ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে ডবলমুরিং থানায় মামলাটি দায়ের করেন। মামলার এজাহারে সাইফুল করিমের বিরুদ্ধে ১ কোটি ৬৬ লাখ ৫ হাজার ৭৮৮ টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভুত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
জানা যায়, মাদকবিরোধী অভিযান শুরুর পরপরই তিনি দেশ ছাড়েন। তিনি মধ্যপ্রাচ্যের আরব আমিরাত বা সৌদি আরবে থাকতে পারেন বলে পুলিশের ধারণা। তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন আরেক গডফাদার মো. ইউসুফের নাম। তিনি রেলের কুলি থেকে মাদক ব্যবসার মাধমে কয়েকশ’ কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। তিনি ভারতের কলকাতায় অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।
আরেক শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী রাউজান উপজেলার বাগোয়ানের হাসান মাহমুদ ওরফে নাছির। তিনি র‌্যাবের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত জামায়াত ক্যাডার সাতকানিয়ার আহমদুর সহযোগী। অস্ত্র-ইয়াবাসহ একাধিকবার গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। টেকনাফ থেকে সরাসরি ইয়াবা এনে তিনি ব্যবসায়ীদের সরবরাহ করতেন। নাছিরের অধীনে ছিলেন ২০/৩০ জন পাইকারী ব্যবাসয়ী। তিনি তাদের নিয়মিত ইয়াবা সরবরাহ করতেন। তার বিরুদ্ধে ৭/৮টি মামলা রয়েছে। মাদকবিরোধী অভিযান শুরুর পর নিজেকে রক্ষায় গোপনে আমিরাত চলে যান। তিনি সেখানে আজমানে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।
আরেক গডফাদার জাহেদুল আলম প্রকাশ পিচ্চি জাহেদও পলাতক রয়েছেন। সাতকানিয়ার বড়দুয়ারার জাহেদ রেয়াজউদ্দিন বাজারভিত্তিক ইয়াবা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন। টেকনাফ থেকে ইয়াবা এনে তিনি রেয়াজউদ্দিন বাজারে গুদামে রাখার পর পাচার করতেন দেশের বিভিন্ন এলাকায়। তিনিও বর্তমানে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন।
আনোয়ারার শীর্ষ ইয়াবা কারবারি মোজাহের মিয়া বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। আরেক শীর্ষ কারবারি জলিল ওরফে নুন জলিল মধ্যপ্রাচ্যে পালিয়ে গেছেন।
এছাড়া সিআরবি জামতলা বস্তির মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রক ফয়সাল, হালিশহর বড়পুল এলাকার করিম ওরফে ডাইল করিম, সদরঘাট ধোপার মাঠ বস্তির মাইজ্যামিয়া, বাদশা মিয়া সড়ক এলাকার আরমান, পতেঙ্গা এলাকার আবছার, কালামিয়া বাজারের আলী জহুর এবং রেয়াজউদ্দিন বাজারের মিজানও মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে পালিয়ে আছেন।
সিএমপি কমিশনার মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স। তাদের কোনোধরনের ছাড় নেই। মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পুলিশ প্রতিনিয়তই মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করছে এবং মাদক উদ্ধার করছে। এলাকায় আসলেই তাদের রেহাই নেই।
জানা যায়, বিদেশে বসেও ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন এসব শীর্ষ কারবারিরা। তারা হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠিয়ে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা এদেশীয় এজেন্টদের কাছে নিয়মিত টাকা পাঠান। বিশেষ করে সাইফুল করিম, হাসান মাহমুদ নাছির, নুন জলিল ও পিচ্চি জাহেদ তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
র‌্যাব কর্মকর্তা মিমতানুর রহমান বলেন, মাদক ব্যবসায়ীরা কখনো পার পাবে না। দেশে থাকলে ধরা পড়তেই হবে। আমাদের গোয়েন্দা শাখা সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখছে। বিমানবন্দরেও নজরদারি চলছে।