শীত পংক্তিমালা

16

 

শীতের ঝিরিঝিরি
আইউব সৈয়দ

ক.
ঝিরিঝিরি
নকশি সেলাই হিম
ওড়াওড়ি করে
এই শীতে ;
নিদ্রাহীন অভিব্যক্তি
পৌঁছে ঠিকই-
গল্পভরা অদৃশ্য গীতে ।

খ.
ঝিরিঝিরি
জলমহাল
সমন্বিত হচ্ছে ঘ্রাণে ,
ঢেউ তুলে
ধূসর রঙের আবেদনে
স্বনির্ভর যে গানে ।

মৃত্তিকার হয় না রতি আস্বাদন
মোস্তফা হায়দার

পাহাড় আর সমুদ্রের কাছে
ভিক্ষা অথবা ভদ্রতার জবাব আছে নিশ্চিত
জলের কাছে বেঁচে থাকার হিশেবও,
সুন্দরের লেবাজপরে মাটিকে বানাও পাথর
কাগজ আর কলমের বাহাস বসিয়ে
এঁকে যাও কুটচালের আছে যতো ঝুটচাল!

চেঙ্গিসখান, নুরউদ্দীন জঙ্গী অথবা হালাকুরা
ধ্বংসের ইতিহাসে নেহায়েত অপাংক্তে নয়,
ন্যাড়াকে বেলতলায় পাঠানো
অথবা কবুতরের পায়ে চিঠি পাঠানো নতুন বজ্জাতি!
মানুষের একটা বালছেঁড়ার শক্তি নেই জেনেও
ইঁদুর মারার কল বসিয়েছো যত্রতত্র।

তিয়াত্তরের ইঁদুরের লাশ- নালা,ডোবা,বিলে
রক্তের সিঁড়ি বেয়ে দাঁড়াতে চেয়েছিল মনুষ্যে
বামপক্ষ সমান ডানপক্ষ!
বিধ্বস্ত বিবেকের কাছে সব সমীকরণ ভুল!

হরিণের চামড়ায় জন্ডিসের সুখ ভোগ হয় না
লিভারের আস্তরে দাগ লাগা শেষে
বিলাপের আশ্বাসে ওরা জমিনপাটা নরকযাত্রী!

কাকদের ইচ্ছের কাছে বোকা কোকিলও
বাসা বানাতে ভুলে যায় খড়কুটোর জোয়ারে
ভোগ আর হিংসার জাগতিক রোদন শেষে
মৃত্তিকার হয়না রতি আস্বাদন।

যাওয়া
রুহুল কাদের

যাই বললে যাওয়া যায় কতদূর!
প্রতিদিন দৃষ্টির দেউড়িতে
থাকলেও ঠিকঠাক থাকা হয় না
যেতে থাকি ।
পথ ডাকে। কেউ কেউ যায়
মৌসুমের মতো বদলপ্রবণ সব মানুষ
ঘূর্ণিচক্রে ঘুরে

জলের অতলে যাওয়ার নামও যাওয়া ।

মাটির অতল পর্দার আড়ালে গেলে ফিরে না কেউ
প্রকৃত প্রস্থানের পথের আকৃতি বুঝি লম্বালম্বি
ভেদ করে যায় ভ‚গোলের গোল।

মনপূজারি
লাভলী বাশার

তোমাকে দেখামাত্র তুমি আমার মনের গভীরে এমন করে ঢুকে যাও
আমার অনুভ‚তি নিয়ে এমন করে খেলা করো
আমার হৃদয়ে এমন করে আবেগী সুর তোলো!

আমি চোখ তুলে চেয়ে থাকি অসহায় চাতকের মতন।
তোমার মায়াজড়ানো মুখ সুন্দর, কণ্ঠ সুন্দর, গভীর চোখের দৃষ্টি সুন্দর
ঠোঁট সুন্দর, হাসি সুন্দর, টোলপড়া চিবুক সুন্দর!

এই সমস্ত সুন্দর এমনভাবে বিলিয়ে দাও, তোমার গভীর নীল চোখের আকর্ষণ
এতটাই ঘন হয়ে আসে যে নিজেকে সামলাতে পারি না।

দুচোখের আশ্চর্য সংযমের সীমা অতিক্রম করে ফেলে
শত চাপের মাঝেও খুলে যায় মনঘরের বন্ধ দরজা।
পারব না, পারব না তোমাকে কষ্ট দিতে, পারব না তোমাকে ভুলে যেতে
পারব না তোমাকে বিদায় জানাতে।

শুধু পারব সমস্ত জীবন তোমাকে ভালোবাসতে।
এটা নিছক কবিতার লাইন নয়
নাটকের সংলাপ নয়, নয় কোনো তানপুরার সুর
এ আমার আত্মার গভীর মিনতি!
হৃদয়ের আকুলতা!
আমার নিরুত্তাপ শান্ত হাসির অনুরণন!

কষ্ট হয়! খুব কষ্ট হয় নিজেকে সংযত রাখতে!
সংযত থাকতে থাকতে অনুভ‚তিগুলো কেমন যেন
দরিদ্র আর জীর্ণ হয়ে গেছে।
নিম্ন মধ্যবিত্ত টানাপোড়েনের মতন আমার অনুভ‚তিগুলো
যুদ্ধ করে করে হয়রান, অবহেলিত, উপেক্ষিত।

তবু, তবুও তোমাকে দেখলেই ভুলে যাই অনুভ‚তির দরিদ্রতা!
তবুও ছেঁড়াফাটা হৃদয়ের ভাঙা দরজা খুলে রাখি অপেক্ষার জীর্ণ আঁচলে!

দ্রাব্য
নাজমুন নাহার

এই শহরটা দ্রবীভূত হয়ে আমার শরীরে
আমার শরীর দ্রবীভূত হয়ে এই শহরে
হাঁটছি
গিলে খাচ্ছি
আর থু থু ছিটিয়ে পরিষ্কার করছি গলগন্ড –

তুমি মেসোস্ফিয়ারে দশজন হয়ে হাসছো
কুয়াশা ভেদ করে তোমার দশ একশত জন হয়েছে
রাস্তা এই শহর তুমিময়
তুমি একটা বৃত্ত তৈরি করেছো
আমি কেন্দ্রে
পরিধি ছুই ছুই
হাঁটছি – গলছি ফিরে যাচ্ছি কেন্দ্রে
আমি কেন্দ্র থেকে ছুটে যাই পরিধির দিকে
পরিধি ভেদ করতে গেলে
শত শত তুমি বেরিকেড তৈরি করো –

তুমি আমার উপরে খাও, গড়াগড়ি করো
খেয়ে দেয়ে আমার গায়ে কুলকুচি করো –
আমার পিঠের ওপর চেয়ার পেতে
আয়েশ করে বসো
একটা সিগার ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়ো
বৃত্তের মতো কুন্ডলি পাকায় তোমার ধোঁয়া
ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে আয়েশ করো
পরম ওম ওম সুখে
পুরুষ হাঁসের মতো
আরামের নিঃশ্বাস ছাড়ো আহহ

জল তরঙ্গের গন্তব্যে
বজলুর রশীদ

মেঘ রোদ্দুর সবুজের পথে
ছুঁয়ে এসেছি নীলাম্বরির বুক।
জ্যোৎস্নাভেজা রাতের সুবর্ণ আয়োজন
মায়াবী আলোড়নে দুয়ার খোলে
মাখামাখি নীলিমার নীল চোখ।

সেখানে ন‚পুর বাজে
ছলাৎ ছলাৎ থেকে উৎসরিত
এক অন্তহীন সাঙ্গু নদী বয়ে যায়
আবহমানকাল সুধায় অমরতা।

তবুও কেন জল শ‚ন্যতা বুক নিয়ে
নদীটা আজ বেঁচে থাকার
আশ্রয় খোঁজে নীলিমার কাছে?
তিলে তিলে গড়ে ওঠা সম্পর্কের বন্ধনে
লিখে যাই আগমনী জল তরঙ্গের গন্তব্যে..

মেয়াদোত্তীর্ণ রেড ওয়াইন
শাহীন মাহমুদ

বালিশের নিচে ওয়াইনের বোতল
তামাম শীতে উলঙ্গ পড়ে থাকো ত্রাণের আশায়
কাগজের ঠোঙা ভরিয়ে তোল চৌর্যবৃত্তি দোষে
বেটা সিঁধেল চোর।
ব্র্যান্ড নিউ সুশীল বেøজার
নাকে আসে বাংলামদের উৎকট গন্ধ
বারো ভ‚ঁইয়ার দেশে তুমি সত্যি বেমানান
ওয়াইন রেখে মানবিকতার পাঠ নাও
ক্লাউন।
ভাঁজনীতি রেখে মুক্ত আকাশ দেখো
সারেঙ্গীর সুরে রবীন্দ্রনাথ শুনো
কাক কোকিলের বিরোধে যেওনা।

ওহে দাম্ভিক রেড ওয়াইন লেবেল দেখো
মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে হাজার বছর আগে
অমানুষ ফের তুমি মানুষ হয়ে যাও।

অভিমানের ঘ্রাণ
শ্যামল কান্তি দত্ত

ঘরেতে আসনি তুমি, মনে আসো রোজ;
‘জীবন তো হাসপাতাল’ বদলেয়ার বলে-
সঙ্গীর সেবায় তাই কোনো মতে চলে
নীলিমায় স্বাতী তারা কে পায় সে-খোঁজ?
সাজানো এ খেলাঘর মিছে ভুরিভোজ,
হারিয়েছি মনুনদী, মাধবী-বকুল
স্বপ্নে দেখা আঁকা ছবিÑনদী-পাখি-ফুল;
রাতের আঁধারে খুঁজি ভোরের সুরুজ

সেলুলারে ভেসে ওঠে তোমার সে-ঘ্রাণ
জিওল মাছের মতো নেচে ওঠে প্রাণ;
নক্ষত্র ধরে যে রাখে আপনার মনে
চাঁদের জ্যোৎস্নারে সে-কবে বলো গোনে?
নীরবে নিরলে বাজে বিরহের গান,
দূরে থেকো পুষে রেখো-বৃথা অভিমান।

দেয়াল

হাসান ইকবাল

সময়ের স্লোগানে ভেঙে যায় চৈতন্যের দেয়াল
বিদ্যুৎবিভ্রাটে নেমে আসে লোড্শেডিংয়ের দেয়াল,
সুষম সঙ্গীতে অঙ্কুরিত হয় সুরের দেয়াল
সূর্যের শেষ রশ্মি নিয়ে আসে গোধূলির দেয়াল।

রূপসী চাঁদ সেও রূপকথার গল্পে ভরিয়ে তোলে
চৈতালি রাতের চতুর্দশী দেয়াল,
অথচ তুমি-আমি এক অভিন্ন দেয়াল রাতের আবহে।