শিশু বিকাশ মাঠের সংকট ও ফেসবুক বিনোদন

মোহাম্মদ শাহী নেওয়াজ

57

মানব জীবনচক্র বৈচিত্র্যময়। মানব শ্রেষ্ঠত্বের কৃতিত্ব স্রষ্টার। জীব বিজ্ঞানের ভাষায় মানুষ (primates) বা সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণীগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। মানবীয় ‘বৃদ্ধি’ ও ‘বিকাশ’ মানবজীবন চক্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ দিক। জীবনচক্রের বিভিন্ন ধাপে দৈহিক বৃদ্ধির সঙ্গে প্রয়োজন হয় মানবীয় বিকাশের সংমিশ্রণ। মানবীয় বিকাশের বিভিন্ন স্তর আছে যেমন- শারীরিক বিকাশ, মানসিক বিকাশ, আবেগীয় বিকাশ ও সামাজিক বিকাশ ইত্যাদি। নবজাতক, শৈশব, কৈশোর, প্রাপ্তবয়স্ক বা বার্ধক্য হল- জীবন চক্রের সাধারণ বয়সভিত্তিক স্তরবিন্যাস। বয়স ভেদে আচরণের মাধ্যমে মানবীয় সুন্দর বৈশিষ্ট্যসমূহ সুষ্পষ্ট হয়। কৈশোর কাল (৭-১৮) বা puberty হল মানব জীবন স্তরের অন্যতম লক্ষণ। এ সময় আদর্শ মানুষ হওয়ার অনন্য সুযোগ বা জীবন ব্যর্থতার কাল অধ্যায়।
মানুষ সামাজিক জীব এবং সামাজিক পরিবেশের অন্যতম উপাদান। সময়ের সাথে সাথে যথাযথ বিকাশের মাধ্যমে মানুষের পূর্ণাঙ্গতা। শারীরিক বিকাশ, মানসিক বিকাশ, বুদ্ধিভিত্তিক বিকাশ ও সামাজিক বিকাশ সাধন কৈশোর বয়সে অতি জরুরি। কৈশোরের ১১-১৮ বছর পর্যন্ত সময়কে বলা হয় আধুনিক কার্যকর স্তর বা Formal operational Stage। এ বয়সে মানব শিশু বাস্তবিক চিন্তা, আদর্শ, নৈতিকতা সর্ম্পকে ধারণা লাভ এবং সমস্যার সমাধান করতে পারে। কৈশোর বয়স হল মানব আদর্শ ধারণ করার সোনালী ক্ষণ । একজন শিশু যখন জীবনে সফল হবে তার সুফল ভোগী শুধুমাত্র পরিবার বা সমাজ নয় বরং সমগ্র দেশ। কিন্তু শিশু যদি হয় ব্যর্থ মানব সন্তান, সেক্ষেত্রে তার দুর্ভোগের অংশীদার শুধুমাত্র পরিবার বা সমাজ নয় বরং সমগ্র রাষ্ট্র। আমাদের নিজ সন্তানকে আমরা ব্যর্থ দেখতে চাই না। চাই আদর্শবান মানব সন্তানরূপে। আমরা যারা সমাজের সক্রিয় সদস্য- পিতা-মাতা, ভাই-বোন, শিক্ষক, ধর্মীয়গুরু, আত্মীয়-স্বজন, জনপ্রতিনিধি বা সমাজ সংগঠক প্রত্যেককে এগিয়ে আসতে হবে শিশু সুরক্ষায়। প্রত্যেক সামাজিক সদস্যকে প্রস্তুত থাকতে হবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামাজিক ভূমিকায়। কারণ আজকের শিশু ভবিষ্যত রাষ্ট্রের নাগরিক। যোগ্য শিশু রাষ্ট্রের অনন্য প্রাণ শক্তি।
আধুনিক বিশ্বের প্রায় সকল দেশে শিশু ও কিশোরদের অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্তহীন সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে একজন মানব শিশুর পৃথিবীতে আগমন। প্রত্যেক মানুষের প্রত্যাশা, আপন সন্তান হোক জগতের শ্রেষ্ঠ উপহার। মানব জীবন গঠনের মৌলিক পর্যায় হল- শৈশব বা কৈশোরকাল। এ সময় মানবসত্ত্বা পূর্ণতা লাভ করে। মানুষের বুদ্ধিভিত্তিক বিকাশ (Intellectual Development) এবং সামাজিক বিকাশ (Social Development) ঘটে এ সময়। মানব শিশুর বিকাশ ধারা বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণ জানতে হবে আমাদের সকলকে। পুষ্টিহীনতা, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, প্রতিকূল পরিবেশ, চিত্ত বিনোদনের অভাব, অতি নিয়মনিষ্ঠতা, নিয়মনিষ্ঠহীনতা, অতি নিভর্রশীলতা বা অন্যান্য। বিশেষত পারিবারিক বা সামাজিক পরিবেশ শিশুর প্রতি বঞ্চনা, বিরক্ত প্রদর্শন, তিরষ্কার, সৃজনশীল কাজে বাধা বা আচার- আচারণে বাধ্যবাধকতা কোনভাবে কাম্য নয়। শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে সৃজনশীলতা, চিন্তা শক্তি, যুক্তি বা কল্পনা শক্তির প্রসার ঘটাতে হবে। কৈশোর বয়সে মানসিক বিকাশের অন্যতম ক্ষেত্র হচ্ছে চিত্তবিনোদন বা উন্মুক্ত মাঠে খেলার সুযোগ।
কিশোর বয়সের দূরন্ত সময় তার জন্য উপভোগ্য হতে হবে। ঐতিহ্যগত ভাবে এদেশের শিশুরা মুক্ত মাঠে খেলাধুলা ও চিত্তবিনোদনের সুযোগ ভোগ করে আসছে। হা-ডু-ডু, ফুটবল, কাবাডি, কানামাছি, দাঁড়িয়াবাধা, নাট্য দল, পালা দল, যাত্রা, জারিগানের আসর ইত্যাদি দেশীয় সংস্কৃতি আমাদের কিশোরকে রেখেছিল সুরক্ষিত। মুক্ত মাঠে আমাদের শিশুরা খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চায় অভ্যস্ত। ক্রীড়া ও চিত্ত বিনোদনের সুযোগ শিশুর উৎকর্ষ সাধনের অন্যতম মাধ্যম। কিন্তু উপনিবেশিক শাসন ও পাক শাসন ব্যবস্থায় শিশুর উৎকর্ষ সাধনে কোন কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ ছিল না। দেশের তৃণমূল পযার্য়ে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অবকাঠামো অতি দুর্বল। বিশ্বায়নের যুগে ক্রমেই বিলুপ্ত হচ্ছে আপন সংস্কৃতি। শিশু কিশোরের আচরণে দেখা যাচ্ছে অস্বাভাবিকতা। সমসাময়িক উদাহরণ- কিশোরী ঐশী বা কতিপয় কিশোরের হলি আর্টিজেন সেন্টারে হামলা অন্যতম।
বর্তমানে দেশে মুক্ত মাঠের সংকট ও সাংস্কৃতিক মঞ্চের সংকট চরমে। পাঠকে উদ্দেশ্যে উদাহরণ পেশ করছি- ‘নুরুল আবছার’ নামে ফুটবল প্রেমিক জ্ঞাতি সম্পর্কিত মামার। অতি ভদ্র স্বভাবের এবং ‘ফুটবল আবছার’ নামে স্থানীয়ভাবে তার বেশ পরিচিতি। বান্দরবান, কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামে তার বেশ খ্যাতি। গ্রামের ৩/৪ টি মাঠে শিশু-কিশোর-যুবক তারে নেতৃত্বে ফুটবল অনুশীলন করত এবং ফুটবল উন্মাদনায় গোটা গ্রামকে মাতিয়ে রাখতেন। ইহাই শিশু-কিশোর বিকাশমূলক স্থানীয় বিনোদনের সুস্থ ধারা। কালের পরিক্রমায় বিলুপ্ত গ্রামের প্রায় সকল মাঠ। আবছার মামা নিবন্ধিত তৃতীয় শ্রেণীর একজন ফুটবল কোচ। কিন্তু মাঠের শূন্যতায় গ্রামে চলছে ফুটবল খেলার আকাল। স্থানীয় আঙ্গিকে কোন ফুটবলার সৃষ্টি হচ্ছে না। স্থানীয় ফুটবল টুর্ন্টামেন্টে দেশি/বিদেশি খেলোয়াড় আমদানি করে স্থানীয় ফুটবল ঐতিহ্য রক্ষা করতে হচ্ছে তাকে। সমগ্র দেশের চিত্র হয়তো বা একই। এখন তার একমাত্র ভরসা বয়ে যাওয়া মাতামহুরী নদী। যদি নদীর বুকে জেগে উঠে নতুন চর, যেখানে একটি খেলার মাঠ হবে। কিন্তু সেখানেও বিপত্তি। মৌলভি সাহেবেরা হাজির হয় পুরানো দলিল নিয়ে । নতুবা চৌধুরী সাহেবগণ প্রস্তুত থাকেন সেকিস্তি কিংবা পয়স্তির দাবী নিয়ে।
বিশ্বায়নের যুগে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে নিজস্ব ঐতিহ্য, কৃষ্টি-কালচার, সামাজিক মূল্যবোধ বা রীতিনীতি বিধস্ত হচ্ছে। মুক্ত মাঠের সংকট এবং সাংস্কৃতিক চর্চার অভাবে শিশু কিশোরের উপর হতে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। পিতা-মাতা ও শিক্ষকের অবাধ্যতা, স্কুল পলায়ন, কিশোরী মেয়েদের উত্ত্যক্তকরণ, বোমাবাজি, ধ্বাংসাত্মক কাজে সম্পৃক্ততা, মাদকসেবন, মাদকপাচার,অসংযত যৌনাচার, গাড়ি চুরি বা নানান অপকর্মে শিশু কিশোর জড়িয়ে পড়ছে।
দেশের স্কুলগামী শিশু যারা, তারা রাষ্ট্রের ভবিষ্যত কর্ণধার। কিন্তু দেশের নাগরিক হিসেবে লিখক শংকিত। আমাদের শিশু কিশোররা উপযোগী ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক বিনোদন হতে বঞ্চিত। প্রযুক্তির প্রসারতা ও বিশ্বায়নের যুগে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক এ আসক্ত হচ্ছে আমাদের শিশুরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট’ এর একজন সহকারী অধ্যাপক জনাব তৌহিদুল ইসলাম স¤প্রতি ঢাকা শহরে স্কুলগামী শিক্ষার্থীর ফেসবুক ব্যবহার বিষয়ক একটি গবেষণা পরিচালনা করেছেন। পরিচালিত গবেষণার প্রকাশিত তথ্য মতে- কৈশোরের শুরুতে তাদের মধ্যে ফেসবুক ব্যবহার অভ্যাস গড়ে উঠে। অধিকাংশ শিক্ষার্থী যারা স্কুল সময়কে উপভোগ করছে না। স্কুল পালানো, ক্লাস সময়ে বাহিরে আড্ডা, মেয়েদের উত্ত্যক্তকরণ, শ্রেণীকক্ষে অমনযোগিতা ইত্যাদি গবেষণায় পরিলক্ষিত হয়। ৪২ শতাংশ কিশোর স্কুল সময় বাহিরে কাটায়, ৮২ শতাংশ ধুমপানে পরিচিত, ৭৯ শতাংশ ফেসবুকে নীল ছবি দেখতে অভ্যস্থ, ৮৫ শতাংশ পড়ার সময় মেয়ে বান্ধবীর কথা ভাবে এবং ৫৭ শতাংশ কিশোরের মেয়ে বান্ধবী আছে। যাহা আমাদের কৈশোর অবক্ষয়ের নগ্নচিত্র।
শিশু-কিশোর ভবিষ্যত রাষ্ট্রের কর্ণধার। তাদের ক্রীড়া, চিত্ত-বিনোদন ও সুস্থ ধারা বিকাশে সর্বোত্তম চেষ্টা করতে হবে। পরিবার, সমাজ, ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিক্ষেত্রে বন্ধুত্বপূর্ণ সর্ম্পক গড়ে তুলতে হবে। ইন্টারনেট বা ফেসবুক ব্যবহারে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। আজকের কৈশোর হোক ভবিষ্যত রাষ্ট্রের অহংকার। যোগ্য নাগরিক। শিশু বিকাশবান্ধব আদর্শ সমাজব্যবস্থা হোক আমাদের সামাজিক অঙ্গীকার।

লেখক : প্রাবন্ধিক