শিশু নির্যাতন বন্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি

20

শিশু মানেই তো সদ্য ফুটন্ত একটি কলি। যেটি আগামীতে আদরে-যত্নে বড় হয়ে পূর্ণরূপে নিজেকে প্রকাশ করবে, সুবাস ছড়াবে। রঙের বিচিত্র বাহারে সাজাবে সমাজ-রাষ্ট্র। জগতের অন্য অনেক না পাওয়া, হতাশা ভুলিয়ে দেয় শিশুর অমলিন হাসি। কিন্তু সেই শিশুই আজ অমানবিক আক্রোশের শিকার, প্রতিহিংসার শিকার, নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার। পৃথিবীতে-এরচেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে। গতকাল দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত একটি সংবাদ পড়ে আমাদের দারুণ ব্যথিত করেছে। আমাদের অমানবিক কান্ড ও মূল্যবোধের অবক্ষয় কোথায় গিয়ে ঠেকেছে-তা শিশুর প্রতি এ নির্মমতাই প্রমাণ করে। ঘটনার প্রকাশ, চট্টগ্রাম সরকারি মডেল স্কুল ও কলেজের সামনে এসএসসি পরীক্ষার হলে ডিউটিরত ছিলেন খুলশী থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মো. হিরণ মিয়া। এসময় সিএনজি অটোরিকশা থেকে সড়কের পাশে কবরস্থানে ছুড়ে ফেলা হয় ৭-৮ মাস বয়সী একটি শিশুকে। হিরণ মিয়া তা দেখে ছুটে যান। মুমূর্ষু অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। শিশুটিকে উদ্ধার করা খুলশী থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মো. হিরণ মিয়া বলেন, দুপুর ১টার দিকে চট্টগ্রাম সরকারি মডেল স্কুল ও কলেজের সামনে পরীক্ষার ডিউটি পালন করছিলাম। খুলশী কলোনি থেকে পলিটেকনিক মোড়ের দিকে যাওয়া একটি সিএনজি অটোরিকশা থেকে নেমে এক ব্যক্তি কিছু একটা জিনিস সড়কের পাশে কবরস্থানে ফেলে দিচ্ছিলেন দেখছিলাম। ফেলে দিয়ে সিএনজি অটোরিকশাটি দ্রুত চলে যায়। শিশুটির শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে হাসপাতালের আইসিইউতে রাখা হয়েছে।ওসি প্রনব চৌধুরী বলেন, কারা বা কী কারণে শিশুটিকে ছুড়ে ফেলে গেছে তা খুঁজে বের করতে কাজ করছে পুলিশ। পুলিশ হেফাজতে শিশুটির চিকিৎসা চলছে। শিশুটি সুস্থ হলে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে। সভ্য সমাজের প্রধান চরিত্র হচ্ছে, নারী ও শিশুর প্রতি মানবিক আচরণ করা। হত্যা, খুন, অপহরণ, মাতৃত্ব বিসর্জনের নামে আপন সন্তানকে ছুড়ে ফেলে দেয়া বা বিক্রি করে দেয়া ও ধর্ষণ কোন সভ্য সমাজের চরিত্র হতে পারে না। ধর্মতো যুদ্ধক্ষেত্রেও শিশুহত্যা নিষেধ করেছে। কিন্তু আমাদের সমাজে কেন এসব ঘটছে সেটি গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে হবে । শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত জানা গেছে, পুলিশ শিশুটিকে কারা ছুড়ে ফেলে দিল তা খুঁজতে মাঠে নেমেছে, তাদের আশা অপরাধীরা শিগগির ধরা পড়বে।
বিগত দু’দশকে শিশু সুরক্ষায় বাংলাদেশে আইনী কাঠামো শক্তিশালী হয়েছে; নেয়া হয়েছে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ। কিন্তু সামগ্রিক বিবেচনায় ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণে স্পষ্টত শিশুর প্রতি সহিংসতার দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। বরং ভয়াবহতা ও নৃশংসতা বেড়েছে। শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে দ্রæত বিচারের সাম্প্রতিক দৃষ্টান্তের পরও দেখা যাচ্ছে নির্যাতন চলছেই। বিশেষ করে পৈশাচিক কায়দায় নির্যাতন করে হত্যার ঘটনাও ঘটছে, যা সমাজকে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে শিশুরা অবলীলায় অপহরণ ও হত্যাকান্ডের শিকার হচ্ছে। এই নৃশংসতার অবসান হওয়া প্রয়োজন। এ জন্য নতুন করে ভাবতে হবে কেন এক শ্রেণির মানুষ এতোটা বিকারগ্রস্ত হয়ে শিশুহত্যায় মেতে উঠলো।
শিশুরা নিরীহ ও দুর্বল। এ জন্য সহজেই তারা টার্গেটে পরিণত হয়। এছাড়া শিশুরা নির্যাতনের শিকার হলেও নানা পারিপার্শ্বিক কারণে তারা বিচার চাইতে পারে না। শিশু নির্যাতন বন্ধ না হওয়ার এটিও বড় কারণ। যে হারে শিশুহত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ চলছে সেটা যে কোনো সুস্থ সমাজের জন্য অশনি সংকেত। একটি সভ্য সমাজ এভাবে চলতে পারে না। শিশুরাই আগামী। তাদের পরিচর্যা করে সুষ্ঠুভাবে গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির উন্মেষ ঘটাতে হবে। পাশাপাশি অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, যে সমাজে শিশুরা নিরাপদ নয় সে সমাজ কখনো সভ্য সমাজ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।