শিশুরা অপরাধ করে না, ভুল করে

শিশু আইন বাসত্মবায়নে পুলিশ, মানবাধিকার কর্মী ও সংশিস্নষ্টদের ভূমিকা প্রসঙ্গে

এএম জিয়া হাবীব আহ্‌সান

56

জুবিন্যাল জাস্টিস এর মূলমন্ত্র হচ্ছে ‘শিশুরা অপরাধ করে না, ভুল করে’। মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস্‌ ফাউন্ডেশন-বিএইচআরএফ প্রতিষ্ঠার পর হতে সবসময়ই মানুষের অধিকর, বিশেষ করে নারী ও শিশুর অধিকার নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। নারী ও শিশুদের অধিকার রক্ষার জন্য বিশেষভাবে প্রণীত আইনসমূহ সম্পর্কে আইনজীবী, বিচারক, মানবাধিকার কর্মী, পুলিশ ও সংশিস্নষ্ট অন্যান্যদের সম্যক ধারনা থাকা প্রয়োজন। অন্যথায় নারী ও শিশু অধিকার রক্ষা করা সম্ভব হবে না। নির্যাতিত নারী শিশুদের অধিকার রক্ষার জন্য উচ্চ আদালত ও সরকারী নির্দেশনা থাকা স্বত্বেও আলাদাভাবে শিশু-কিশোরদের মামলা শিশু/কিশোর আদালতে স্থানানত্মর করা হচ্ছে না, যদিও এ ব্যাপারে আলাদা শিশু/কিশোর আদালত রয়েছে। শিশু আদালতে বিচার না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে শিশু-কিশোররা সামাজিক মানসিক বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে। মামলায় পুলিশ ফরোয়ার্ডিং এ গ্রেপ্তারকৃত শিশুর বয়স বাড়িয়ে দাগী আসামী সৃষ্টির প্রয়াস চলে। নিরাপত্তা হেফাজতের নামে চলে নারী ও শিশু ভিকটিমদের অমানবিক বন্দী জীবন । এক্ষেত্রে রাষ্ট্র, সরকার, জনগণ, জন প্রতিনিধি, বিচারক, পুলিশ, আইনজীবী, পাবলিক প্রসিকিউটর, সাংবাদিক, প্রবেশন কর্মকর্তা এবং এন.জি.ও কর্মীদের যুগপৎ ভূমিকা একানত্ম প্রয়োজন। বাংলাদেশের প্রচলিত শিশু আইন ও দন্ডবিধিতে শিশুদের সম্পর্কে যে সমসত্ম আইন সন্নিবেশিত হয়েছে সেগুলো জানা দরকার। এর সার সংক্ষেপ নিম্নরূপ :
১। ১৮ (আটারো) বছর বয়স পর্যনত্ম সকল ব্যক্তিই বাংলাদেশের শিশু বলে গণ্য হবেন। (শিশু আইন ২০১৩, ধারা-৪)।
২। ৯ (নয়) বছর বয়স পর্যনত্ম শিশু যে অপরাধই করম্নক না কেন সে সম্পূর্ণরূপে নির্দোষ বলে গন্য হবে।
৩। ৯ (নয়) থেকে ১২ (বার) বছর বয়সী শিশু কোন অপরাধ করলে যদি দেখা যায় যে, যে অপরাধ শিশুটি করেছে সেটি বুঝার মত মানসিক পরিপক্কতা শিশুটির তখনো হয়নি, তাহলে শিশুটি সম্পূর্ণ নির্দোষ বলে গন্য হবে। (দন্ডবিধি, ধারা-৮৩)
৪। শিশু আইনের ১৬ ধারা অনুযায়ী প্রতিটি শহরে বিজ্ঞ মহানগর দায়রা জজ এবং জেলার বিজ্ঞ জেলা ও দায়রা জজ শিশু আদালত হিসেব দায়িত্ব পালন বা দায়িত্ব নির্ধারণ করবেন যা শিশু আদালত হিসেবে গণ্য হবে। শিশু সংক্রানত্ম যে কোন অপরাধের বিচারের এখতিয়ার একমাত্র শিশু আদালতে থাকবে। অবকাশকালীন আদালত ছুটির প্রক্কালে দায়রা জজ ভেকেশন কোর্ট-ই শিশু আদালতের দায়িত্ব পালন করবেন। শিশু আদালত প্রয়োজনে শিশুর বয়স নির্ধারণে প্রয়োজনীয় তথ্য, তলব, তদনত্ম, অনুমান, পরীক্ষা বিবেচনা ও শুনানী পূর্বক সিদ্ধানত্ম গ্রহণ করতে পারবেন । (ধারা ২১ শিশু আইন)
৫। বিচার প্রক্রিয়ায় শিশুর অভিভাবক, আইনজীবী, সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়োজিত প্রবেশন কর্মকর্তার উপস্থিতি নিশ্চিত করা জরম্নরি।
৬। প্রয়োজনে সুবিধাবঞ্চিত শিশুকে সরকারি আইন সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
৭। কোন আমলযোগ্য অপরাধের অভিযোগে ১২-১৮ বছর বয়সী কোন শিশুকে গ্রেফতার করা হলে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিজেই তাকে জামিন দিতে পারেন। (শিশু আইন ধারা-৫২) কিন্তু সাধারণত তারা জামিন দিতে চান না। এমতাবস্থায় একজন প্রবেশন অফিসার মানবাধিকার কর্মীর উচিত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অনুপ্রাণিত (মোটিভেট) করে শিশুটির জামিনের ব্যবস্থা করা।
৮। শিশু আইনে ১৫ ধারা অনুযায়ী শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীর একত্রে চার্জশিট প্রদান করা যাবে না। বড়দের (১৮ বছরের চেয়ে বেশি বয়স্ক) সাথে শিশুদের বিচার করা যাবে না। শিশুদের আলাদা শিশু আদালতে বিচার করতে হবে। এমনকি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) এর অধীনেও যদি কোন শিশুর বিরম্নদ্ধে কোন অপরাধের অভিযোগ আনা হয়, সেক্ষেত্রেও শিশুটির বিচার শিশু আইনেই করতে হবে।
৯। থানায় কিংবা আদালতে দায়েরকৃত প্রত্যেকটি ফৌজদারী অভিযোগে বাদী/ ভিকটিম/ আসামীর/ প্রতিপক্ষের নামের সাথে বয়স উলেস্নখ করতে হবে। এতে পিতার নামের সাথে মায়ের নাম উলেস্নখ করলে ভালো হয়।
১০। ১৮ বছরের নীচের বয়স পর্যনত্ম কোন শিশু গ্রেপ্তার হলে পুলিশ ফরোয়ার্ডিং এ সঠিক বয়স উলেস্নখ পূর্বক লাল কালি দিয়ে নাম, বয়স চিহ্নিত করতে হবে। যাতে বিচারক বুঝতে পারেন যে অভিযুক্তকারী শিশু।
১১। শিশু আইনের ২৬ ধারা মতে অভিযুক্ত শিশু প্রয়োজনে সরকারি বা বেসরকারি নিরাপত্তা আবাসনে রাখা যাবে। তবে নিরাপত্তা হেফাজতের নামে তাদের কখনো সাধারণ কয়েদী/ হাজতী বা জেলাখানায় রাখা যাবে না।
১২। বিচারকালে প্রয়োজনে শিশুর ভাষা বুঝার জন্য দোভাষী নিয়োগ দিতে হবে।
১৩। অপরাধটি জামিনযোগ্য হোক বা না হোক শিশু আইনের ২৯ ধারা মতে শিশু আদালত কর্তৃক আইনের সাথে সংঘাতে জড়িত যে কোন শিশুকে জামিনে মুক্তি দিতে পারবেন।
১৪। ৩২ ধারা মতে শিশু আদালত ৩৬০ দিনের মধ্যে অপারগতায় আরো ৬০ (ষাট) দিন বৃদ্ধি করতঃ বিচারকার্য সমাপ্ত করেন। ১৭ ধারা মোতাবেক বিচারকার্য প্রত্যেক কার্য দিবসে বিরামহীন চলবে । ৩৩ ধারা মতে কোন শিশুকে মৃত্যুদন্ড, যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা কারাদন্ড প্রদান করা যাবে না। কারেকশন সেন্টারে প্রেরণ বা প্রবেশনে মুক্তি দেয়া শ্রেয়। কারাগারে রাখতে হলে তাকে সাধারণ কয়েদীর সাথে রাখা যাবে না। প্রয়োজনে তাকে ১৮ বছর না হওয়া পর্যনত্ম প্রত্যায়িত কোন শেল্টার হোম বা প্রতিষ্ঠানে আটক রাখা যাবে। ৩৪ ধারা মোতাবেক দন্ডপ্রাপ্ত শিশুকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে আটক রাখার নির্দেশ দিতে পারবেন।
১৫। শিশু আইনের ৫৪ ধারামত আইনের সংস্পর্শে আসা শিশুর বিশেষ ব্যবস্থা ও সুরক্ষা দিতে হবে। এক্ষেত্রে শিশুর সামাজিক অবস্থান, বয়স, লিঙ্গ অবস্থান ইত্যাদি বিবেচনা করতে হবে। প্রয়োজনীয় তথ্য গোপন রাখতে হবে। প্রয়োজনে ক্যামেরা ট্র্যায়েলের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বিচারকার্য পরিচালনা বা বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ৫৮ ধারায় শিশুর নিরাপত্তা ও সুরক্ষামূলক পদক্ষেপের নির্দেশনা রয়েছে। ৮১ ধারার বিধান মতে প্রিন্ট মিডিয়া ও ইন্টারনেট এবং সংবাদ মাধ্যমে বিচারকার্যের শিশুর ছবি বা কোন গোপন তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। এর জন্য ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা ১ বছর পর্যনত্ম কারাদন্ড বা উভয় দন্ড বা কোন প্রতিষ্ঠানের জন্য দুই লক্ষ টাকা পর্যনত্ম জরিমানার সাজা দেয়া যাবে।
১৬। আদালত ৮৪ ধারায়, পিতা মাতার বিচ্ছেদ বা বিরোধের কারণে বিকল্প পরিচর্যার (অষঃবৎহধঃরাব ঈধৎব) নির্দেশ দিতে পারবেন।
১৭। ৮৫ ধারার বিধান মতে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক পরিচর্যার জন্য সরকারি শিশু পরিবার, ছোটমনী নিবাস, দুঃস্থ শিশুদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র, সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানসমূহে পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে। ৮৯ ধারায় সুবিধাবঞ্চিত শিশু বর্ণনা দেয়া হয়েছে যেমন আইনানুগ বা বৈধ অভিভাবককহীন শিশু, যৌন নির্যাতন বা হয়রনীর শিকার শিশু, ভিক্ষাবৃত্তি বা শিশুর মঙ্গলের পরিপন্থি কোন কার্যে লিপ্ত শিশু ইত্যাদি।
১৮। ৫২ ধারার বিধানমতে গ্রেফতারকৃত শিশুকে দ্রম্নত আদালতের মাধ্যমে কিংবা আইনী পন্থায় জামিন প্রদান সম্ভবপর না হলে সংশিস্নষ্ট ও.সি বা পুলিশ কর্মকর্তা অভিভাবক বা প্রবেশন কর্মকর্তার জিম্মায় শর্ত ও জামানত ব্যতীতও জামিনে মুক্তি দিতে পারবেন। ন্যায় বিচার ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে গ্রেফতারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে (প্রয়োজনীয় সময় ব্যতীত) আদালতে হাজির করবেন। শিশু আদালত তাকে জামিনে মুক্তি দিবেন অথবা নিরাপদ জামিনে মুক্তি দিবেন অথবা নিরাপদ স্থানে বা শিশু উন্নয়নকেন্দ্রে আটক রাখার আদেশ দিবেন। সমাজসেবা অধিদপ্তরের চট্টগ্রামে কর্মরত প্রবেশন কর্মকর্তার নাম পারম্নমা বেগম।
১৯। চট্টগ্রামের কতিপয় কেন্দ্রের তালিকা : ক। ছোটমনি নিবাস, পরিচালনায়- সমাজসেবা অধিদপ্তর, বয়সসীমা ০-৭, ঠিকানা- রউফাবাদ, থানা- বায়েজিদ, চট্টগ্রাম। খ। মহিলা ও কিশোরী নিরাপদ আবাসন, পরিচালনায়- সমাজসেবা অধিদপ্তর, বয়সসীমা- যে কোন বয়সের মহিলা, ঠিকানা- নুর মিয়ার হাট, ফরহাদাবাদ, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। গ। ড্রপ ইন সেন্টার (বালক), পরিচালনায়- অপরাজেয় বাংলাদেশ, বয়সসীমা- ৬-১৮, ঠিকানা- ১৬, স্টেশন রোড, বিআরটিসি মোড়, চট্টগ্রাম। ঘ। পিকার (বালিকা), পরিচালনায়- অপরাজেয় বাংলাদেশ, বয়সসীমা- ৬-১৮, ঠিকানা- বহদ্দারহাট, বয়স- ৬-১৮, খাজা রোড়, চান্দগাঁও থানার নিকটে। ঙ। মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রতিষ্ঠান, পরিচালনায়- অপরাজেয় বাংলাদেশ, বয়সসীমা- ০-১৮, ঠিকানা- রউফাবাদ, থানা- বায়েজিদ। চ। প্রশানিত্ম-২, পরিচালনায়- জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি, বয়সসীমা- যে কোন বয়সের, ঠিকানা- পূর্ব ফিরোজ কলোনী, খুলশী। ছ। এস ও এস শিশু পলস্নী, পরিচালনায়- এস ও এস শিশু পলস্নী, বয়য়সীমা- ০-১৮ বয়সের এতিম শিশু, বস্নক-এ (বিডিয়ার মাথের দক্ষিণ পশ্চিমে) হালিশহর। জ। শিশু সনদ (বালিকা), পরিচালনায়- সমাজসেবার অধিদপ্তর, বয়সসীমা- ৬-১৮, ঠিকানা- রউফাবাদ, থানা- বায়েজিদ। ঝ। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেল, পরিচালনায়- মহিলা ও শিশুবিয়য়ক মন্ত্রণালয়, বয়সসীমা- ০-০৬, ঠিকানা- বাড়ী নং ু ১৪, রোড নং-০২, নাসিরাবাদ হা/সো। ঙ। কর্ণফুলী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র (মহিলা), পরিচালনায়- অপারাজেয় বাংলা, বয়সসীমা- ৭-১৮, ঠিকানা- লালদীঘির পূর্ব পাড়, কোতোয়ালীচট্টগ্রাম।
জাতীয় শিশু নীতি ২০১১ কেও শিশুর অধিকার সংক্রানত্ম নীতিমালা ঘোষিত হয়েছে। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ বাসত্মবায়নে আমাদেরকে সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে।

লেখক : কলামিস্ট, আইনজীবী,