শিক্ষা ভেঙ্গে পড়ার অর্থ হলো একটি জাতির অবলুপ্তি

62

আফ্রিকার সবচেয়ে সুপরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকা। এর প্রধান ফটকে লেখা রয়েছে। যা বাংলায় অনুবাদ করলে অর্থ দাঁড়ায় কোন জাতিকে ধ্বংস করার জন্য পারমানবিক হামলা কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দরকার নেই; বরং সেই জাতির শিক্ষার্থীদের পরিক্ষায় প্রতারণার সুযোগ দিলেই হবে। কারণ এভাবে প্রতারণার মাধ্যমে পাস করা ডাক্তারদের হাতে রোগীর মৃত্যু হবে। ইঞ্জিনিয়ারদের তৈরি দালানকোঠা, ইমারত ধ্বংস হবে। অর্থনীতিবিদদের দিয়ে পরিচালিত পাবলিক ও দেশের আর্থিক খাত দেউলিয়া হবে। এ ছাড়া বিচারকদের হাতে বিচারব্যবস্থার কবর রচনা হবে। সুতরাং শিক্ষা ভেঙ্গে পড়ার অর্থ হলো একটি জাতির অবলুপ্তি। বিগত ৪৮ বছর একটি সুস্থ ধারার শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এ কারণে উন্নয়ন প্রকল্পের সর্বস্থানে দুর্নীতি নামক ভয়ংকর রোগ জন্ম নিয়েছে বলা যায়। প্রতিদিনের খবর দেখলে এর সত্যতা দিনের আলোর মত স্পষ্ট হয়ে যায়। প্রকল্প বাজেটের অর্ধেক টাকা যায় নিজেদের পকেটে। বাকি অর্ধেক টাকা ব্যয় হয়। সে কারণে কাজটি উন্নতমানের হয় না।
সম্প্রতি একটি পত্রিকার হেডলাইন ছিল এ রকম কোচিং বাণিজ্যের চেয়েও ভয়াবহ হলো ডাক্তারদের ল্যাবরেটরি টেস্টের কমিশন বাণিজ্য। রোগী গেলেই একগাদা টেস্টের ঝামেলায় পড়তে হয়। ড্রাইভারদের লাইসেন্সের মতো ডাক্তারদের লাইসেন্স যদি চেক করা হতো তবে অসংখ্য ভুয়া ডাক্তারের তালিকা বের হয়ে আসত। কিছু ডাক্তার আছেন তারা কিছুতেই ঢাকা থেকে যেতে চান না। কারণ এখানে আয় রোজগার জেলা শহর থেকে বেশি। যাদের সামর্থ্য আছে তারা ভারত, থাইল্যান্ড বা সিঙ্গাপুর যায় সঠিক চিকিৎসা নিতে।
গুণী মানুষের কথা- তুমি যদি যুদ্ধ ছাড়াই কোনো জাতিকে ধ্বংস করতে চাও তাহলে সেই জাতির যুবকদের মাঝে অশ্লীলতা ও নগ্নতা ও নেশা জাতীয় দ্রব্য ছড়িয়ে দাও। আজ বোধ হয় সেটারই শিকার। মানুষ কোনটা মন্দ এবং কোনটা ভালো তা জানে না। এমনটি নয়, কিন্তু চুপ থাকেÑ কারণ বোবার শত্রæ নেই। বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা এতটাই ভয়াবহ যে। সত্য কথা বললেই যেকোনো সময় তার ওপর বিপদ হানা দিতে পারে। কিন্তু আল্লাহ বলেছেন- ‘সত্য কথা বলতে গিয়ে যদি আপন মানুষ পর হয়ে যায়। তবুও তুমি, সত্য কথা বলো। কারণ কারো কাছে পর হলেও আল্লাহর কাছে তুমি হবে প্রিয়। ‘বিশ্বের সেরা এক হাজারের মধ্যেও আমাদের গর্বের ধন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই। শিক্ষাব্যবস্থা যে তলানীতে চলে গেছে, সচেতন মানুষ মাত্রই তা বুঝতে পারে।
প্রতিহিংসায় জ্বলছে সরকারি ৯টি বিশ্ববিদ্যালয়। এরকম চিত্র বিশ্বের অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে বলে মনে হয় না। অক্টোবর ২০১৯ একটি ভয়ংকর খুন জাতি অবলোকন করেছিলÑ নামীদামি বুয়েট ইউনিভার্সিটিতে। বুয়েট প্রশাসন এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডে নীরব দর্শকের ভ‚মিকা পালন করেছে। এটি নিশ্চিত যে আবরার শহীদ হয়েছে, আর জাতির কাছে রেখে গেছে কিছু প্রশ্ন। ভিন্ন মত নিয়ে দেশের বিষয় নিয়ে কথা বললে আবরারের মতো যেকোনো মানুষকে পেশাচিক কায়দায় খুন হতে হবে। মৃত্যুর মাধ্যমে আবরার এ রকম একটি বার্তা দিয়ে গেল। দেশ সুরক্ষার চেতনা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল। আমাদের দেশের অবস্থার বর্তমান কি হাল তা ভাবনার সময় এসেছে। অর্থের বিনিময়ে এখন সব কিছু করা যায়। এক শ্রেণীর তল্পিবাহক, মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী মনে হয় অর্থের সাথে মিলে গেছে। ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী দুঃখ করে বলেছেন, ‘এ দেশের কিছু বুদ্ধিজীবীরাও বিশ্বাস ঘাতক ও মীরজাফর। (তথ্যসূত্র : জাতীয় দৈনিক, ১৫-১০-১৯)
২ নভেম্বর ২০১৯ জাতীয় প্রেস ক্লাবে মৌলিক অধিকার সুরক্ষা কমিটি আয়োজিত ‘হুমকির মুখে বাকস্বাধীনতা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, নাগরিকের বাকস্বাধীনতা গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য অঙ্গ। তিনি ্আরও বলেন মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। অনেক রক্ত ঝরেছে স্বাধীনতা যুদ্ধে। তাই তর্কহীন, প্রশ্নহীন সমাজ কিন্তু মৃত সমাজের মত। রাষ্ট্র বা সরকারকে সঠিক পথে এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রধান স্তম্ভ বাকস্বাধীনতা, কথার স্বাধীনতা না থাকলে কোনো সৃষ্টিশীল কাজ হয় না। সারা পৃথিবীজুড়েই এর চর্চা চলছে। বিবিসি, সিএনএন এসব মিডিয়া যারা দেখে তারাই উপলব্ধি করতে পারবে বাকস্বাধীনতার মর্ম কী।
কেউ কেউ বলেন, বাংলাদেশ সিঙ্গাপুর, হংকংয়ের মতো উন্নত হয়ে গেছে। যদি তাই হয়, তাহলে আট কিলোমিটার রাস্তা পেরোতে আমাদের দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগে কেন ? আর ওই দুটো দেশে সময় লাগে মাত্র ৩০ মিনিট। আমরা আসল কথাটা বলি না, সড়ক নির্মাণে যে দুর্নীতি হয় তা অনেক দেশের যোগাযোগ খাতে বাজেটের সমতুল্য। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে কার কারণে সাধারণ যাত্রীরা এই ভোগান্তির শিকার হয় ? এখন গাড়িতে উঠে ভাবি, নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবো তো। মেয়েরা ভাবে, সম্মান নিয়ে ধর্ষিতা না হয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারব তো। শিক্ষার্থীরা ভাবে- নিরাপদে শিক্ষাজীবন অতিক্রম করতে পারব তো। এ প্রসঙ্গে মরহুম সংসদ সদস্য মঈনউদ্দিন খান বাদল বলেছেন, দেশে ৭০ শতাংশ সংসদ সদস্যই কোটিপতি। তারা তো গত ৩০ বছরেও বাসে চড়েনি। তা হলে তারা কিভাবে সাধারণ মানুষের কষ্টের কথা সংসদে বলবেন। যারা আইন করেন, তারা নিজেরাই পরের দিন আইন ভঙ্গ করেন। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ওভারব্রিজ ও ফ্লাইওভার নির্মাণের যে সংস্কৃতি চলছে তা কতটুকু সাধারণ মানুষের উপকারে আসে তা ভাবা উচিত। লক্ষনীয় যে, শিশু ও বৃদ্ধরা ওভারব্রিজে উঠতে পারে না। নামতেও পারে না। এসব ক্ষেত্রে দুর্ঘটনাও ঘটছে। অন্য দিকে একের পর এক ফ্লাইওভার নির্মাণ হচ্ছে, করা হচ্ছে। এই ফ্লাইওভারগুলোতে কয়টা বাস ওঠে আর কয়টা প্রাইভেট কার ওঠে তাও ভাবতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিয়োজিত কর্মকর্তারা এসব বিষয়ে চিন্তা করা দরকার বলে মনে করি। প্রত্যেক মানুষের যেমন অধিকার আছে- তেমনি আছে কর্তব্য ও দায়িত্ববোধ। বাবা-মা, ছাত্র-শিক্ষক। রাষ্ট্রের প্রতিটি অবস্থানে যারা আছেন- তাদেরও অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ আছে।
প্রবাসী প্রশিক্ষকরা ফিরে আসছেন
এবার অন্য একটি প্রসঙ্গ। প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানি সন্তোষজনক নয়। অনেকে মনে করেন, এ ক্ষেত্রে ধস নেমেছে। ১০ বছরের জনশক্তি রফতানির পরিসংখ্যান দেখলে অভিযোগ অস্বীকার করা যায় না। ২০০৭-২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যে ধসের শুরু তা পরে কখনই পুরো কাটিয়ে ওঠা যায়নি। সম্প্রতি যোগ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে শ্রমিকদের বিপুল সংখ্যা ফিরে আসার প্রবণতা। বেশির ভাগ শ্রমিক ফিরে আসছেন নির্যাতনের শিকার হয়ে, কোনো কোনো দেশ শ্রমিক নেয়া বন্ধ করে দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আমাদের দুতাবাসের আউটপাস নিয়ে যারা ফিরছেন বিমান বন্দরে ইমিগ্রেশন পুলিশ তাদের প্রত্যেকের জবানবন্দী রেকর্ড করছে। এতে জানা গেছে, কর্মীরা চরম নির্যাতনের শিকার হয়েই ফিরছেন। গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এভাবে ফিরেছেন প্রায় ৩৬ হাজার শ্রমিক (নারী-পুরুষ) এই পরিস্থিতি শুধু উদ্বেগজনক নয় রীতিমত বিপর্যয়কর। কাজের সন্ধানে যারা বিদেশে যান, তারা শখ করে যান না। দুটো পয়সা রোজগার করে নিজের ও পরিবারের মুখে সামান্য হাসি ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় তারা বিদেশে গেছেন। অনেকে নিজের শেষ সম্বল বিক্রি করেও বিদেশে যাওয়ার ঝুঁকি নেন। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে। এক্ষেত্রে আমাদের রফতানি নীতির দুর্বলতাও দায়ী। জনশক্তি রফতানিতে কিছু স্বার্থান্বেষী সিন্ডিকেট। শ্রমিকদের কাছ থেকে খুব বেশি অর্থ আদায় ও দুর্নীতি এজন্য দায়ী। আমাদের মনে হয়, অবিলম্বে জনশক্তি রফতানির পুরো প্রক্রিয়াটি নতুন করে ঢেলে সাজানো দরকার।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট