শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ছাত্র রাজনীতি

লিটন দাশ গুপ্ত

25

গত তিন দশক আগের জনপ্রিয় একটি গান মনে পড়ে গেল আজ। গানটির কথা সুর শিল্পী, নকুল কুমার বিশ্বাস। আর গানটি এই রকম-
‘যদি পাশ করার আগে লাশ হয়ে মা বাড়ি ফিরতে হয়,
আমি কোন ভরসায় যাব মাগো বিশ্ববিদ্যালয়।’
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে শিক্ষিত জ্ঞানী ব্যক্তি তৈরী করার এক জাতীয় কারখানা বিশেষ। এখানে প্রাথমিক, মাধ্যমিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্ব-স্ব স্তর অনুযায়ী, নির্ধারিত শিক্ষাক্রমের বিষয়বস্তু শিক্ষণ ও শিখণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রের শিক্ষিত সুনাগরিক তৈরী হবে, এটাই মূল কথা। সাধারণত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা শেষে চিকিৎসা প্রকৌশল শিক্ষা আইন ইত্যাদি ক্ষেত্রে অবদান রাখবে আজকের দিনের শিক্ষার্থী। বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ের পেশাজীবী হবে, উর্দ্ধতন সরকারি কর্মকর্তা সহ গুরুত্বপদে নিযুক্ত হবে এটাই মাতা পিতা অভিভাবক সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রত্যাশা। কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দলবাজি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, হানাহানি, খুনাখুনি যা স্বাভাবিকভাবে দেশের চিন্তাশীল বিবেকবান দায়িত্বশীল মানুষকে কেবল ভাবিয়ে তুলছে না, বিভিন্ন অনাকাঙ্খিত ঘটনায় আতংকিত ও শংকিত করে তুলেছে।
সাধারণত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দরিদ্র নি¤œবিত্ত বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির সন্তানেরা শিক্ষা গ্রহন করতে আসে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে থাকে বা ভর্তি করিয়ে থাকে। এই দিকে পাবলিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার মান ও পরিবেশ নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ। তাই সেই হিসাবে ছাত্রছাত্রী যাচাই বাছাই প্রক্রিয়া শেষে প্রতিদ্বন্দ¦ীতার মাধ্যমে, সাধারণত মেধাবী ছেলেমেয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়ে থাকে। এখন কথা হচ্ছে উচ্চ শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কি, এই সম্পর্কে বইয়ে যা থাকুক না কেন; আমি মনেকরি, উচ্চ শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর জ্ঞান বুদ্ধি বিকাশের পাশাপাশি বিবেক আবেগের প্রসার ঘটতে হবে। বিবেক আবেগের প্রসার না ঘটলে সেখানে সঠিক জ্ঞান বুদ্ধির বিকাশ হচ্ছেনা ধরে নিতে হবে। আর জ্ঞান বুদ্ধির বিকাশ না হওয়া মানে সার্টিফিকেট সর্বস্ব লেখাপড়া। যার মাধ্যমে শিক্ষায় সার্টিফিকেট অর্জন করা যাবে, সুনাগরিক তৈরীর বিষয়ে প্রশ্নই আসেনা। আর সুনাগরিক তৈরী না হলে বাস্তব ক্ষেত্রে যা হবার কথা তাই হচ্ছে, এবং সঠিক ব্যবস্থা না নিলে আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে, শিক্ষা গ্রহনের মূলকেন্দ্র। ‘ছাত্রনং অধ্যয়নং তপঃ’ বলে একটা কথা আছে। এখানে শিক্ষার্থীকে শিক্ষা নিয়ে তপস্যা করা ছাড়া অন্য কিছুর সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবে হচ্ছে তা কি! অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কথা না হয় বাদ দিলাম, গত ১০/১২ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা বা বুঝা যাবে, কেবল শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ১০/১২ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে রাজনীতির কারণে। আর এই জন্যেই চিন্তাশীল বুদ্ধিজীবীর একাংশের মধ্য থেকে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব এসেছে। সার্বিক বিষয়ে পর্যালোচনা করলে যা অযৌক্তিক নয়। তবে যৌক্তিক হলেও দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় অনেক চাওয়া পাওয়া ক্ষেত্রে ছাত্র রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই দেশের ছাত্র রাজনীতির ইতিহাস গৌরব উজ্জ্বল ও সমৃদ্ধ। সেই দিক বিবেচনা করলে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার বিষয়ে জনসাধারণের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে মতানৈক্য দেখা দিবে বা দিয়েছে। তাই ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা না গেলেও ছাত্র রাজনীতিতে ব্যাপকভাবে গুনগত পরিবর্তন আনতে হবে। আর তা দায়িত্ব নিতে হবে বর্তমানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীল পর্যায়ের নেতা কর্মীদের।
এখানে আমি কিছু শিক্ষার্থীর উচ্ছৃঙ্খলতা ও বিশৃঙ্খলতার কারনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল শিক্ষার্থী একই চরিত্রের, তা কিন্তু বলছিনা। একইভাবে একটা বৃহৎ ছাত্র সংগঠনের কয়েকজন ছাত্র বিপথগামী হলে ঐ পুরো ছাত্র সংগঠনকে দায়ী করছিনা। এখন কথা হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যদি রাজনীতি থাকে তবে তা হতে হবে সুষ্ঠু ধারার রাজনীতি। এখন আজকের লেখায় আমার মূলকথা, স্বাধীনভাবে সবার মত প্রকাশের অধিকার থাকতে হবে; সে যেকোন মতের হোক, যেকোন দলের বা ধর্মের হোক। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনীতি থাকবে, তবে খুন হত্যা থাকবেনা। আর খুন হত্যা থাকলে রাজনীতি থাকবেনা। খুন হত্যার রাজনীতি চলতে থাকলে ছাত্র রাজনীতি অবশ্যই নিষিদ্ধ করতে হবে এটাই আমার শেষ কথা। একই সাথে আমি বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার তীব্র নিন্দা ক্ষোভ ও ঘৃনা প্রকাশ করছি।