শিক্ষা আইন শিক্ষা খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসুক

13

প্রায় সাড়ে সাত বছর ধরে ব্যাপক চিন্তা, গবেষণা, সংযোজন-বিয়োজন শেষে অবশেষে চূড়ান্ত করা হয়েছে ‘শিক্ষা আইন-২০২০’ এর খসড়া। এ আইনে নোট-গাইড বই নিষিদ্ধের বিধান রাখা হলেও কোচিং বাণিজ্যকে শর্ত সাপেক্ষে বৈধতা দেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। যা শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। অভিযোগ রয়েছে, নোট-গাইড বই ব্যবসায়ী ও কোচিং বাণিজ্যে জড়িত সিন্ডিকেটের অনৈতিক প্রভাবের কারণেই বার বার বহুল প্রত্যাশিত এই আইনটি বাধার মুখে পড়েছে। সম্প্রতি জাতীয় একটি দৈনিকে এ সংক্রান্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আমলা ও শিক্ষা প্রশাসনের গুটি কয়েক ব্যক্তির যোগসাজসে ওই চক্রটি যেকোন মূল্যে প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন থেকে নিজেদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ধারা-উপধারাগুলো বাদ রাখতে চান। শেষ পর্যন্ত তারা কিছুটা সফলও হয়েছেন বলে প্রকাশিত খসড়া আইনের ধারাগুলো পড়ে অনুমান করা যায়। তবে আমরা মনে করি, নোট ও গাইড বই নিষিদ্ধ করার বিষয়ে এবং কোচিং-এর শর্ত প্রতিপালনে আইনের ধারা প্রয়োগে শিক্ষা বিভাগ ও প্রশাসন কঠোর হলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কিছুটা হলেও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য যে, ‘জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০’র আলোকেই ‘শিক্ষা আইন- ২০১১’ প্রণয়ন করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ২০১২ সালে শিক্ষা আইনের প্রথম খসড়া তৈরি করা হয়। পরে সংযোজন-বিয়োজন শেষে ২০১৩ সালের ৫ আগস্ট জনমত যাচাইয়ের জন্য এই খসড়া মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নিয়ে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ দিয়ে সেটি ফেরত পাঠানো হয়। এরপরই আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে পড়ে খসড়া আইনটি। পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসা, নোট-গাইড বই ব্যবসায়ী ও কোচিং ব্যবসায়ীরাও এই আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছিল।
অবশেষে শিক্ষা আইন-২০২০-এর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। শিগগিরই এটি পাস হয়ে কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আমরা মনে করি, বহু ধারা ও বহু মত-পথের শিক্ষাব্যবস্থার দেশে মানসম্মত ও যুগোপযোগী একটি শিক্ষা আইন এবং সেটির বাস্তবায়ন ও সর্বক্ষেত্রে অনুসরণের বিকল্প নেই। এ অবস্থায় প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনটি দ্রæত পাস ও কার্যকরের ব্যবস্থা যেমন নিতে হবে, তেমনি এতে কোনো সমস্যা আছে কিনা, শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ নিয়ে আগেই সেগুলো খতিয়ে দেখে সমাধান করে নিতে হবে। দেশে শিক্ষার স্তর তিনটি বলা হলেও আপাতত শিক্ষা আইনে চারটি স্তরই বহাল থাকছে। অবশ্য শিক্ষার বিষয়টি সার্বক্ষণিক চলমান হওয়ায় হুট করে এক পদ্ধতি থেকে আরেক পদ্ধতিতে পরিবর্তনের সুযোগ নেই। এ কারণে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হওয়ার সুযোগ থাকছে শিক্ষা আইনে। ফলে শিক্ষানীতির সঙ্গে প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন-২০২০-এর কোনো সংঘর্ষ হওয়ার সুযোগ নেই। প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনে শিক্ষকের কোচিং, টিউশন ও নোট-গাইড বই নিষিদ্ধ করা হলেও শর্তসাপেক্ষে কোচিং-টিউশনকে বৈধ রাখা হয়েছে। শিক্ষকরা নিজেদের প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের ছাড়া অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পড়াতে পারবেন। আমরা মনে করি, আইনে এমন বিধানও রাখা উচিত নয়। কারণ এতে করে এক স্কুলের শিক্ষকরা পারস্পরিক যোগসাজশে শিক্ষার্থীদের অন্য স্কুলের শিক্ষকদের কাছে পাঠাবেন এবং তারা নিজেদের ছাত্রদের বিনিময় পদ্ধতিতে রমরমা কোচিং বাণিজ্য ঠিকই চালিয়ে যাবেন। কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করতে না পারলে ক্লাসরুমে পড়া, শেখা ও পাঠ্যবইয়ের মজার জগতে শিক্ষার্থীদের ফেরানো যাবে না। পৃথিবীর কোনো দেশেই যেখানে কোচিং, প্রাইভেট বাণিজ্য নেই, সেখানে আমাদের কেন এটি রাখতেই হবে, তা বোধগম্য নয়। প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনে অনুমতি ছাড়া কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করা যাবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি আগে থেকেই কেন ছিল না, তা বিস্ময়ের বৈকি! এখন আইন পাসের পর যেন অনুমতি ছাড়া, যথাযথ পরিবেশ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করার রেওয়াজ চালু না থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে জোর পদক্ষেপে। শিক্ষাব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে না পারলে যে শৃঙ্খলাবদ্ধ জাতি নিশ্চিত করা যাবে না, তা শিক্ষা খাত সংশ্লিষ্টদের বুঝতে হবে এবং কোনো ধরনের অন্যায় আবদার-সুবিধার কাছে নিয়মের ব্যাপারে আপস করার রেওয়াজ বন্ধ করতে হবে। কারণ আমাদের শিক্ষা খাত অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত এবং নিয়ম মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনুমোদনের সংখ্যা খুবই কম। প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনের ইতিবাচক একটি দিক হল, এতে বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি নির্ধারণ করে দেবে সরকার, এমন নিয়ম রাখা হয়েছে। এতে করে শিক্ষার্থীদের গলা কেটে টাকা কামাইয়ের পথ বন্ধ করা যাবে বলে আশা করা যায়। এছাড়া নোট ও গাইড বইয়ের ব্যবসার ক্ষেত্রে তিন বছরের জেল বা ৫ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আইনটি কার্যকর হলে শিক্ষাব্যবস্থায় কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা যায়।