শিক্ষায় নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা

সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন

25

পৃথিবীর সব মহামানব ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন আপন চরিত্রবলে। তাঁরা তাঁদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ কাজে লাগিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছেন। একটি দেশ ও জাতির জন্য নৈতিকতা ও মূল্যবোধের গুরুত্ব অপরিসীম। কোনো দেশ বা জাতির টেকসই উন্নয়নে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ চর্চা অত্যাবশ্যকীয়। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অনুধাবন করতে পেরেছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি না পেলে কখনোই পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাঁর নৈতিকতা ও মূল্যবোধই তাঁকে পাকিস্তানিদের অনৈতিক নিগ্রহ থেকে বাঙালিকে মুক্ত করার জন্য সংগ্রাম করার অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। তাই বলা যায় মানুষের জীবনকে শুদ্ধ ও পরিশীলিতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিশল্যকরণী ও প্রথম সূর্যসিঁড়ি হলো নৈতিকতা। নীতির প্রতি মূল্যায়ন, সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন থেকেই আসে নীতিবোধ আর এই নীতিবোধ থেকেই নৈতিকতা। অন্যদিকে নিজের বুদ্ধি ও সক্ষমতার দ্বারা প্রতিটি জিনিস ও কাজের ভালো-মন্দ, দোষ-গুণ বিচার-বিশ্লেষণ বা মূল্যায়ন করার মানসিকতাই হলো মূল্যবোধ।
সুষ্ঠু, গতিশীল সমাজ বিনির্মাণে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম, আর এ ধরনের শিক্ষা মূলত একটি চলমান প্রশিক্ষণ।
এটি শেখার জন্য ব্যবস্থাপনা, অনুশীলন ও চর্চার প্রয়োজন জরুরি। নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষার বীজ গ্রথিত হয় পরিবারে; কিন্তু বিকশিত হয় সমাজে। এই সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়ার ধাপ ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও সর্বোপরি রাষ্ট্রে নিহিত। শিশুর বা সন্তানের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষার প্রথম ও প্রধান উৎস হলেন তার মা-বাবা ও অভিভাবকরা। তাঁরা যদি সৎ ও সুন্দর পরিশীলিত চরিত্র ও মার্জিত আচরণের অধিকারী হন, সন্তানরা দেখে দেখেই তা আয়ত্ত করবে। এই শিক্ষা পরিবার থেকে শুরু হবে আর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবেন শিক্ষকরা। শিক্ষাজীবন নৈতিকতা ও মূল্যবোধ অনুশীলন এবং চর্চার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র। আমাদের দেশে শিক্ষার তিনটি স্তর রয়েছে; যেমন—প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা। এর মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা স্তরটি যেকোনো শিক্ষার্থীর মেধা ও মনন বিকাশে সর্বোচ্চ সহায়ক সময়। প্রাথমিক শিক্ষাই একজন শিক্ষার্থীর অঙ্কুরোদ্গমের সময়। তাই প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষার ক্ষেত্রে জোর দিতে হবে। শিক্ষকরা তাঁদের অভিভাবক হিসেবে সততা, দায়িত্ববোধ, স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষা দেবেন। আমাদের স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত প্রজন্মের কোনো বিকল্প নেই-কথাটি মাথায় রেখে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ চর্চা কেন্দ্র হিসেবে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে নানামুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। নৈতিক শিক্ষা কার্যক্রমকে বেগবান করতে হলে শিক্ষার্থীদের শুধু পুঁথিগত বিদ্যায় সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের নৈতিক শিক্ষা সংবলিত গল্প, কবিতা, ছড়া ও উপন্যাস ইত্যাদির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। নৈতিকতা ও মূল্যবোধ সম্পর্কিত কাজগুলো নিয়ে শ্রেণিকক্ষে আলোচনা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের ভালো কাজ করতে উৎসাহিত এবং খারাপ কাজে নিরুৎসাহ করতে হবে। তারা যেন তাদের আশপাশের মানুষদের সুখে-দুঃখে, বিপদে, আনন্দে পাশে থাকে, তা শেখাতে হবে। সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মনের জানালা খুলে দিতে হবে, যাতে ঠিকমতো তাতে আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে মূল দায়িত্ব শিক্ষকদেরই নিতে হবে।
বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে দেশে জঙ্গিবাদ, মাদক, ধর্ষণ, সন্ত্রাসবাদ বিস্তারের এই সংকটকালে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক গুণাবলির বিকাশ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার কোনো বিকল্প নেই। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের অন্তরে ধারণ করাতে শিক্ষকদের সচেষ্ট হতে হবে। বিদ্যালয়ের স্তর পার করে যখন একজন শিক্ষার্থী মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও পরবর্তী সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্পণ করে তখন তার ভেতরে সামাজিক মূল্যবোধের জায়গাটা বিকশিত হয়। আগে যেই মূল্যবোধ ছিল ব্যক্তিকেন্দ্রিক, তা পূর্ণতা লাভের পথে পরিব্যাপ্ত হয় সামাজিক পরিমন্ডলে। শৈশবে শিখে আসা ধ্যান-ধারণার বীজটি তখন চারাগাছ থেকে বৃক্ষে পরিণত হওয়ার পথে ধাবিত হয়। এছাড়া শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বিকাশে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। প্রায় প্রতিটি ধর্মেই করণীয় ও বর্জনীয় সম্পর্কে বলা আছে। ধর্মের প্রকৃত পাঠই শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।
এ ক্ষেত্রে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে কেউ যাতে শিক্ষার্থীদের ভুল পথে পরিচালিত করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সামাজিক জীব হিসেবে মানুষের ওপর পরিবেশ ও প্রতিবেশের প্রভাব প্রকট। সুতরাং আমাদের সমাজজীবনের প্রতিচ্ছায়া শিক্ষার্থীর মন, মানস ও শিক্ষাকে প্রভাবিত করে। নৈতিকতা ও মূল্যবোধ অনুশীলন যেহেতু সমাজের দ্বারাই পূর্ণতা পায় এ জন্য সহায়ক পরিবেশ, ন্যায়বিচার, সুশাসন, স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক সহনশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ অনুশীলন মানুষকে তার শিকড়কে ভালোবাসতে শেখায়, তার মাটি ও মানুষকে আপন করে নিতে শেখায় এবং দেশপ্রেম জাগ্রত করে। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা যে স্বকীয়তা অর্জন করেছি, সেই স্বকীয়তা সততার মাধ্যমে ধারণ করে পরবর্তী প্রজন্মের মননে তা প্রোথিত করতে হবে।