শিক্ষায় কোচিং ও গাইডবুক মাহমুদুল হক আনসারী

24

শিক্ষায় কোচিং ও গাইড বাণিজ্য কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না। একেবারে শিশু থেকে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষায় কোচিং এবং গাইড বাণিজ্য ধাপটের সাথে অব্যাহত আছে। রাষ্ট্রের নানা দপ্তরের তৎপরতা আর শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তি প্রতিষ্ঠানের ওইসব অপতৎপরতার বিরোদ্ধে সোচ্চার হলেও বাস্তবে শিক্ষাক্ষেত্রে তার কোনো মুক্তির লক্ষণ মিলছে না। স্বয়ং বিদ্যালয় শিক্ষক সমাজ ছাত্র ছাত্রীদের জন্য কোচিং ও গাইড নির্ধারণ করে দিচ্ছে। যতই মেধাবী হোক না কেনো গাইড এবং কোচিংয়ের শরণাপন্ন তাকে হতেই হচ্ছে। অন্যথায় পরিক্ষায় ওই ছাত্র অকৃতকায্র্ হচ্ছে। অর্থের লালসায় স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে এভাবে সারাবছর কোচিং এবং গাইড বইয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের প্রলুব্দ করা হচ্ছে।
গাইড এবং কোচিং ছাড়া শিক্ষার্থী বাস্তব সিলেবাস থেকে নিয়মমাফিক কোনো শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে না। অভিযোগ আছে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে শুধুমাত্র গাইড বই দিয়েই ছাত্রছাত্রীদের তৈরী করা হয়। বইয়ের কতিপয় সেপ্টার থেকে নির্ধারিত প্রশ্ন ঠিক করে গাইড বইয়ের সহযোগীতায় পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে শিক্ষার্থীদের বলা হয়। বাকি বইয়ের সেপ্টার গুলো শিক্ষক শিক্ষার্থী কেউই পড়ছে না। এ যদি হয় শিক্ষার দশা তাহলে অভিভাবক এবং রাষ্ট্র কী করবে? শিক্ষক সমাজ সমাজের মানুষের কাছে অত্যান্ত সম্মানের পাত্র। তাদের সমস্ত সুযোগ সুবিধা প্রদান করতে অভিভাবক এবং রাষ্ট্র খুবই আন্তরিক। বর্তমান সমাজে শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে তাদের সামাজিক চাহিদা পূরণে সমাজ ও রাষ্ট্র অসম্ভবভাবে তৎপর। তাদের সামাজিকভাবে আত্মমর্যাদায় বেঁচে থাকতে সব ব্যবস্থায় সমাজ এবং রাষ্ট্র করছে। বর্তমানে শিক্ষকদের সাথে অন্য পেশার চাকুরীজীবিদের বেতন ভাতার বৈষম্য নেই। বরং শিক্ষক সমাজের সুযোগ সুবিধা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরো বৃদ্ধি করা হয়েছে। এত সব সুযোগ সুবিধার মধ্যেও আমাদের শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক সমাজ কেনো গাইড বই এবং কোচিং বাণিজ্য থেকে সরে আসছে না সেখানেই অভিভাবকদের মাথা ব্যাথার কারণ। একটা জাতিকে তার অভিস্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। এই শিক্ষার কারিগর হচ্ছেন আমাদের শিক্ষক সমাজ। তাদের হাতেই তৈরী হচ্ছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, মাষ্টার শিক্ষক রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেক্টরের উপযুক্ত কারিগর। তারাই পারেন দেশ জাতিকে এগিয়ে নিতে এবং পিছিয়ে রাখতে। বলতে চাই তাহলে আমরা শিক্ষায় আদর্শে এগিয়ে না পিছিয়ে।পর্যালোচনায় দেখা যায় আজ থেকে কয়েক যুগ আগের শিক্ষা এবং পরের শিক্ষায় যথেষ্টভাবে তফাত দেখছি। তখনকার শিক্ষা সিলেবাস, শিক্ষকসমাজ ছিলো একটি আদর্শের মডেল। তাঁদের নীতি নৈতিকতা আদর্শ ছিলো অবশ্যই অনুকরণের উপযোগী। আর এখন তার বিপরীত চরিত্র দেখছে সমাজ। অথচ শিশু থেকে সর্বোচ্চ বিদ্যালয় পর্য্ন্ত ব্যাপকভাবে সিলেবাসের আধিক্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। ছাত্র সমাজ সিলেবাস এবং আনুষাঙ্গিক অসংখ্য বইয়ের বোঝায় সোজা হতে পারছে না। কাধ এবং কোমর ব্যাথা হয়ে যাচ্ছে। অসংখ্য প্রকারের বই এবং গাইডে বাজার সয়লাভ। তাদের এজেন্টদের মাধ্যমে বিদ্যালয় ও শিক্ষক সমাজকে নানা প্রলোভন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তাদের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের টার্গেট করা হয়। এভাবে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে অভিভাবকদের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য করা হয়।
নানা সূত্র মতে, এর অর্থ শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সবগুলো সেক্টরেই বন্ঠন করা হয়। উদ্দেশ্য একটাই এ জাতিকে আদর্শিক এবং বাস্তব শিক্ষায় তারা যেনো এগিয়ে যেতে না পারে। বিনিময়ে কতিপয় মানুষ মোটা অঙ্কের টাকা পেয়ে গেল। এভাবে আজকের শিক্ষা সেক্টরগুলো পরিচালিত হচ্ছে। ব্যাঙের ছাতার মতো অনুমোদনবিহীন চাকচিক্য নাম দিয়ে প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। একেবারে প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব প্রতিষ্ঠান দেখা গেলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন নাক কান বন্ধ করে রাখছে। সঠিক কী কারণে তাদের বিরোদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না সেটাও আমাদের জানা নেই। শিক্ষার মতো একটা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরকে কীভাবে এতো অব্যবস্থাপনার মধ্যে চালিয়ে দিচ্ছে সেটাই এখন ভাববার বড় বিষয়। এভাবে যদি কোচিং ও গাইড মাধ্যম শিক্ষার বিস্তার হতে থাকে তাহলে এ জাতির শেষ ভবিষৎ কোথায় গিয়ে ঠেকবে সেটায় সচেতন মহলের আশংকা। ব্যাঙের ছাতার মতো অনুমোদনবিহীন শিক্ষা সিলেবাস বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। গাইড এবং কোচিং বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে রাষ্ট্রকে। সিলেবাস অবশ্যই সহনীয় প্রয়োজনীয় ভাবে নির্ধারণ করতে হবে। অতিরিক্ত বইয়ের বোঝা শিক্ষার্থীদের থেকে কমাতে হবে। বেসরকারি অনিবন্ধিত কেজী স্কুলগুলোর বই সিলেবাস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
নামের জন্য দেখানোর জন্য বিশাল আকৃতির বইয়ের তালিকা সংকোচন করতে হবে। আগামী নতুন বছরে শিক্ষার্থীদের উপযোগী সিলেবাস প্রণয়ন করে অতিরিক্ত বইয়ের চাপ কমাতে হবে। কোচিং বাণিজ্যের বিরোদ্ধে রাষ্ট্রকে আরো কঠোর হতে হবে। গাইড বইয়ের মাধ্যমে যারা শিক্ষার প্রতিভাকে ধ্বংস করছে অবশ্যই তাদের বিরোদ্ধে শিক্ষা নীতিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। গাইড বেচা বিক্রি প্রস্তুত সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। তবেই শিক্ষার্থীদের প্রতিভা বিকাশ এবং নৈতিকতার পরিবর্তন আশা করা যায়।