শিক্ষায় আলোর পথ দেখাচ্ছে জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী ট্রাস্ট

আবদুল হালিম আল মাসুদ

6

দারিদ্র্যতার সাথে যাদের বসবাস, অভিভাবকহীন হয়ে জীবনমান গঠনে যারা অসহায়, অনাকাঙ্খিত বিপদ এসে যাদের ব্যবসা বাণিজ্যে ধ্বস, প্রতিবন্ধি হয়ে সমাজের অভিশাপ শব্দটি যারা লালন করছে, মেধা থাকা স্বত্বেও অর্থের অভাবে শিক্ষার সুযোগ থেকে যারা বঞ্চিত হচ্ছে, কিশোর থেকে বয়স বাড়ছে অথচ কোন কর্মই তাদের জীবন গঠনে সহযোগীতা পাচ্ছে না, কন্যাদায় গ্রস্থ পরিবারের বিষাদময় দুর্বিসহ যাদের জীবন, চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহে হিমসিম যাদের মন-মানসিকতা, তেমনি অসহায় জন-সমাজের মানবিক দায়িত্ব নিয়ে ২০০৩ থেকে শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী (ক.) ট্রাস্ট পরিচালিত দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্প তহবিলের মাধ্যমে দুস্থ জনগোষ্ঠীদের জীবিকায়ন সমৃদ্ধ করতে বিশেষ উদ্দ্যেগে এ পর্যন্ত সারাদেশে ২০৯জনকে ব্যবসায় পুঁজি, ১৭৭জনকে আর্থিক সহায়তা, ২৯জনকে ঋণ পরিশোধে সহায়তা, ৩২জনকে অটো রিকশা,২৫ জনকে বিদেশ গমনে সহায়তা, ১৩জনকে মৎস্য খামার, ১৩জনকে সিএনজি চালিত ট্যাক্সি ক্রয়ে সহায়তা, ৩জনকে কম্পিউটার, ৩জনকে ইটভাঙার মেশিন, ৫৩জনকে গবাধি পশুর খামার, ৩৯জনকে কলের লাঙ্গল, ১০জনকে হাঁস মুরগীর খামার, ৪জনকে সেঁচ পাম্প, ১জনকে মাছ ধরার জাল-নৌকা ক্রয় সহায়তা, ৯৫জনকে শিক্ষায়, ৩৭৪জনকে বিবাহ সহায়তা, ৩০৫জনকে গৃহনির্মাণে, ১৭৩জনকে চিকিৎসা সহায়তা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে ১৩টি সেলাই প্রশিক্ষণ স্থাপন সহ মোট ১৫৭১ জনকে ৩,৯৭,৪৪,৯৩০ টাকা প্রদান করা হয়েছে।
গত কয়েক বছর ধরে বৃহত্তর মানবতার কল্যাণমুখী প্রতিষ্ঠান শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী (ক.) ট্রাস্ট পরিচালিত দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্পের কার্যক্রম লক্ষ্য করছি। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারী ও যুব সমাজকে উদ্ভুদ্ধ করে স্বনির্ভরতার পথ দেখাচ্ছে এ ট্রাস্ট। প্রতিদিনই কিছু না কিছু যুক্ত হচ্ছে সেখানে। মানবতার সেবায় আচ্ছাদিত হচ্ছে চারপাশ, চারদিক। যুক্ত হচ্ছে নানামুখি পরিকল্পনা। ত্যাগ আর স্বপ্নের ভিতর দিয়ে সেই প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিচ্ছে একদল স্বপ্নচারী মানুষ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দিনদিন এর পরিসর বেড়েছে অনেকখানী। বাণিজ্যিক কোন সম্পর্ক নেই। সেবাই যেন তার মূল লক্ষ্য। স্বপ্নচারী কর্মিরা কাজ করছেন নিজের মতো করে হৃদয়ের টানে। যখন যেখানে সাহায্য-সহযোগীতা প্রয়োজন তা ঢালছেন ‘মানবতাকামী’ এ প্রতিষ্ঠানের উঠান থেকে। এখানে সুযোগ-সুবিধা নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারেন- বিভিন্ন বয়সী মানুষ। এর মধ্যে যারা সারাদিন মাটি আর কোদালের সঙ্গে থাকেন, কালি, কলম ও বইয়ের সাথে থাকেন, রোগ-শোকে আক্রান্ত হয়ে শারিরীক অক্ষমতায় অসহায় মানুষ গুলো দিক পরিবর্তনের উপায় খুঁেজ থাকেন, কন্যাদায় গ্রস্থ সংসারে হাসফাঁস করতে থাকেন, চোখে না দেখে জন্মান্ধ হয়ে সমাজে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেন, গ্রামীণ অসহায় নারী ও হতাশাগ্রস্থ যুবকরা যেন এক বন্ধনের ভালবাসায় সিক্ত হয়ে সহযোগীতার পাঠশালা হিসেবে অন্যরকম আশ্রয়স্থল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এ ট্রাস্টের কার্যক্রমকে।
আবুল মনচুর শুক্কুর ঃ হাটহাজারীর দক্ষিণ মাদার্শার মৃত আমিনুল হকের ছেলে মো. আবুল মনচুর শুক্কুর। তিন ভাই দু’বোন, মা, নিজের স্ত্রী ও এক কন্যা সন্তানের পরিবারে ভরণপোষন সামলাতে ক’মাস আগেও ভাড়ায় সিএনজি চালিয়ে সংসার খরচ, ডাক্তার খরচ নিয়ে খুব বেকায়দায় ছিল। ধার-দেনা বাড়তে থাকে। সবসময় মনে অশান্তি লেগেই থাকতো। এমতাবস্থায় দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্প হতে সহায়তা পেল একটি সিএনজি চালিত ট্যাক্সি। সে এ প্রতিবেদকে বলে, আগে পরিশ্রম বেশী হতো, আয় কম ছিল। এখন ট্যাক্সির মালিকানা থাকাতে আয় বেশী, শ্রম কম। সন্তানের লেখাপড়া, বৃদ্ধা মায়ের দেখাশুনা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের দেখ-ভাল করার জন্য আমাকে আর পিছনে তাকাতে হচ্ছেনা।
মোহাম্মদ শওকত ঃ কথা হয় সহায়তাভোগী পশ্চিম গোমদন্ডীর শওকতের সাথে। তিনি বলেন- পরিবারে বাবা নেই। দুই ভাই তিন বোনের সংসার। বড় ভাই দুরারোগ্য ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত। সে কারণে দুই পরিবারকে দেখতে হয়। এতে বুঝা যায় বর্তমান পরিস্থিতিতে আমার কি অবস্থা হতে পারে! স্থানীয় গাউসিয়া হকভান্ডারী ইসলামিক ইন্স্টিটিউটে (দাখিল মাদ্রাসা) সহকারী শিক্ষক হিসেবে মাসের শেষে যা আসে তা দিয়ে কিছুই হয় না। দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্প হতে ৫০ হাজার টাকা অনুদান দিয়ে একটি পোল্ট্রি ফার্মে অংশিদার হলে মাসিক বাড়তি কিছু টাকা আয় হয় এবং এতে পারিবারিক অনেক চাহিদা মেটে। ভাইয়ের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ঔষধ প্রত্র ক্রয় করতে পারি।
সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনঃ গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অবদান চিরন্তন। যাযাবর জীবনের অবসানে কৃষি সভ্যতার গোড়াপত্তনেও নারীর অবদান সর্বজন স্বীকৃত। আমরা বাংলাদেশি নারীকে ঘরের লক্ষী বলে জানি। বাস্তবে নারী দূরদর্শী ও অধ্যবসায়ী; আদর্শ সমাজ গঠনে অগ্রদূত। এ দেশে গ্রামীণ মহিলারা পুরুষের কর্মক্ষেত্রের নিত্য অনুষঙ্গী। পশুপালন থেকে শুরু করে চাষাবাদ এবং দ্রব্যের বাজারজাতকরণ সর্বত্রই নারীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগদান গ্রামীণ জনজীবনে ওতপ্রোতোভাবে জড়িয়ে রয়েছে। এক কথায় গ্রামীণ অর্থনীতি নির্ভর দেশীয় অর্থনীতিতে এবং সমাজ জীবনে নারীর অবদান ও ভূমিকা অপরিসীম। শাহানশাহ্ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী (ক.) ট্রাস্ট পারচালিত দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্পের উদ্যোগে গ্রামীণ নারীদের উন্নয়নে চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জ জেলায় ১৩টি সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এতে প্রতি মাসে দুই শতাধিক মহিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে মানব শক্তিতে রূপান্তর হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড এর ভাইস প্রেসিডেন্ট ও বন্দরটিলা শাখার ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ইসকান্দর আলম বলেন, শাহানশাহ্ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী (ক.) ট্রাস্ট পারচালিত দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্পের মাধ্যমে দূরদর্শী চিন্তা- চেতনার সঠিক বাস্তবায়ন ; মূলত কর্ম পদ্ধতির সামাজিক অসাম্যতা ও দারিদ্র্য বিমোচনে তাদের দক্ষ নেতৃত্ব অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার। প্রকল্পটি নিঃসন্দেহাতীতভাবে এ মহৎ কাজটি করে যাচ্ছে। এ তহবিলের মাধ্যমে সমাজে পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোর আর্থিক সক্ষমতা আননয়নে সুনির্দিষ্ট কর্মতৎপরতা চোখে পড়ার মতো।