শিক্ষার বাহন মাতৃভাষা ও কলম

ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

13

ইসলামে অত্যাবশ্যকীয় বিদ্যাশিক্ষা ও পড়ালেখার ক্ষেত্রে মাতৃভাষার চর্চা, দক্ষতা, প্রাঞ্জলতা ও বিশুদ্ধতা অর্জন করা একান্ত প্রয়োজন। যুগে যুগে মুসলিম মনীষীরা মাতৃভাষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন। এমনকি ইসলামের প্রচারক নবী-রাসুলগণও তাঁদের অনুসারীদের ধর্মীয় শিক্ষা দিতে গিয়ে মাতৃভাষার বিশুদ্ধতা অর্জনকে প্রাধান্য ও মর্যাদা দিয়েছেন। মানবজাতি যেসব ভাষায় শিক্ষার মাধ্যম ব্যবহার করে জ্ঞানার্জন করে থাকে, পড়া হচ্ছে এর অন্যতম। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে যে ভাষায় পড়ার ঐশী নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা ছিল তাঁর মাতৃভাষা।
মাতৃভাষা চর্চার ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন আদর্শের মূর্ত প্রতীক। আরবের কুরাইশ গোত্রের সম্ভ্রান্ত লোকদের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী শৈশবে হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিবি হালিমার তত্ত্বাবধানে বিশুদ্ধ ভাষাভাষী বনু সাদ গোত্রে প্রতিপালিত হওয়ার সুবাদে বিশুদ্ধ আরবি ভাষা শিখেছিলেন। তাই নবীজি তাঁর মাতৃভাষা আরবি বিশুদ্ধভাবে বলতেন। তিনি নিজ মাতৃভাষায় বিশুদ্ধতা অর্জনের ফলে গর্ববোধ করে বলেছিলেন, ‘আমি আরবদের মাঝে সর্বাধিক বিশুদ্ধ ভাষাভাষী। উপরন্তু আমি কুরাইশ বংশের লোক।’
ইসলামের দৃষ্টিতে বিদ্যার্জনের দ্বিতীয় মাধ্যম হচ্ছে শোনা। শিক্ষা অর্জনের জন্য প্রথমে অন্যের কাছ থেকে শুনতে হয়। প্রত্যেক মানবশিশু সর্বপ্রথম তার মায়ের কাছ থেকে শুনে শুনে মাতৃভাষায় জ্ঞান লাভ করে। নবী করিম (সা.)-কে যে ভাষায় ঐশী বাণী শোনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা ছিল তাঁর মাতৃভাষা। পবিত্র কোরআনে মাতৃভাষা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণের দিকনির্দেশনা প্রদান করে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘সুতরাং যখন আমি তা (নাজিলকৃত বাণী) পাঠ করি, তখন তুমি সেই পাঠের অনুসরণ করো।’ (সূরা আল-কিয়ামা, আয়াত-১৮) অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যখন কোরআন পাঠ করা হয়, তখন তোমরা মনোযোগসহকারে তা শুনবে এবং নিশ্চুপ হয়ে থাকবে।’ (সূরা আল-আরাফ, আয়াত-২০৪)।
ইসলামে শিক্ষার বাহনরূপে মাতৃভাষা, বই-খাতা ও কলম নির্ধারণ করা হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে কলমের লেখনী মানবজাতিকে অন্যান্য সৃষ্টজীব থেকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য প্রদান করে, এমনকি কলম ব্যবহারের অক্ষম ব্যক্তি থেকে কলম ব্যবহারকারীর মানমর্যাদা অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
মানুষ কলমের দ্বারা মাতৃভাষায় প্রয়োজনীয় জ্ঞানের কথাবার্তা লিখে রাখে এবং নিজেদের অভীষ্ট কাজে ব্যবহার করে। লিখনপদ্ধতি প্রকৃতপক্ষে এক প্রকার বিদ্যা, যা মানুষের একটি বিশেষ গুণ। বিদ্যার্জনে লিখনসামগ্রী হিসেবে কলম আল্লাহ তাআলার একটি বড় নিয়ামত। কলম না থাকলে কোনো ধর্ম প্রতিষ্ঠিত থাকত না এবং পার্থিব শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের কাজকর্ম সঠিকভাবে পরিচালিত হতো না। আল্লাহ তাআলা যার মঙ্গল ইচ্ছা করেন, তিনি তাকে ধর্মের জ্ঞান দান করেন এবং সত্য-সুন্দর পথ দেখিয়ে দেন। ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.) বলেছেন, ‘সুন্দর হস্তাক্ষর সত্যকে স্বচ্ছ করে তোলে। এটা আল্লাহর এক বড় কৃপা যে তিনি তাঁর বান্দাদের (মাতৃভাষায়) অজ্ঞাত বিষয়সমূহের জ্ঞানদান করেছেন এবং তাদের মূর্খতার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোর দিকে বের করে এনেছেন।’
আল্লাহ তাআলা মানুষকে জাগতিক ও বৈষয়িক বিভিন্ন প্রয়োজনীয় বিষয় মাতৃভাষায় কাগজ বা খাতায় লিখে রাখার জোরালো তাগিদ দিয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক লেনদেনের কাজে লিখিত দলিল-প্রমাণ সংরক্ষণকে অত্যাবশ্যক করে দিয়ে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা যখন একে অন্যের সাথে নির্ধারিত সময়ের জন্য ঋণের কারবার করো, তখন তা লিখে রেখো; তোমাদের মধ্যে কোনো লেখক যেন ন্যায্যভাবে লিখে দেয়।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত-২৮২) এ দিকনির্দেশনা যদি ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সমাজজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবে যথার্থভাবে প্রয়োগ করা যায়, যেমন-বিচারকাজ, দেশ পরিচালনা, শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা তথা বিদ্যা-বুদ্ধিকে পুঁজি করে বা কলমকে হাতিয়ার করে যারা নিজের জীবিকা অর্জন ও অন্যের কল্যাণমূলক শিক্ষায় নিয়োজিত, তারা যদি কারও পক্ষপাতিত্ব বা হীনস্বার্থ হাসিলের জন্য মাতৃভাষা ব্যবহার না করে; বরং প্রকৃত সত্য লিপিবদ্ধ করার কাজে ব্যবহার করে, তাহলে সামাজিক অনাচার, অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা বলে কিছুই থাকতে পারে না।
আরবি ভাষা পবিত্র কোরআনের শিক্ষার বাহন হওয়ার ফলে ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকে মুসলমানরা ধর্মগ্রন্থের পঠন-পাঠনের দিকে গভীরভাবে আত্মনিয়োগ করে এবং সুন্দর হস্তাক্ষরে আল-কোরআনের লিখন ও সংরক্ষণ সৎকর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। রাসূলে করিম (সা.) সুন্দর হস্তাক্ষরের বিকাশ সাধনে তাঁর অনুসারীদের বিদ্যাশিক্ষায় উৎসাহিত করে বাণী প্রদান করেছেন, ‘ওই ব্যক্তি বেশি উপার্জন করতে পারে, যার হস্তাক্ষর সুন্দর।’ এমনিভাবে ইসলামে শিক্ষাক্ষেত্রে সুন্দর হস্তলিখনের জন্য শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা হয়েছে। ইসলামের ইতিহাসে মুসলিম শাসকগণ সুন্দর হস্তলিখন শিল্পীদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাও প্রদান করেছেন।
মানবজাতি লিখনসামগ্রী ‘কলম’ নামক জড়বস্তুকে যেমন ইচ্ছা তেমনভাবে ব্যবহার করলেও সৃষ্টিকর্তা মহৎ উদ্দেশ্য সাধনে এ বস্তুটিকে সৃষ্টি করেছেন। যে শিক্ষিত ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি কলমের অতুলনীয় ক্ষমতা যথাযথ প্রয়োগে সফলকাম হন, তিনি শিক্ষাক্ষেত্রে যথার্থ সম্মানিত ও মর্যাদাবান লেখক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। কেননা কলমকে স্বয়ং আল্লাহ স্বীয় কাজেকর্মে এবং অমিয় বাণীতে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেছেন। সমাজে যাঁরা শিক্ষার বাহন এ মহান বস্তুটিকে অবলম্বন করে মাতৃভাষায় মসিযুদ্ধ চালিয়ে জ্ঞানের জগতে টিকে আছেন, তা আয়-উপার্জন বা পরিচিতি লাভ যেকোনো ক্ষেত্রেই হোক না কেন, তাঁদের এর সার্থক ব্যবহারে অত্যন্ত সৎ, ন্যায়নিষ্ঠ ও আত্মসচেতন থাকা একান্ত আবশ্যক।
ইসলামের দৃষ্টিতে জ্ঞানী ব্যক্তি শহীদের চেয়ে অধিক মর্যাদাশীল। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘জ্ঞানী ব্যক্তির কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়ে উত্তম।’ পৃথিবীতে যত জ্ঞানী-গুণী, পন্ডিত-লেখক, কবি-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী স্ব স্ব সৃজনশীলতায় জ্ঞান-বিজ্ঞানে মেধা-মননশীলতার স্বাক্ষর রেখে চিরস্মরণীয় ও বরণীয় হয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেককেই বিশুদ্ধ মাতৃভাষার আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়েছে এবং শিক্ষার সামগ্রী কলম দ্বারা লেখনীর দ্বারস্থ হতে হয়েছে। এ জন্য একজন প্রকৃত শিক্ষিত লেখক মানুষ একজন অশিক্ষিতের তুলনায় বেশি অনুগত, আর মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে আত্মসমর্পণ, আল্লাহর আনুগত্য প্রকাশই তো ইসলামের মূল প্রতিপাদ্য শিক্ষার বিষয়। অতএব, সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে ‘মাতৃভাষা’ ও ‘কলম’ ব্যবহারে ব্যবহারকারীর যথেষ্ট সতর্ক থাকা অবশ্যকর্তব্য এবং ঈমানী দায়িত্ব।