শিক্ষার গুণগত মান

প্রফেসর মো. আবু নসর

9

শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নয়ন ছাড়া কোনো দেশ ও জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি করতে গেলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। দেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত। অভাব শুধু গুণগত বা মানসম্মত শিক্ষার। শিক্ষার মান বাড়বে শিক্ষকদের গুণে। শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে শিক্ষকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। শিক্ষা সম্প্রসারণ ও জ্ঞান বিতরণের ক্ষেত্রে একজন শিক্ষক শিক্ষা ও সভ্যতার অধিকতর অগ্রগণ্য অভিভাবক। শিক্ষকেরা জাতির বিবেক। একজন শিক্ষকই একটি জাতিকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারেন। একজন শিক্ষকের সুষ্ঠু পাঠদানের মূল্য অর্থ দিয়ে পরিশোধ করা যায় না। শিক্ষকতা একটি মহান ও মর্যাদাশীল পেশা। শিক্ষকেরা সমাজ ও জাতি গঠন এবং শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে অগ্রণী ও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে থাকেন। শিক্ষার্থীদের নৈতিক আদর্শ গঠনে শিক্ষকদের তুলনা হয় না। শিক্ষাই পারে মানুষের জীবন বদলে দিতে। সুশিক্ষা ছাড়া কোনো জাতির উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। গতানুগতিক শিক্ষার পরিবর্তে কর্মমুখী ও ব্যবহার উপযোগী শিক্ষা দিতে শিক্ষকদের উদ্যোগী হতে হবে। শিক্ষাকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা না গেলে তা সম্ভব হয় না। তথ্য প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে আধুনিক বাংলাদেশের নির্মাতা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের আধুনিক পদ্ধতিতে নিয়মিত ও যথাযথ পাঠদান ও শিক্ষাদানের সক্ষমতা, কৌশল ও নৈপুণ্যের ওপর নির্ভর করবে শিক্ষার গুণগত মান ও মানসম্মত শিক্ষা। যেকোনো দেশকে উন্নয়নের পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য মানসম্মত শিক্ষার বিকল্প নেই। শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করণে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের নিয়মিত, সুষ্ঠু, উন্নত ও পদ্ধতিগত পাঠদান প্রণিধানযোগ্য। শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত আধুনিক সফল, যথাযথ ও নিয়মিত পাঠদান এবং শিক্ষাদান শিক্ষার্থীদের জন্য বড় পাওনা, বড় প্রাপ্তি আর শিক্ষকদের বড় সন্তুষ্টি, বড় সাফল্য, বড় কৃতিত্ব। শ্রেণি কক্ষে শিক্ষকদের নিয়মিত, সঠিক ও যথাযথ পাঠদান না করা শিক্ষার্থীদের জন্য বড় বঞ্চনা ও বড় ঘাটতি। আর শিক্ষকদের জন্য বড় ব্যর্থতা। তাই শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের আপন সৃষ্টিতে আপ্লুত হয়ে যথানিয়মে কৌশলগত ও উন্নত পাঠদানের মাধ্যমে শিক্ষার গুণগত মান অক্ষুণœ রাখা দরকার। পৃথিবীতে যে জাতি যত বেশি সুশিক্ষিত সেই জাতি গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকাই তত বেশি পরিলক্ষিত। যেসব দেশে শিক্ষকদের মান যত বেশি উন্নত, সেসব দেশে শিক্ষার মানও তত বেশি উন্নত। শিক্ষকতা কেবল একটি চাকরি নয়,্ একটি সম্মানজনক ও অভিজাত পেশাও বটে।
শিক্ষকতা অন্যান্য পেশার রোল মডেল। একজন শিক্ষক মানুষ, সমাজ ও জাতি গড়ার কারিগর। সুস্থ দেশ গড়ার জন্য চাই একজন শিক্ষক। উল্লেখ্য, শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা প্রশাসন, যোগ্য শিক্ষকমন্ডলী ও কারিকুলামের ওপর নির্ভর করে মানসম্মত শিক্ষা অর্জন সম্ভব। শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব ও বুদ্ধিমত্তার সাথে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্তসহ মানসম্মত পাঠদানের অভিনবত্ব সৃষ্টির মাধ্যমেই নিশ্চত হবে শিক্ষার গুণগত মান। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের পাঠদানের ক্ষেত্রে তাদের সদিচ্ছা, ইচ্ছাশক্তি ও আন্তরিকতাই যথেষ্ট। শিক্ষার গুণগত মান যদি বৃদ্ধি না পায় তবে তা হবে শিক্ষার মানোন্নয়নের মর্সিয়া। একজন শিক্ষকের জীবনাদর্শ হবে দেশ, জাতি ও সমাজের জন্য আলোকবর্তিকাস্বরূপ। শিক্ষকদের স্বশাসিত হতে হবে। তাড়িত হতে হবে বিবেক দ্বারা। শিক্ষার্থীদের আত্মোপলব্ধির প্রয়োজনে চমৎকার উদ্ভাবনী ক্ষমতা থাকবে শিক্ষকদের।
অনন্য সৌন্দর্যমন্ডিত সুরম্য অট্টালিকাবিশিষ্ট ভৌত অবকাঠামো থাকতে হবে না। প্রতিষ্ঠানে প্রচুর শিক্ষক ও শিক্ষার্থী থাকলেও হবে না। আবার পরীক্ষার পাশের হার সর্বাধিক বা শতভাগ পাস হলেও চলবে না। শিক্ষার গুণগত মান বা মানসম্মত শিক্ষা ভিন্ন বিষয়। সম্মানিত শিক্ষকদের দক্ষতা ও যোগ্যতার সাথে হৃদয়গ্রাহী পাঠদানের ও উপস্থাপনা কৌশলের ওপরই নির্ভর করে শিক্ষার্থীদের কার্যকর উপলব্ধি ও অর্জন। এ ক্ষেত্রে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের অদ্ভুত, অপূর্ব সুন্দর, উপযুক্ত, চমৎকার বাচনভঙ্গী ও উপস্থাপনা শিক্ষার্থীদের কাম্য। উল্লেখ্য, প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত, শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টিতে অভিভাবকদের সচেতনতা, ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং শিক্ষক, অভিভাবক ও সমাজের বিশিষ্ট নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বিশেষ ফলদায়ক হবে। এতে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে। শিক্ষকদের আবিষ্কার করতে হবে শিক্ষার্থীদের সাফল্যের গোপন সূত্র, তাদের সক্ষমতা, তাদের জ্ঞানের গভীরতা, যা তাদের অন্তরাত্মায় সংরক্ষিত। একজন শিক্ষক যদি প্রকাশমান হন তবেই তিনি প্রকাশিত। মহান পেশার মর্যাদা রক্ষা করার দায়িত্ব শিক্ষকদেরই।
শিক্ষার গুণগত মান অর্জনের মাধ্যমে কৃতিত্ব দিয়ে শিক্ষার্থীদের যাত্রা শুরু করতে হবে। মনে রাখতে হবে জীবনের সাফল্য শুধু একটা পরীক্ষাতেই নির্ধারিত হয় না। এসএসসি ও এইচএসসিতে প্রচুর জিপিএ-৫ বা অ+ পায় কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান ও মেধা ধরে রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় বা কৃতিত্ব অক্ষুন্ন রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় অনেকে পরবর্তীতে উচ্চপর্যায়ের উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে হারিয়ে যায়। মেধাবী শিক্ষার্থীদের মেধার খোঁজ থাকে না। মেধার অপচয় বড় ট্র্যাজেডি। অথচ মেধাই হচ্ছে জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য থাকবে শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশ ঘটানো। দুঃখের বিষয় মেধা বিকাশের প্লাটফরম আজ বড়ই দুর্দিনের মধ্যে। আজকের দিনে মেধার সন্ধান শিক্ষকও করেন না। শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও মেধার বিকাশ ঘটানো শিক্ষকদের কর্তব্য। মেধার লালন না করার কারণে মেধার উন্মেষও ঘটছে না।
অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা আজ উচ্চ নম্বর ও উচ্চ গ্রেডের সন্ধানে বেরিয়েছেন। বাড়ি থেকে বেরিয়ে দৃষ্টি বাড়ালেই দেখা যায় রাস্তার মোড়ে মোড়ে বাহারি ও আকর্ষণীয় নামে প্রাইভেট ও কোচিং সেন্টার শিক্ষা বাণিজ্যের পসরা সাজিয়ে বসে আছে। প্রাইভেট ও কোচিং ভাইরাস মানসম্মত শিক্ষার অন্তরায়। বিশিষ্টজনের মতে শিক্ষা এখন উচ্চ মূল্যের পণ্য। শিক্ষা আজ বাণিজ্যনির্ভর। শিক্ষা এখন ব্যবসায়ের উপকরণ। প্রাইভেট ও কোচিংয়ের নামে শিক্ষা বাণিজ্য ব্যাহত করছে শিক্ষার গুণগত মানকে। কম শিখে বেশি নম্বর পাওয়ার মন্ত্র কোচিং সেন্টারে শেখানো হচ্ছে; যা শিক্ষার্থীদের খুব ক্ষতি করছে। কোচিংয়ের অপপ্রয়োগের ফলে ক্ষতি বেশি হচ্ছে। বর্তমান প্রাইভেট ও কোচিং বাণিজ্য জমজমাট। গরিব শিক্ষার্থীরা বিপাকে। শিক্ষার্থীদের ডাকে ঘুম ভাঙে প্রাইভেট শিক্ষকদের। প্রাইভেট ও কোচিং সেন্টারের সংখ্যা মাইকিং, পোস্টারিং, প্ল্যাকার্ড ও ব্যানারের মাধ্যমে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে। কোচিং বাণিজ্যে অসহায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা। শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত ও সুষ্ঠু পাঠদানের পরিবর্তে অনেক শিক্ষক প্রাইভেট কোচিং ফাঁদ পেতে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। অথচ শ্রেণিকক্ষই হবে শিক্ষকদের যথানিয়মে সুষ্ঠু ও উন্নত পাঠদানের নিমিত্তে প্রাইভেট ও কোচিং সেন্টার। শ্রেণিকক্ষেই শিক্ষকদের নিয়মিত, সফল, আধুনিক আন্তরিকতার সাথে উন্নত পাঠদানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলেই বাড়তি ও আলাদা প্রাইভেট পড়া ও কোচিং করার দরকার হয় না।
বর্তমানে দেশে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এর নিদর্শন ও প্রমাণ রাখতে সক্ষম হচ্ছে। সেসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের অন্যত্র প্রাইভেট পড়া ও কোচিং করার প্রয়োজন হয় না বলে কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্য ঘোষণার মাধ্যমে সৎ সাহসের স্বাক্ষর রাখছে। প্রাইভেট পড়া হোক আর কোচিং করা হোক সুষ্ঠু পাঠদানের জন্য শ্রেণিকক্ষই যথেষ্ট। অর্থাৎ শ্রেণিকক্ষই হবে সব। শুধু শিক্ষকদের সদিচ্ছা, আন্তরিকতা ও ইচ্ছাশক্তির নিশ্চিত করা দরকার। তাই কোচিং সেন্টার নয়, শ্রেণি কক্ষই হোক শিক্ষাদানের প্রাণকেন্দ্র। প্রাইভেট ও কোচিং বন্ধে বর্তমান সরকারের প্রণীত কঠোর নীতিমালা প্রশংসার দাবিদার। এখন বাস্তবায়নের প্রয়োজন। প্রাইভেট ও কোচিংয়ের নামে শিক্ষা বাণিজ্যকে সম্যকভাবে নিরুৎসাহিত করার জন্য অভিভাবক ও সুধী সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। কোচিং ও প্রাইভেটের নামে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার মান।