শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের সুখ-দুঃখ

দমুহাম্মদ নাজমুল হাসান

799

দেশের স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে সদ্য পাস করা শিক্ষার্থীরা যখন আদালত পাড়ায় পা রাখেন তখন তাদের চোখে-মুখে থাকে তৃপ্তির হাসি, যেন সব জয় করতে চলেছেন। হাজার স্বপ্ন বুকে ধারণ করে একজন সিনিয়র আইনজীবীর সাথে কাজ শুরু করেন। দিন যায় মাস যায় তাদের সদস্য বুনা স্বপ্নটা রূপ নেয় হতাশায়। আইনজীবী ভবন, এনেক্স ওয়ান, এনেক্স টু, সদ্য তৈরি হওয়া শাপলা আর দোয়ের ভবনের কক্ষে কক্ষে বন্দি থাকতে থাকতে যেন তাদের স্বপ্নগুলো দিন দিন ফিকে হয়ে যায়।
আদালত পাড়ার উঁচু উঁচু দালানের বিচার কক্ষগুলোতে ‘মহামান্য আদালত’ বলে বিজ্ঞ আইনজীবীদের কথা বলার পেছনে শিক্ষানবীশ আইনজীদেরও অবদান আছে, তার স্বীকৃতিও মেলেনা অনেক সময়।
সকাল থেকে সন্ধ্যা আবার সিনিয়রের রাতের চেম্বারেও নিজের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে ক্লান্ত শরীর নিয়ে যখন বাসায় ফেরা হয় তখন সাদা জামার বুক পকেটে যে অর্থ ঢুকে তা খুবই স্বল্প! কেউ কেউ সেই স্বল্প অর্থও পান না, কারণ একটাই এরা যে শিক্ষানবীশ!
শিক্ষানবীশ আইনজীবী নিয়ে এমন চিত্র খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগের শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক সাঈদ আহসান খালিদ এর একটি লেখায় ‘আমরা যারা সনদপ্রাপ্ত এডভোকেট তারা জানি- শিক্ষানবিশ আইনজীবী তথা লাইসেন্সবিহীন আইনজীবীর দুর্দশার সাথে রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’ গল্পের ফটিক চরিত্রের দুর্দশার কতো মিল! গাউনওয়ালা, লাইসেন্সধারী বেশিরভাগ আইনজীবীদের কাছে এই তোমরা জুনিয়র/শিক্ষানবিশ/ ইন্টার্নরা বড়ই অপাংক্তেয়, অবহেলিত।
প্রতিথযশা সিনিয়র হায়ারিং-এডভোকেটদের ব্যাপক ইনকাম হলেও তাদের জুনিয়র আইনজীবীর কোন লাভ নেই, কারণ নিজেদের ‘চেম্বার ওয়ার্কস’ নাই- ফলে ‘নো ইনকাম’, ‘ডু কান্না’। তোমাদের বিষাদ, তোমাদের অন্তরের অন্দরের কষ্ট সিনিয়র আইনজীবীদের ¯পর্শ করে না। আইনজীবীদের নিজেদের দাবি-অধিকার আদায়ে বাংলাদেশে জেলা ভিত্তিক বার এসোসিয়েশন আছে, নানান ঘরানার সমন্বয়ে কিংবা সমমনাদের নিয়ে আইনজীবী সংগঠন আছে; ডাক্তারদের ইন্টার্ন এসোসিয়েশন আছে, কিন্তু শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের জন্য কোথাও কেউ নেই ’।
দীর্ঘ ৪ বছর ধরে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক পাঠাগার সম্পাদক এডভোকেট ফজলুল বারীর জুনিয়র হিসেবে চট্টগ্রাম আদালতে শিক্ষানবীশ আইনজীবী হিসেবে কাজ করছেন ফরহাদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘কাজ শেখানোর ক্ষেত্রে আমার সিনিয়র অনেক আন্তরিক। আমি এই শিক্ষানবীশী জীবন উপভোগ করছি। কাজ শিখে গেলে জুনিয়রেরও অনেক মূল্য আছে আদালত পাড়ায়’।
সিনিয়রের নাম উল্লেখ না করলেও তোফায়েল আহমেদ নামে একজন শিক্ষানবিশ আইনজীবী বলছেন ভিন্ন কথা ‘সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চেম্বার আর কোর্টে ঘাম ঝরানো পরিশ্রম করলেও সিনিয়রকে খুশি করানো অনেক কঠিন। সর্বস্ব উজাড় করে দিলেও তিনি খুশি হতে চান না।’
প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা হিমেল বড়–য়া নামে একজন শিক্ষানবীশ আইনজীবী বলেন, আমি দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম আদালতে সিনিয়রের সাথে কাজ করছি। অন্যদের চেয়ে আমি বেশ ভালোই আছি।
দীর্ঘ ১২ বছর চট্টগ্রাম আদালতে একজন সিনিয়র আইনজীবীর সাথে কাজ করেন আরিফ হোসেন নামে একজন শিক্ষানবীশ আইনজীবী। তিনি অনেক কথার মাঝে মূল বাস্তবতা তুলে ধরেন এভাবে ‘আসলে শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের কোন দাম নেই। সারাদিন খাটনি করেও সিনিয়রের মন পাওয়া যায় না। চেম্বারের প্রায় সব কাজ জুনিয়রদের দিয়ে করিয়েও একটু ভুলে চরম অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি থেকে জানা যায়, বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলায় বারে ২৭১৯ জন শিক্ষানবীশ আইনজীবী রয়েছে। আইনজীবী সমিতি থেকে শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের জন্য আইডি কার্ড ও টাই প্রদান করা হয়ে থাকে। কোর্ট চলাকালীন সময়ে তারা (শিক্ষানবীশ আইনজীবী) টাই পড়তে হয় এবং আইডি কার্ড সাথে রাখতে হয়।
গত ৪ এপ্রিল নতুন শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের কর্মশালা ও পরিচয়পত্র বিতরণ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বার কাউন্সিলের সদ্য সাবেক সদস্য মো. ইব্রাহীম হোসেন চৌধুরী বাবুল শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের উদ্দেশ্য করে বলেন ‘আমরা সবাই পেছনে আমাদের মা, বাবা ভাই বোন, সবাইকে রেখে এসেছি। যারা আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে কখন আমার সন্তান আইনজীবী হয়ে ঘরে ফিরবে! কিন্তু এটি খুবই দুঃখজনক যে বার কাউন্সিলের ধীরগতির কারণে এডভোকেটশিপ পরীক্ষা দুই থেকে তিন বছর পর পর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে একজন শিক্ষানবিশ তার স্বপ্নের এডভোকেটশিপ পাচ্ছেন না। কেন একজন আইন পাস করা ছাত্রকে লাল টাই পড়ে চার/পাঁচ বছর শিক্ষানবীশ হয়ে থাকতে হবে? আর কেনই বা একজন শিক্ষানবীশ এমসিকিউ পাশ করে রিটেনে ফেইল করলেও পুনরায় এমসিকিউ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে? তিনি আরো বলেন বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে আমি শিক্ষানবীশদের এই দুঃখ গুলি মোছনের সর্বোচ্ছ চেষ্টা করছি।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী বলেন, শিক্ষানবীশ আইনজীবীরা আমাদের পরিবারের অংশ। আমরা তাদের জন্য বেশ কিছু কাজ করে থাকি। আমরা শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকি। তাদের আইডি কার্ড প্রদান, টাইও প্রদান করে থাকি। কোন শিক্ষানবীশ আইনজীবী যদি আমাদের কাছে যে কোন অভিযোগ প্রদান করে আমরা সেটা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখি। চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতিতে সিনিয়র এবং শিক্ষানবিশ আইনজীবীর মধ্যে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ স¤পর্ক বরাবরই বজায় রয়েছে। আমরা এই পারস্পরিক স¤পর্ককে আরো বেশি জোরদারে সদা তৎপর আছি। বিজ্ঞ আইনজীবীদের সাথে শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের স¤পর্ক মধূর করার ক্ষেত্রে নবীনদের ভ‚মিকা রাখতে হবে। সিনিয়রদের সম্মান, বার’র আইন কানুন মেনে চলা, সততার সঠিকভাবে কাজ করার মাধ্যমে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির পাঠাগার স¤পাদক নুরুল করিম এরফান বলেন, শিক্ষানবীশ আইনজীবীরা আমাদের অঙ্গ। মহামান্য আদালতে মামলা পরিচালনা করার ক্ষেত্রে নিত্য কাজ কর্মে একজন শিক্ষানবীশ আইনজীবীর ভ‚মিকা অনেক। চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির বিজ্ঞ আইনজীবীরা সব সময় শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের সাথে ভালো আচরণ করে থাকেন। আমার চেম্বারেও দু’জন শিক্ষানবিশ আইনজীবী আছেন, আমি নিজে যা খাই তাদের তাই খেতে দিই। সাধ্যমতো তাদের সম্মানী দেওয়ারও চেষ্টা করি’।
শিক্ষানবিশ আইনজীবীর পরিচয় :
একজন শিক্ষার্থী দেশের স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে ডিগ্রী নেওয়ার পর শিক্ষার্থীরা বার কাউন্সিলের অধীনে এডভোকেটশিপ এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ‘এডভোকেট’ হতে হয়। কিন্তু এলএলবি ডিগ্রি পাওয়া মাত্রই স্বীকৃত আইনজীবী হওয়ার সুযোগ থাকেনা। প্রথমে আদালতে একজন বিজ্ঞ আইনজীবীর অধীনে ছয় মাস শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে কাজ করার পর এডভোকেটশিপ পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সুযোগ হয়।
এলএলবি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হওয়ার পর নিজ প্রতিষ্ঠান হতে প্রাপ্ত সার্টিফিকেটসহ বার কাউন্সিলের নির্দিষ্ট ফরমে শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে কাজ করার অনুমতি চেয়ে আবেদন করতে হয়।
একজন বিজ্ঞ আইনজীবী যাঁর ১০ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা আছে এমন একজন এবং শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীর মধ্যে এই মর্মে একটি চুক্তি স¤পাদন করতে হয়, যা বার কাউন্সিলে করা আবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হয়।
শিক্ষানবিশ আইনজীবীর পোশাক পরিচ্ছদ : এক সময় শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের আলাদা কোন পোশাক ছিল না। অন্যান্য আইনজীবীদের মতোই তারা কালো প্যান্ট, সাদা শার্ট আর কালো টাই পারতো। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ দেখি বাংলাদেশ বার কাউন্সিল বাংলাদেশের প্রতিটি আইনজীবী সমিতিগুলোতে একটি চিঠি ইস্যু করে। চিঠিতে শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের কালো রং ছাড়া যে কোন রং যেমন ‘এ্যাশ’ অথবা ‘খয়েরী’ রংয়ের টাই পরে কোর্টে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এছাড়াও ‘শিক্ষানবিশ আইনজীবী’ লেখা আইডি কার্ড রাখার বিষয়ে বাধ্যবাধ%