শিক্ষাক্রম, শিখন ফল ও পাঠ্যসূচি

সৈয়দ মাহবুব হাসান আমিরী

21

(গত সংখ্যার পর)
শিক্ষাক্রম তত্ত¡ ও মডেল এর ধারণা :
শিক্ষাক্রম হল শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক রূপরেখা। শিক্ষাক্রম শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে কিছু মতোভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, “Curriculum” শব্দটি ল্যাটিন শব্দ “Currere” থেকে উদ্ভুত হয়েছে। “Currere” শব্দটি প্রাচীন রোমে ব্যবহৃত হত যার অর্থ “Course of Studz”, আবার কারো কারো মতে, “Curriculum” শব্দটির উদ্ভব ল্যাটিন শব্দ “ঈঁৎৎবৎ” থেকে যার অর্থ “ঘোড়া দৌঁড়ের পথ” আভিধানিক অর্থে “Curriculum” হল “নির্দিষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার জন্য একটি কোর্স বা “A course to be run for reaching certain goal
Curriculum theory is a set of related statements that gives meaning to the (school) curriculum by pointing up the relationship among its elements and by directing its development, its use, and its evolution. (Beaucham-১৯৬১)
শিক্ষাক্রম মডেল ক্রম :
শিক্ষাক্রমের বিভিন্ন উপাদান ও এদের ক্রমবিন্যাস সম্পর্কে শিক্ষাক্রম বিশেষজ্ঞগণ একমত পোষণ করেন। শিক্ষাক্রম বিশেষজ্ঞগণের ঐক্যমতের ভিত্তিতে শিক্ষাক্রম বিকাশের মডেল ক্রম উদ্ভাব করেন। শিক্ষাক্রম মডেল ক্রমের চিত্রে দুইটি চরম প্রানত্মবিন্দু নির্দেশ করে। শিক্ষাক্রম মডেল ক্রমে অধিকাংশ বিখ্যাত শিক্ষাক্রম মডেলকে তিনটি বৃহত্তর শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়। এই শ্রেণিবিভাগ হল-
(১) যৌক্তিক/ উদ্দেশ্য ভিত্তিক মডেল
(২) বৃত্তাকার মডেল এবং
(৩) প্রগতিশীল/মিথস্ক্রিয়া মডেল।
যৌক্তিক বা উদ্দেশ্য ভিত্তিক মডেল হল ধারাবাহিক কিন্তু অনমনীয়। অপরদিকে প্রগতিশীল বা মিথস্ক্রিয়া মডেল শিক্ষাক্রম প্রক্রিয়ার একটি নমনীয় ও পরিমার্জনযোগ্য। নিচে শিক্ষাক্রম মডেল ক্রম- এর ধারার প্রবাহ উপস্থাপন করা হল :
যৌক্তিক/উদ্দেশ্য ভিত্তিক মডেল বৃত্তাকার মডেল এবং প্রগতিশীল/ মিথস্ক্রিয়া মডেল।
ক্স টাইলার
ক্স হুইলার
ক্স ওয়াকার
ক্স তারা
ক্স নিকলস
ক্স স্কিলব্যাক
যৌক্তিক/ উদ্দেশ্য ভিত্তিক মডেল
ক) টাইলার তত্ত¡ : রাফ টাইলার ১৯৪৯ সালে সর্বপ্রথ শিক্ষাক্রম উন্নয়ন প্রক্রিয়ার তত্ত¡ প্রদান করেন। রাফ টাইলারের তত্ত¡টি চারধাপ বিশিষ্ট। তিনি চারটি প্রশ্নের মাধ্যমে শিক্ষাক্রম উন্নয়ন কার্যক্রম বিবৃত করা চেষ্টা করেছেন। টাইলারের চারটি প্রশ্ন শিক্ষাক্রমের সংজ্ঞায় উপস্থাপন করা হয়েছে।
টাইলারের তত্ত¡টিকে নিম্নরূপে উপস্থাপন করা হলো :
লক্ষ ও উদ্দেশ্য বিষয়বস্তু শিখন অভিজ্ঞতা সংগঠন ও বিন্যাস মূল্যায়ন
তিনি শিক্ষার্থী ও তার জীবন, সমজ ব্যবস্থা, সমাজের দর্শন, মনোবিজ্ঞান, বিষয় ইত্যাদিকে উদ্দেশ্যমূলখ উৎস হিসেবে নির্ধারণ করেন।
খ) হিলডা তাবা তত্ত¡ : হিলডা তাবা ১৯৬২ সালে শিক্ষাক্রম প্রণয়ন সম্পর্কে একটি বিশদ তত্ত¡ প্রদান করেন। এই শিক্ষাক্রম তত্তে¡র বিভিন্ন উপাদানগুলোর অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত এবং পর্যায়ক্রমে বিন্যস্ত। এটির প্রতিটি উপাদান চিন্তা প্রসূত ও ক্রমবিন্যঅস রীতিতে সাজানো। একারনে এই তত্ত¡কে শিক্ষাক্রম প্রণয়নের একটি প্রগতিশীল মডেল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হিলডা তাবার তত্ত¡টিকেও সাত ধাপ বিশিষ্ট তত্ত¡ হিসেবে গণ্য করা হয়। এ সাতটি ধাপ হলো :
১. প্রয়োজনীয়তা নিরূপণ : শিক্ষাক্রম প্রণয়ন কিংবা পরিমার্জনে প্ররম্ভিক কাজ হল বর্তমান চাহিদার প্রেক্ষাপটে প্রচলিত শিক্ষাক্রম কতটুকু পূরণ করতে পারছে তা যুক্তি সিদ্ধ পর্যবেক্ষণ ও লক্ষ্যদলের চাহিদা জরিপ করে প্রয়োজনীয়তার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নিরূপন করতে হয়।
২. উদ্দেশ্য নিরূপণ : যুক্তিসিদ্ধ পর্যবেক্ষণ, জরিপ এবং নিকট ও দূরবর্তী ভবিশ্যৎ অন্তদর্শন ও বর্তমান গতিধারার আলোকে সামগ্রিক অবস্থা প্রত্যক্ষণ পূর্বক শিক্ষার উদ্দেশ্য নিরূপন করতে হয়।
৩. বিষয়বস্তু নির্বাচন : নিরূপিত উদ্দেশ্যের প্রধান বাহন হল বিষয়বস্তু, উদ্দেশ্য অর্জন সহায়ক, পাঠদান যোগ্য বিষয়বস্তু বিশেষভাবে প্রণীত নির্ণায়কের ভিত্তিতে নির্বাচন করতে হয়।
৪. বিষয়বস্তু সংগঠন : নির্বাচিত বিষয়বস্তুসমূহকে গৃঞীত নীতি পদ্ধতির ভিত্তিতে সংগঠন করতে হয়। এরূপ সংগঠন প্রক্রিয়া / নীতি হতে পারে-
ক. জানা থেকে অজানা
খ. সহজ থেকে জটিল
গ. সমগ্র থেকে অংশ
ঘ. থিমেটিক এ্যাপ্রোচ
ঙ. সমন্বিত প্রক্রিয়া
৫. শিখন অভিজ্ঞতা নির্বাচন : নির্বাচিত ও বিন্যাসকৃত বিষয়বস্তু কোনটির মাধ্যমে কোন ধরনের শিখন অভিজ্ঞতা প্রদান করা হবে তা সনাক্তকরণ।
৬. শিখন অভিজ্ঞতা বিন্যাস : শনাক্তকৃত অভিজ্ঞতা সমূহকে একটি গ্রাহ্যনীতি অনুসরণে বিন্যাসকরণ এবং শিখন সামগ্রী রচনায় ও উপস্থাপনে তা অনুসরণের প্রচেষ্টা অভ্যাহত রাখা।
৭. মূল্যায়ণ : একদিকে প্রণীত শিখণসামগ্রী উপরের ধাপসমূহ অনুসরণে প্রণীত হয়েছে কিনা তা মূল্যায়ন করে দেখা হয়। অপরদিকে যে লক্ষ্যদলের জন্য শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করা হয়েছে তাদের উপরে প্রয়োগ করে উপযোগিতা যাচাই করে দেশব্যাপী ব্যবহারের পদক্ষেপ নিতে হয়।
যৌক্তিক মডেল : টাইলার ও তাবা
যৌক্তিক মডেলের প্রবক্তা হল টাইলার ও তাবা। এই মডেল উদ্দেশ্য, বিষয়বস্ত, পদ্ধ এবং সমাপ্তিতে মূল্যায়ন এই ক্রমে উপাদানগুলো বিন্যস্ত করা হয়। উপরে প্রত্যেকটি মডেলের সংক্ষিপ্ত পরিচিত বর্ণনা করা হল। নিচে যৌক্তিক মডেলের সুবিধা ও দুর্বলতা সংক্ষেপে উপস্থিাপিত হলো :
যৌক্তিক মডেলের সুবিধা
ক্স যৌক্তিক মেডেল রৈখিক এবং উপাদানগুলো ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
ক্স যৌক্তিক মডেলে শিক্ষাক্রম প্রণয়নের নির্যাস হল ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা ভিক্তিক।
ক্স যৌক্তিক মডেল বর্ণিত ক্রমে শিক্ষাক্রমের উদ্দেশ্য, বিষয়বস্ত, শিখন-শেখানো।
ক্স এই মডেলে উদ্দেশ্যকে ভিত্তি করে অন্যান্য প্রয়োজনীয় ধাপগুলো নির্ধারণ করা হয়।
ক্স এই মডেলে শিক্ষাক্রমে জনগণের সমকালের চাহিদা, বিদ্যালয়ের বাইরের জনগণের জীবনধারণ ইত্যাদির যোক্তিক সমন্বয় ঘটে থাকে।
ক্স যৌক্তি মডেলের মাধ্যমে প্রণীত শিক্ষাক্রমে জনগণের সামগ্রিক চিন্তা চেতনার বহিঃপ্রকাশ, বাস্তব রূপ লাভ করে সামগ্রিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা সম্ভব হয়।
যৌক্তিক মডেলের দুর্বলতা
ক্স যৌক্তিক/উদ্দেশ্যভিত্তিক মডেলের প্রধান দুর্বলতা হল শিক্ষাক্রম প্রণয়ন কালে শিখন-শেখানো কার্যবলি সম্পর্কে
চিন্তা ভাবনা করা হয় না।
ক্স শিক্ষাক্রম উন্নয়ন প্রক্রিয়া অনুশীলন ও পর্যবেক্ষণ পরিলক্ষিত হয় যে শিক্ষকগণ ধারাবাহিক ও যৌক্তিক কৌশল অনুসরণ করে না।
ক্স যৌক্তিক মডেলের শিখন ফল নিরূপণে অতিরিক্ত গুরুত্ব প্রদানের দরুন কারেজর সমস্যা সৃষ্টি হয় বিধায় সময় বেশি লাগে।
ক্স উদ্দেশ্য নিরূপণে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হওয়ার ফলে অন্যান্য উপাদান সুষ্ঠুভাবে প্রণয়নের সময় পাওয়া যায় না।
ক্স যৌক্তিক মডেলকে প্রায়শ সমালোচনা করা হয় কারণ এই মডেলের প্রবক্তাগণ উদ্দেশ্যের উৎস সম্পর্কে পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা প্রদান করেন নি।
বৃত্তাকার মডেল :
বৃত্তাকার মডেলটি শিক্ষাক্রম মডেল ক্রমে দুই প্রান্তের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করে। মূলতঃ বৃত্তাকার মডেলটি যৌক্তিক মডেলের একটি সমপ্রসারিত রূপ; কারণ এই মডেল যৌক্তিক ও ধারাবাহিক কৌশলে প্রণীত। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হল বৃত্তাকার মডেল: শিক্ষাক্রম উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় ধারাবাহিক পরিবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষাক্রমকে যুগের চাহিদা পূরণে সমর্থ করে সচল/গতিশীল করে তোলা। অর্থাৎ বৃত্তাকার মডেল যুক্তিযুক্তভাবে প্রয়োজনীয় দিক সংযোজন করে শিক্ষাক্রমকে সচল রাখে। ১৯৭০ সালে শিক্ষাক্রম প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় নতুন উপাদান সংযোজন করে বৃত্তাকার মডেলের উদ্ভাবন করা হয়।
পরিশেষে বলা যায় যে, বৃত্তাকার মডেল অনেকটা ক্রটিমুক্ত এবং শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয়তা মোটামুটিভাবে পুরণ করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে এবং তা অব্যাহত রয়েছে।
বহু বৃত্তাকার মডেলের মধ্যে নিম্নে দুইটি মডেল উপস্থাপন করা হল-কারণ গত দুইদশক ধরে এদের প্রভাব সকল ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হচ্ছে। এছাড়া শিক্ষক শিক্ষবিদগণ এটিকে ভাল বলে মনে করেন। নিম্নে শিক্ষাক্রমের যে দুইটি যে দুইটি বৃত্তাকার মডেল সম্পর্কে আলোকপাত করা হবে সেগুলো হল: (ক) হুইলার বৃত্তাকার মডেল এবং (খ) নিকলস এন্ড নিকলস মডেল।
(….চলবে)

ক. হুইলার তত্ত¡ :
হুইলার মডেলটি পাঁচ ধাপ বিশিষ্ট একটিবৃত্তাকার মডেল। এই মডেলটি মূলত টাইলার মডেলের সংস্করণ। হুইলার ১৯৬৭ সালে এই বৃত্তাকার মডেলটি প্রদান করেন। নিম্নে হুইলার মডেল উপস্থাপন করা হলো :
হুইলার মডেলের ধাপসমূহ হল :
ক্স প্রথম ধাপে শিক্ষার ও শিক্ষাক্রমের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিরূপণ করতে হয়।
ক্স দ্বিতীয় ধাপে শিখন অভিজ্ঞতাসমূহ নির্বাচন করতে হয়।
ক্স তৃতীয় ধাপে বিষয়বস্ত শনাক্ত/নির্বাচন করতে হয়।
ক্স চতুর্থ ধাপে শিখন অভিজ্ঞতা ও বিষয়বস্ত একটি নীতি অনুসনণে বিন্যস্ত করতে হয়।
ক্স পঞ্চম ধাপে সামগ্রিক চক্রটি মূল্যায়ন করে দেখা হয় প্রতিটি ধাপ সঠিকভাবে প্রণীত হয়েছে কি না। যদি কোনরূপ ক্রটি ধরা পড়ে তবে পুনরায় সমগ্র চক্রটি সম্পন্ন করতে হয়।
তুলনামূলক আলোচনা :
১. হুইলার মডেল চক্রাকার আর টাইলার মডেল রৈখিক এবং এর উন্নয়ন প্রক্রিয়ার আরম্ভ ও শেষ আছে।
২. হুইলার সর্বপ্রথম শিক্ষাক্রম উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে ধারাবাহিকরূপ দান করেন।
৩. হিলডা তাবা, কার, লটনের শিক্ষাক্রম মডেল অপেক্ষা অধিকতর আধুনি তত্ত¡।
৪. বিষয়বস্ত, শিখন অভিজ্ঞতা শনাক্তকরণ ও বিন্যাস সম্পর্কে শিক্ষাক্রমতত্ত¡বিদগণের মধ্যে মতভেদ দেখা যায়।
খ. নিকলস মডেল :
এডরে এবং হাওয়ার্ড নিকলস ১৯৭৮ সালে শিক্ষাক্রম উন্নয়নের জন্য এই মডেল উদ্ভাবন করেন। নিকলস মডেলটিও বৃত্তাকার মডেল। হুইলার মডেলও বৃত্তাকার মডেল কিন্তু নিকলস মডেলে বাস্তব অবস্থা বিশ্লেষণ উপাদানটি সংযোজিত হয়েছে। নিকলস মডেল যৌক্তিক কৌশল অবলম্বন করে শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করা হয়। অঐ ঘরপযড়ষষং, টাইলার, তাবা ও হুইলারের কার্যকে পুন: সংজ্ঞয়িত করেছেন। এখানে শিক্ষাক্রম প্রণয়ন পদ্ধতি এবং বাস্তব নিকলস মডেলটি পাঁচটি উপাদান বিশিষ্ট একটি বৃত্তাকার মডেল:
বাস্তব অবস্থা বিশ্লেষণ শিক্ষাক্রম রচনাকারীর সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে থাকে কারণ এগুলো শিক্ষার্থীর নিজ পরিবেশ থেকে সদ্য সংগৃহীত হয়েছে। বৃত্তাকার মডেলের প্রবক্তা তার পূর্ববর্তী শিক্ষাক্রম বিশেষজ্ঞগণের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
….. চলবে