শিক্ষক সংকট ও এনটিআরসিএ সমাচার

অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী

9

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে বলতে গেলে ৯৯% শিক্ষা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে থাকে। অথচ শিক্ষক সংকটে এসব প্রতিষ্ঠানের এখন মরি মরি অবস্থা। জানিনে শিক্ষক নিয়োগ কর্তৃপক্ষ এনটিআরসিএ এ কয় বছরে কী কাজটুকু করেছে? এক দুদজন করে নিয়োগ দিলে ও এতো দিনে অনেক লোকের কর্ম সংস্থান হয়ে যেতো। তেমনি বেসরকারি স্কুল , কলেজ ও মাদরাসাগুলোকে শিক্ষক সংকটের ধকল সইতে হতো না।
দেশে এখন এমন কোন প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া যাবে না , যেখানে কমপক্ষে দুদ তিন জন শিক্ষকের পদ খালি নেই। এ অবস্থায় লেখাপড়ার মান ধরে রাখা দুরের কথা স্বাভাবিক গতি নিয়ে চলাটা ও কঠিন হয়ে পড়েছে। এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলে নিশ্চয় তা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করে চলেছেন। এ কয় বছরে দেশে শিক্ষার্থী কয়েক গুণ বেড়েছে। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে যে প্রতিষ্ঠানে মাত্র দুদ তিন শদ শিক্ষার্থী ছিল সে জায়গায় এখন হাজারের ওপর। সরকারের বিনে মূল্যে বই ও উপবৃত্তি দেবার কারণে এমন হয়েছে। কিন্তু, এর সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জনবল কাঠামো বাড়ানো হয়নি। উপরন্তু , কমিটির হাত থেকে নিয়োগ এনটিআরসিএ’র হাতে যাবার পর এখন মারাত্মক শিক্ষক সংকটে ধুকছে এসব প্রতিষ্ঠান। এনটিআরসিএ ক্ষমতা পাবার পর গত কদবছরে একবার মাত্র সারা দেশে হাতে গোনা কয়েকজন নিয়োগ দিয়েছিল। এরপর আর কোন খবর নেই।
এরা বোধ হয় লেজে গোবরে অবস্থায় কোথাও আটকা পড়ে আছে। নাকি ইচ্ছে করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মেরে ফেলার জন্যে কেউ এদের পিছু টেনে ধরে রেখেছে? ভাল কথা , সব স্কুল-কলেজ একত্রে জাতীয়করণ করে নিলে তো এমনিতে বে-সরকারি সব প্রতিষ্ঠান মরে যায়। তাই এভাবে না মেরে ওভাবে মেরে ফেলাই তো উত্তম। ওভাবে না মেরে এভাবে মারলে আমাদের জাতিটাই একদিন মরে যাবে।
হালচাল দেখে মনে হয় সরকার স্কুল কলেজে শিক্ষক নিয়োগ দেবার চেয়ে দালান বিল্ডিং নির্মাণে বেশী মনোযোগি। দালান বিল্ডিংয়ে কী হবে? এক সময় তো দালান বিল্ডিং ছিল না। কাঁচা ঘরেই পাকা লেখা পড়া হয়েছে। এখন পাকা দালান ঘরে লেখাপড়া কাঁচা হয়ে গেছে। পাকা দালান বিল্ডিংয়ের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করিনে। তাই বলে ঘরে খাবার দাবার না থাকলে পাকা ঘর দিয়ে কী হবে? ড্রাইভারের মরি মরি অবস্থা। গাড়ি যত চকচকে হউক না কেন দুর্ঘটনার আশংকা তো থেকেই যায়।
এমনিতেই দক্ষ ও মানসম্মত শিক্ষকের অভাবে আমাদের শিক্ষার মান একেবারে তলানিতে। গোটা দেশে মেধাবী ও অভিজ্ঞ শিক্ষকের চরম হাহাকার। ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও আইসিটিদর মতো বিষয় পড়াবার মত শিক্ষক নেই বললে চলে। একেবারে নগণ্য। শিক্ষক প্রশিক্ষণের নামে বছরে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়। বিদেশে গিয়ে ও অনেকে ট্রেনিং গ্রহণ করেন। তাতে কাজের কাজ কতটুকু হয় জানিনে। দালান বিল্ডিং নির্মাণ ও ট্রেনিংয়ে আলাদা অন্য আরো কার লাভ আছে বলে মনে হয়। না হলে এ দুদটো বিষয়ে এত বেশী গুরুত্ব দেবার মানে কী? টাকা পয়সা হরিলুট করা যায়। এ ভাবে দেশে বিদেশে ট্রেনিংয়ের নামে আর নতুন নতুন ভবন নির্মাণের ওছিলায় কত হাজার কোটি টাকা বছরে গচ্ছা যায় সে আল­াহ মালিক ছাড়া কেউ জানার কথা নয়। অবকাঠামোর উন্নয়ন যেমন দরকার তেমনি পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্যে প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। এ কথা অস্বীকার করিনে। স্কুল-কলেজে শিক্ষক চালিকা শক্তি। ড্রাইভিং ফোর্স। শিক্ষক না থাকলে কিংবা আধ মরা শিক্ষক দিয়ে দেশ কিংবা জাতি কোনটাই বাঁচানো যায় না।
জুন-জুলাই আর নভেম্বর-ডিসেম্বর এলে ট্রেনিংয়ের হুড়মুড়ি পড়ে যায়। সারা বছর ট্রেনিংয়ের খবর নেই। ট্রেনিং বাবত ঋণের কোটি কোটি টাকা যাতে ফেরত না যায় , সেজন্যে অর্থ বছর শেষ হবার মুহুর্তে টাকা মারার ধান্ধায় তাড়াহুড়ো পড়ে যায়। স্কুল -কলেজ খালি করে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান থেকে ৫/৭ জন করে জেলা সদরে নিয়ে ট্রেনিং সিডিউল শেষ করার তৎপরতা তখন খুব চোখে পড়ে। স্কুল-কলেজে দালান-বিল্ডিং নির্মাণ ও বিদেশে শিক্ষক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে কোন নীতিমালা অনুসরণ করা হয় কে জানে? এমপি-মন্ত্রি ও রাজনৈতিক নেতার সুবাদে যেখানে সেখানে দুদতলা তিন তলা বিল্ডিং বরাদ্দ হয়ে যায়। শিক্ষকতা পেশায় নতুন ও অনভিজ্ঞ লোকেরা মামার জোরে বিদেশে ট্রেনিং পেয়ে যায়। যোগ্য স্কুল-কলেজ যেমন ভবন পায় না তেমনি উপযুক্ত শিক্ষক বিদেশে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেবার সুযোগ পান না। শিক্ষায় এরকম স্বজন প্রীতি ও দুর্নীতি একদম কাম্য নয়।
একটা সময় স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীর আকাল ছিল। নতুন জুনিয়র স্কুল, হাই স্কুল কিংবা কলেজ প্রতিষ্ঠিত হবার পর বেশ কদবছর শিক্ষার্থী সংকট লেগেই থাকতো। পরিদর্শনের জন্য ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষ যেদিন আসতেন সেদিন আশপাশের প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থী ধার করে ধরে এনে দেখানো হতো। সে এখন বাসি হয়েছে। আজকাল স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠিত হতে না হতে শিক্ষার্থীতে ভরে যায়। এটি নিঃসন্দেহে আমাদের শিক্ষায় বিরাট এক ইতিবাচক দিক। কিন্তু, শিক্ষক সংকট ও স্বল্পতার কারণে এর কোন সুফল ঘরে তুলা যাচ্ছে না।
শিক্ষার্থী অনুপাতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক না থাকায় প্রায় সব স্কুল-কলেজে পার্ট টাইম শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে।
পার্ট টাইম শিক্ষকদের বেতন দিতে গিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠানকে হিমশিম খেতে হয়। আবার পার্ট টাইম শিক্ষকদের সরকারি কোন প্রশিক্ষণ নেবার সুযোগ থাকে না। ফলে পাঠদান কৌশল সম্পর্কে তারা ততটা দক্ষ হতে পারেন না। তাদের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা যেমন কম থাকে তেমনি নিয়মিত শিক্ষকের মতো তাদের ওপর ততটা নির্ভর করা যায় না।
এ কদবছরে স্কুল-কলেজে বিষয় সংখ্যা বেড়েছে। চারু ও কারুকলা, জীবন ও কর্মমুখী শিক্ষা , শারিরীক শিক্ষা , ক্যারিয়ার শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়গুলো তো আমাদের সময় ছিল না। আইসিটি অতীব গুরুত্বপুর্ণ ও সময়োপযোগি একটি বিষয়। দেশে কয়েক হাজার স্কুল ও কলেজে এ বিষয়ের পর্যন্ত কোন শিক্ষক নেই। পুর্বোক্ত অন্যান্য বিষয়গুলোর তো কোন শিক্ষকই নেই। তাহলে কেবল শুধু শুধু পরীক্ষা ও বিষয় বাড়িয়ে লাভ কী? এনটিআরসিএ শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা নেবার জন্যে গঠিত হয়েছিল। যেভাবে হউক এরা বেশ কতেকগুলো পরীক্ষা নিতে পেরেছে। এখন বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসায় এরা শিক্ষক নিয়োগদানকারী কর্তৃপক্ষ।
এ কাজে তাদের মন্থর গতি সকলকে হতাশ করেছে। প্রয়োজনে এনটিআরসিএ-কে সংস্কার করা দরকার। ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়া আবশ্যক। নিয়োগের জন্যে তাদের সুপারিশ নয়, সরাসরি নিয়োগের ক্ষমতা দিতে হবে। আমরা এটিকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেখতে চাই। দেশে হাজার হাজার নিবন্ধনধারী শিক্ষত বেকার মানুষ পড়ে আছেন। তাদের শিক্ষকতা পেশায় নিয়োগ দিয়ে শুন্য পদগুলো শীঘ্রই পূরণ করার ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে ওঠেছে।