শিক্ষক অবমাননা হৃদয়ে রক্তক্ষরণ

দিলীপ কুমার বড়ুয়া

95

সভ্যতার উন্মেষে শিক্ষা অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোয় বিনির্মাণ করে সত্য-সুন্দর আগামী। শিক্ষাই সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। মানব শিশুর শিক্ষাজীবন শুরু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার আনুষ্ঠানিকতার শেষ পর্যন্ত শিক্ষক পরম মমতায় শিক্ষার আলো তার অন্তর জগতে প্রবেশ করিয়ে অন্ধকার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পথ দেখান। পিতা-মাতার মতোই চরিত্র ও সুকুমারবৃত্তির বিকাশে সহায়তা করেন। শিক্ষার্থী যখন দেশ, জাতি ও সমাজের সর্বোচ্চ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করে থাকেন সেসব ক্ষেত্রেও শিক্ষকের অবদান ঔজ্জ্বল্য ছড়ায়। শিক্ষক শুধু প্রকৃত শিক্ষা দিয়ে শিক্ষার্থীদের আলোর পথে ধাবিত করেন না, সমৃদ্ধও করেন। সমাজকে দেখান প্রগতির পথ। যে কারণে শিক্ষক সব দেশে, সব সমাজে শ্রদ্ধাশীল, সম্মানীয়। তাঁদের ত্যাগ, আন্তরিকতা, অভিভাবকত্ব একমাত্র পিতা-মাতার সঙ্গেই তুলনীয়। শিক্ষক শব্দটার মধ্যে অমিত শক্তি ও মর্যাদা জড়িয়ে আছে। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে এ পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা সম্মান ও মর্যাদায় অভিষিক্ত হন। মার্কিন পন্ডিত বব বেয়াউপ্রেজ মনে করেন- শিক্ষা হল একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, একজন অনুপ্রাণিত ছাত্র এবং একজন উদ্যমী অভিভাবকের মিলিত প্রতিশ্রুতির সমন্বয়।
দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছেন, শিক্ষক সমাজ হচ্ছেন প্রকৃতই সমাজ ও সভ্যতার বিবেক। শিক্ষা থেকে অর্জিত জ্ঞান আমাদের মন ও জীবনকে আলোকিত করে। শিক্ষা মানুষকে মূর্খতার অন্ধকার থেকে আলোর দিকে পথনির্দেশ করে। তাই শিক্ষকদের বলা হয় সমাজ নির্মাণের স্থপতি। সমাজের সার্বিক অগ্রগমনের ক্ষেত্রে শিক্ষা ও শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক তাঁর নিজের অর্জিত শিক্ষা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দিয়ে গড়ে তোলেন শিক্ষার্থীদের। এ শিক্ষা দান ও গ্রহণের মধ্য দিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে গড়ে ওঠে এক নিবিড় স¤পর্ক। শিক্ষাকে জাতীয় জীবনে ফলপ্রসূ ও কল্যাণপ্রদ করে তোলার জন্য ছাত্র-শিক্ষকের এ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অপরিহার্য। বলা হয়, বিদ্যাদান ও বিদ্যার্জন এমন একটি মানসিক প্রক্রিয়া, যেখানে ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে এক ধরনের পারম্পরিক বোঝাপড়ার সম্পর্ক ক্রিয়াশীল থাকে এবং এর মধ্য দিয়েই শিক্ষার্থীর বিদ্যার্জন পূর্ণতা লাভ করে। তাই আজকের বাস্তবতায় ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের বিষয়টি আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। শিক্ষা সুষ্ঠু সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এমন এক মৌল উপাদান যেটি যে সমাজে যত বেশি প্রবেশ করেছে সেই সমাজে তত বেশি উন্নয়ন ও কল্যাণ সাধিত হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে শিক্ষক হচ্ছেন একমাত্র পথ-নির্দেশক। কিন্তু সেই শিক্ষক সমাজ নানা কারণে দেশে দেশে যথাযথভাবে তাদের মর্যাদা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে যা মানবজাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জার বিষয়।
সুদূর অতীতকাল থেকেই শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের মধ্যে একটি আশ্চর্য সুন্দর ও অকৃত্রিম সম্পর্কের ঐতিহ্য রয়েছে। এ সম্পর্কটি একই সঙ্গে খুবই সাবলীল, মধুর, স্বতঃস্ফুর্ত আবার গাম্ভীর্যপূর্ণ শ্রদ্ধার। এক সময় আমাদের দেশে শিক্ষার্থীরা শিক্ষককে প্রায় দেবতার মতো শ্রদ্ধা এবং তার আদেশ-উপদেশকে অনেকটা বেদবাক্য জ্ঞানে অনুসরণ করত।
শিক্ষকরাও তখন শিক্ষার্থীদের ভালোবাসতেন আপন সন্তানের মতো। শিক্ষক প্রয়োজনে শিক্ষার্থীর ওপর অভিভাবকসুলভ কঠোরতা ও শাসন আরোপ করতেন। আবার সন্তানের মতো ভালোবেসে কাছে টেনে নিয়ে তাদের পরামর্শ দিতেন, উৎসাহ দিতেন এবং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা ও স্বপ্নের বীজ বুনে দিতেন। শিক্ষার্থীরা সেই স্বপ্নকে লালন করে এগিয়ে যেত। কিন্তু এখন বদলেছে সময় এবং সেই সঙ্গে অনেকটাই বদলে গেছে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কও। পরিবর্তনের এ চিত্র প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত। একটা সময় ছিল, যখন ছাত্ররা নিজের হাতে শিক্ষকের পা ধুয়ে দিত। আজ সেই হাতে তারা শিক্ষককে লাঞ্ছিত করে। এমনকি ছাত্রের হাতে শিক্ষক খুনের ঘটনাও আমাদের দেশে ঘটছে।
একজন শিক্ষক তার ছাত্রের কাছে দার্শনিকের মতো। কারণ জীবন সম্পর্কে যে দর্শনচিন্তা শিক্ষক তার ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেন, তার ভিত্তিতেই তারা তাদের জীবনের ব্রত ঠিক করে। এজন্য পাঠদানের পাশাপাশি তাদের মানসিক বিকাশ ও মানবিক দিকগুলো উদ্দীপ্তকরণ এবং সমাজের প্রতি তাদের দায়িত্ববোধ জাগ্রতকরণে সচেষ্ট থাকতে হবে। একজন শিক্ষক তার কথাবার্তা, চাল-চলন, যুক্তি পূর্ণ বিচার-বিশ্লেষণ ও নৈতিক গুণাবলির দ্বারা এমন একটি আদর্শ স্থাপন করবেন, যা শিক্ষার্থীদের সামনে অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। মহাত্মা গান্ধী বলেছেন- একজন শিক্ষকের জীবন শিক্ষার্থীদের সামনে খোলা বইয়ের মতো।
অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা বই পড়ে যেমন জ্ঞানার্জন করে, তেমনি একজন আদর্শ শিক্ষকের দিকে তাকিয়ে তারা জীবনের জন্য শিক্ষালাভ করতে পারে। শিক্ষকের কাছে একজন শিক্ষার্থীর প্রত্যাশা থাকে- তিনি তাকে জীবনোপযোগী ও যুগোপযোগী শিক্ষা দেবেন। একজন সত্যিকারের শিক্ষক শিক্ষার্থীর এ প্রত্যাশা পূরণে সচেষ্ট থাকেন। শিক্ষক জ্ঞানদাতা বলে শিক্ষার্থীর কাছে শিক্ষকের সব চেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো শিক্ষার্থীরা তার দেয়া শিক্ষায় প্রকৃত অর্থেই শিক্ষিত হবে। তার দেখানো পথে চলবে। ছাত্ররা তাকে সম্মান করবে, শ্রদ্ধা করবে, শিক্ষক হিসেবে তার প্রাপ্য মর্যাদা দেবে। শিক্ষক যেমন ছাত্রের অনেক বড় শুভাকাক্সক্ষী। তেমনি শিক্ষক প্রত্যাশা করেন তার ছাত্ররাও তাকে ভালোবাসবে, তার প্রতি অনুগত থাকবে।
বিপন্ন এ ধরণীর দিকভ্রান্ত মানুষদের অস্বাভাবিক কর্ম প্রক্রিয়া প্রতিনিয়তই উৎপন্ন করছে হিংসা, বিদ্বেষ, আক্রোশ, সন্ত্রাস। শিক্ষাঙ্গন দূষিত করছে কিছু বখে যাওয়া শিক্ষার্থী। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে অভিযুক্ত করা হয়েছিল ছাত্রী নিপীড়নের অভিযোগে। মিডিয়ার বদৌলতে নিত্য নতুন মুখরোচক খবরে বিভ্রান্ত মানুষজন। সেইসঙ্গে অযৌক্তিক অপ্রমাণিত অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষককে তুলোধোনা। বিভিন্ন মাধ্যমে তর্ক বিতর্কের ঝড়। পরবর্তীতে তদন্ত হলো। তদন্তে দেখা গেলো ব্যক্তিগত আক্রোশ হতে প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে ছাত্রীটি শিক্ষকের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ দাখিল করে। অভিযোগটি ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা। পরবর্তীতে কেউ এটি নিয়ে আর একটিও ব্যাক্যালাপ করেনি। তবু সুখের কথা যে, শিক্ষক অবমাননার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা জোর প্রতিবাদ করেছিল।
সম্পতি ফের একই অভিযোগে অভিযুক্ত আরেকজন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্যের অবসরপ্রাপ্ত প্রজ্ঞাবান অধ্যাপক ড. এ বি এম মাসুদ মাহমুদ। যিনি একটি স্বনাম ধন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউএসটিসি র ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বরত। জীবনের চল্লিশটি বছর অত্যন্ত সুনামের সাথে তিনি পড়িয়েছেন অসংখ্য ছাত্র- ছাত্রীদের।
সাহিত্যের রসবোধ দিয়ে গভীর মমতায় লেকচারের মাধ্যমে মোহাবিষ্ট করেছেন শিক্ষার্থীদের। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্যে অধ্যাপনা এবং বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘকাল। এ ছাড়া ও তিনি পিএইচ ডি ও এম ফিল অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সুপারভাইজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি যখন সুচারুরূপে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের একাডেমিক পরিবেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কাজে পদক্ষেপ নিচ্ছেন ঠিক তখনি কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থীরা প্রকাশ্যে অনভিপ্রেত অযৌক্তিক এবং অনাকাংখাকিত ষড়যন্ত্রমূলক অভিযোগে যৌন নিপীড়নকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তাঁর সম্মান হানির অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়।
কতোটা নৈতিক অধঃপতন ঘটেছে এ দেশের শিক্ষার্থীদের! কার প্ররোচনায়, কার ইন্ধনে একজন সম্মানিত শিক্ষকের মান মর্যাদা ধুলায় ভ‚লুণ্ঠিত করার অপপ্রয়াসে গণমাধ্যম , অনলাইন সোশ্যাল মিডিয়া গুলো অযাচিত ভাবে সরব হয়ে উঠেছে ছাত্রী নিপীড়ন অভিযোগটিকে কেন্দ্র করে। সোশ্যাল মিডিয়া গুলো বিষয়টিকে তলিয়ে না দেখে কতিপয় শিক্ষার্থীর অপ্রমাণিত অভিযোগকে প্রাধান্য দিয়ে একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে একপেশে সংবাদ পরিবেশনসহ ইউটিউবে ভিডিও প্রদর্শন গ্লানিকর , দুঃখজনক ও সর্বসাধারণের কাছে বিবেচনার দাবিদার। অধ্যাপক মাসুদ মাহমুদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক অভিযোগ এবং অবান্তর উক্তি ও তার ভিত্তিতে নানা রকমের হেনস্তার যে চালচিত্র তা সত্যিই উদ্বেগজনক। চার দশকের শিক্ষকতা জীবনে যাঁর বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ ও তাঁকে কালিমালিপ্ত করেনি, যিনি সারা জীবন শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধা ভালোবাসায় সম্মানিত হয়েছেন তিনি কি এ দিন দেখার প্রত্যাশায় ছিলেন! একটি কথা আমাদের মনে রাখা দরকার, একটি খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত কাউকে যেমন খুনি বলা যায় না, তেমনি অপ্রমাণিত অভিযোগে কাউকে দোষী বলাও সমীচীন নয়।
বাস্তবিক পক্ষে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো অনেক সময় যেরকম একপেশেভাবে মুখর হয়ে উঠে অভিযুক্ত শিক্ষকের সমালোচনায় যেনো তিনি অপরাধী, অনেকটা বিচার হবার আগেই অভিযুক্ত! অভিযোগের সত্যতা বিচার না করেই অনুচিত আগাম সমালোচনা সুখকর নয়। একজন শিক্ষকের রয়েছে উপযুক্ত সম্মান ও মর্যাদা পাবার অধিকার। কল্পনাপ্রসূত ছাত্রী নিপীড়নের ন্যাক্কারজনক বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে একজন শিক্ষকের মান মর্যাদা সমাজের কাছে হেয় প্রতিপন্ন করা কতটা যৌক্তিক তা সুশীল সমাজের ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। জাতি গঠনের মূল কারিগর শিক্ষক সমাজের এ করুণ দশা জাতিকে লজ্জিত করে। তাদের বঞ্চনা-গঞ্জনা জাতীয় মানবতাবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাদের নীরব আর্তনাদ সামাজিক বিবেক-বোধকে দংশন করে। এ ধরনের অভিযোগের ঘটনা নিয়ে লিখতে গিয়েও আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। অধ্যাপক মাসুদ মাহমুদের এমন সামাজিক সম্মান ক্ষুন্ন হওয়াটাকে তাঁর অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীরা মেনে নিতে পারেনি।
তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরা যে যেখানে আছেন সেখান থেকে প্রতিবাদের দ্রোহে সোশ্যাল মিডিয়ার স্ট্যাটাসে লেখনীর অগ্নিবাণে ঝড় তুলেছেন। তাই এমন শিক্ষক অবমাননার ঘটনা আমরা পুনর্বার দেখতে চাইনা। পিতৃতুল্য শিক্ষকদের লাঞ্ছিত, অপমানিত হতে দেখে আমরা লজ্জিত, আমরা শঙ্কিত! যে শিক্ষার্থীরা আবেগপ্রসূত হয়ে পরজীবীর মতো ইন্ধন দাতাদের সাহচর্যে শিক্ষকের সম্মান হানি করে তাদের শুভবোধের উদয় হোক। নতুবা তারা সমাজে নিন্দিত হবে শিক্ষক অবমাননার দায়ে।