শিক্ষকের সম্মান ও অধিকার

কাজী আবু মোহাম্মদ খালেদ নিজাম

26

মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষক। মা-বাবা জন্ম দেয়ার পর মূলত শিক্ষকের হাতেই গড়ে উঠে সন্তান। ছাত্রকে মানুষ করার জন্য শিক্ষকের চেষ্টার অন্ত থাকে না। একজন শিক্ষক কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর দায়িত্বে অবহেলা করেন না বলেই বিশ্বাস করি। যদিও গুটি কয়েক শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে নানা সময়। কিন্তু তারা বিশাল শিক্ষক সমাজের প্রতিনিধিত্ব করেন না অবশ্যই।
প্রতিবছর ৫ অক্টোবর সারাবিশ্বে ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ পালন করা হয়।এদিন শিক্ষকদের অবদানের কথা তুলে ধরা হয় বিভিন্ন সেমিনার, সেম্পুজিয়ামে। পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেক দেশেই শিক্ষকের সম্মান রয়েছে। রয়েছে তাদের জন্য পর্যাপ্ত সম্মানী, নিরাপত্তা ও আবাসনের সুব্যবস্থা।আমাদের দেশে এখনো পর্যন্ত শিক্ষকগণ সেভাবে কাংখিত সম্মানী ও অন্যান্য সুবিধাদি পান না। আমি মনে করি উপযুক্ত সম্মান ও সম্মানী পাওয়া শিক্ষকদের অধিকার। এক্ষেত্রে বৈষম্য থেকে গেছে।বিভিন্ন সময় এই বৈষম্যসহ নানা দাবি-দাওয়া নিয়ে শিক্ষকগণ রাস্তায়ও নামেন। সরব থাকেন প্রতিবাদ, বিক্ষোভে।সরকারকে শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবিগুলো নিয়ে ভাবার অনুরোধ জানাই। শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবি কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ কখনো অস্বীকার করেননা ঠিকই কিন্তু কার্যকর কোন পদক্ষেপও নেননা। দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে তাতে হাজার, লক্ষ শিক্ষক শিক্ষকতা করে যাচ্ছেন।ছাত্রদের শিক্ষাদান করে যাচ্ছেন। আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন তাদের মানুষ করার জন্য।এরপরও নানা সময় শিক্ষকরা বিব্রতকর অবস্থার মুখোমুখি হন। সম্মুখীন হন নানা প্রতিকূলতার।শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেন সমাজের কিছু দুষ্টু লোক।তবে তারা সংখ্যায় অতি নগণ্য।
মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সেই ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ দেয়ার ঘটনাটি আমরা সবাই জানি। এই সম্পর্কিত একটি কবিতা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাংলা পাঠ্যপুস্তকে রয়েছে। সম্রাট তাঁর পুত্রের শিক্ষককে যেভাবে মর্যাদা দিয়েছিলেন সে ধরণের মর্যাদা কি এখন আছে? বাদশাহপুত্র পায়ে পানি ঢালছে আর এটিকে অপরাধ মনে করেছিলেন শিক্ষক। কিন্তু সম্রাট অবাক করে দিয়ে শিক্ষককে দিলেন সম্মান।বললেন,পুত্র কেন শিক্ষকের পাও হাত দিয়ে ধুয়ে দিল না।
শ্রদ্ধাবোধ কমে আসলেও সমাজে শিক্ষকদের একটি সম্মানজনক স্থান রয়েছে। আগের দিনে মানুষ শিক্ষকদের যথোপযুক্ত সম্মান করতেন।নিজের সন্তানকে মানুষ করতে শিক্ষকের হাতে তাকে (সন্তানকে) তুলে দিতেন।এখনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাধারণ খেটেখাওয়া মানুষ শিক্ষকদের সম্মানের আসনে বসান,ছুটে যান নানা সমস্যায়।সমাজে আলো ছড়িয়ে দিতে শিক্ষকগণ চেষ্টারত আছেন।পর্যাপ্ত সুবিধাদি না পেলেও তাঁরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।থেমে নেই তাঁদের কর্মতৎপরতা।দেশে প্রতিবৎসর পাবলিক পরীক্ষাসমূহের যে আশা জাগানিয়া ফলাফল তার কারিগর কিন্তু এই শিক্ষক সমাজ। তাদের প্রচেষ্টায়ই এই সফলতা। দেশের সকল স্তরে যারা দায়িত্ব পালন করে চলেছেন তারা সবাই কোন না কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের ছাত্র। সে হিসেবে দেশের উন্নয়নের পেছনেও রয়েছে শিক্ষকদের অবদান। শিক্ষকগণ বছর বছর দেশের জন্য তৈরি করছেন মেধাসম্পদ।যে সম্পদ দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে সহায়ক।শিক্ষকদের প্রতি সকলের উপযুক্ত শ্রদ্ধাবোধ থাকা উচিত।এই শ্রদ্ধাবোধের মাত্রা আমাদের সমাজ থেকে দিন দিন উবে যাচ্ছে।প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোলেই দেখা যায় অনেক ছাত্র তার শিক্ষককে যথাযথ সম্মান দেয়না।এমনকি সালামটুকুও দিতে চায়না।যা আমাদের জন্য অবশ্যই চিন্তার বিষয় বৈকি! হ্যাঁ, দেখা যায় বেশ কিছু শিক্ষক তাদের দায়িত্ব পালনে তৎপর থাকেন কম।এ ধরনের মন মানসিকতা অবশ্যই পরিহার করা উচিত। এরপরও আমি বলব দেশের শিক্ষকদের বেশিরভাগই তাদের দায়িত্ব পালনে অটল থাকেন।অব্যাহত রাখেন মানুষ গড়ার প্রচেষ্টা।
শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কমিশন গঠনপূর্বক উপযুক্ত সম্মানীর ব্যবস্থা করা,নানা সুবিধাদি বৃদ্ধি ও যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ করা দরকার।
যথাযথ প্রশিক্ষণ, আবাসন ব্যবস্থাসহ নানা সুবিধা বাড়ানো উচিত।শিক্ষকগণও তাদের দায়িত্ব পালনে আরো সচেষ্ট হবেন- এ আশা মানুষ করতেই পারে। শিক্ষকদের সম্মানও সম্মানীর যেন কোন ঘাটতি না থাকে সে ব্যাপারে সকলের সচেতনতা কাম্য।