কৃষ্ণকুমারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

শিক্ষকের কান্ডে বিপাকে ৯ ‘এসএসসি পরীক্ষার্থী’

নিজস্ব প্রতিবেদক

24

পূর্ব ক্ষোভের জের ধরে পরীক্ষার হলে ছাত্রীদের খাতা আটকে রাখেন প্রশান্ত বড়ুয়া নামের এক শিক্ষক। এ কারণে এসএসসির নির্বাচনী (টেস্ট) পরীক্ষায় ফেল করেছে কৃষ্ণকুমারী সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ জন শিক্ষার্থী। অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ওই শিক্ষক এমন কান্ড করেছেন বলে অভিযোগ করেছে শিক্ষার্থীরা।
গত মঙ্গলবার সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের কাছে এ অভিযোগ দায়ের করা হয়। আবেদনের প্রেক্ষিতে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এবং ৯ ছাত্রীর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন মেয়র। তবে ফেল থেকে বাঁচার জন্য শিক্ষার্থীরা এমন সাজানো অভিযোগ করেছে বলে দাবি করেছেন অভিযুক্ত শিক্ষক প্রশান্ত বড়ুয়া।
ছাত্রীদের অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, কৃষ্ণকুমারী স্কুলের শিক্ষক প্রশান্ত বড়ুয়া ছাত্রীদের বিভিন্ন সময় ‘অনৈতিক প্রস্তাব’ দিয়েছেন। মোবাইল নম্বরসহ ছাত্রীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সংযুক্ত হতে আগ্রহ দেখান। পরবর্তীতে ১০ম শ্রেণির ছাত্রীরা স্কুলের প্রধান শিক্ষককে এসব বিষয়ে অভিযোগ করলে, ওই শিক্ষককে দশম শ্রেণিতে পাঠদান থেকে বিরত রাখা হয়।
এরপর থেকে প্রশান্ত বড়ুয়া ১০ম শ্রেণির বেশ কয়েকজন ছাত্রীকে নানাভাবে হয়রানি করতে থাকেন এবং প্রায় সময় পরীক্ষায় নম্বর কম দেয়া ও ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয় দেখান। স¤প্রতি ওই শিক্ষার্থীদের এসএসসির নির্বাচনী পরীক্ষার গণিত বিষয়ের পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে ২০৪ নম্বর কক্ষে পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করেন প্রশান্ত বড়ুয়া। তখন তিনি ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে’ পরীক্ষা শেষ হওয়ার প্রায় দেড় ঘণ্টা আগে ৯ জন ছাত্রীর পরীক্ষার খাতা নিয়ে ফেলেন। পরীক্ষা শেষ হওয়ার মাত্র ১০ মিনিট আগে খাতা ফিরিয়ে দেন। ভুক্তভোগী ছাত্রীরা পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে বিষয়টি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আহমেদ হোসেনকে অবহিত করেন। ওই সময় তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে তাদের আশ্বস্ত করেন। এদিকে, নির্বাচনী পরীক্ষার ফলাফলে অন্যান্য সব বিষয়ে পাশ করলেও ওই ৯ ছাত্রী গণিত বিষয়ে ফেল করায় আসন্ন এসএসসি পরীক্ষায় তাদের অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ নিয়ে অভিভাবকরাও উৎকন্ঠায় আছেন।
শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শুধু নির্বাচনী পরীক্ষায় পাশকৃত পরীক্ষার্থীরা এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার জন্য ফরম পূরণ করতে পারবে। তবে নির্বাচনী পরীক্ষার সময় পরীক্ষার্থীর নিয়ন্ত্রণে না থাকা এমন কোনো কারণ বা শারীরিক অসুস্থতা হেতু নির্বাচনী পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর অভিভাবকের লিখিত আবেদন ও প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষার সন্তোষজনক ফলাফলের ভিত্তিতে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য মনোনীত হবেন।
চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের প্রধান পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মাহবুব হাসান বলেন, একজন শিক্ষক উদ্দেশ্যেপ্রণোদিতভাবে পরীক্ষার্থীদের খাতা আটকে রাখা অবশ্যই অপরাধ। এ ক্ষেত্রে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সতত্য যাচাই করে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
দিদারুল আলম নামে এক ভুক্তভোগী ছাত্রীর বাবা পূর্বদেশকে বলেন, প্রশান্ত বড়ুয়া নিজের স্বার্থসিদ্ধি করতে না পেরে ইচ্ছাকৃতভাবে মেয়েদের ফেল করিয়েছেন। ছাত্রীদের বিভিন্ন সময় অনৈতিক প্রস্তাব দেয়ায় তারা প্রধান শিক্ষককে অভিযোগ দিয়েছিল। এরই জের ধরে তিনি মেয়েদের হুমকি দিতেন। অংক পরীক্ষার দিন পরীক্ষার হলে তাদের দেখতে পেয়ে ওই শিক্ষক বলেন, ‘আজকে তোদের পেয়েছি’। এক ঘণ্টা না যেতেই তিনি ছাত্রীদের খাতা নিয়ে নেন। পরীক্ষা শেষ হওয়ার ১০ মিনিট পূর্বে খাতা দেন। ওইদিন মেয়েরা প্রধান শিক্ষককে অভিযোগ করে। আমার স্ত্রীও মুঠোফোনে প্রধান শিক্ষককে বিষয়টি অবহিত করেছে। প্রধান শিক্ষকের পরামর্শে প্রতিকার পেতে মেয়রের কাছে অভিযোগ করেছি।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আহমদ হোসেন পূর্বদেশকে বলেন, শিক্ষক প্রশান্ত বড়ুয়ার বিরুদ্ধে পূর্বে এমন অভিযোগ পাওয়ায় তাকে ১০ম শ্রেণির ক্লাস নেয়া থেকে বিরত রেখেছিলাম। গণিত পরীক্ষার দিন এমন কাণ্ডের পর মেয়েরা আমার কাছে অভিযোগ করে। প্রশান্ত বড়–য়াকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বিষয়টি অস্বীকার করেন। সর্বশেষ যে অভিযোগ তার বিরুদ্ধে এসেছে, সে অভিযোগের প্রেক্ষিতে সিটি কর্পোরেশনের শিক্ষা বিভাগের নির্দেশনায় তাকে শোকজ করা হয়েছে।
অভিযুক্ত ওই শিক্ষককে পরীক্ষার হলে দায়িত্ব দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের শিক্ষকের সংকট রয়েছে। তাই প্ল্যানিং করতে গিয়ে তিনি ওই কক্ষে পড়েছেন।’
শিক্ষক প্রশান্ত বড়ুয়া পূর্বদেশকে বলেন, ‘আমি ২০৪ নম্বর কক্ষের দায়িত্বে ছিলাম। যারা অভিযোগ করেছে তারা সবাই ২০৪ নম্বর কক্ষের হতে পারে না। নির্বাচনী পরীক্ষায় ফেল করেছে ১১ জন। এদের মধ্যে ৯ জন অভিযোগ করেছে। এসব শিক্ষার্থী নবম শ্রেণি থেকে পাশ করে দশম শ্রেণিতে উঠেনি। তখনও তারা ফেল করেছে।’
ছাত্রীদের অনৈতিক প্রস্তাব দেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমি ওইদিন ক্লাসের শৃঙ্খলা রক্ষার্থে দুই-তিনজনের ৫ মিনিটের জন্য খাতা আটকে রেখেছিলাম।’