শিক্ষকতা পেশা

কাজী আবু মোহাম্মদ খালেদ নিজাম

168

বিশ্বজুড়ে শিক্ষকতা পেশা বিশেষ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। অনেক দেশে শিক্ষকদের সম্মান প্রাইমারি লেভের থেকেই যেমন সর্বোচ্চে তেমনি সম্মানীও উপযুক্তভাবে দেওয়া হয়। যদিও আমাদের দেশে সে তুলনায় অনেক কম। এরপরও শিক্ষকগণ তাদের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। মানুষ গড়ার কারিগর হচ্ছেন শিক্ষকরা। মা- বাবা জন্ম দেয়ার পর মূলত শিক্ষকের হাতেই গড়ে উঠে সন্তান। ছাত্রকে মানুষ করার জন্য শিক্ষকের চেষ্টার অন্ত থাকে না। দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে তাতে হাজার, লক্ষ শিক্ষক শিক্ষকতা করে যাচ্ছেন। ছাত্রদের শিক্ষাদান করে যাচ্ছেন। আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন তাদের মানুষ করার জন্য। শিক্ষক কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর দায়িত্বে অবহেলা করেন না বলেই বিশ্বাস করি।
আমার সুদীর্ঘ ২০ বছরের শিক্ষকতা জীবনে অনেক ছাত্রছাত্রী বিভিন্নভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নিজের একজন ছাত্র বা ছাত্রী যখন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা উচ্চ কোন পদে থেকেও দেখা-সাক্ষাতে শ্রদ্ধা,সম্মান করে তখন বুক গর্বে ভরে উঠে। এখানে তো শিক্ষকদের তেমন সম্মানী নেই, নেই বড় কোন সুযোগসুবিধাও। ছাত্রের এতটুকু সম্মানও কি শিক্ষক পেতে পারেনা?
বিভিন্নভাবে প্রতিষ্ঠিত আমার অনেক শিক্ষার্থী আছে যাদের কাছাকাছি যখন যেতে হয় বা সাক্ষাতের সুযোগ হয় তখন তারা আমাকে সাধ্যানুযায়ী সমাদর করে। ভালো লাগে দেখামাত্র চেয়ার ছেড়ে যখন উঠে যেতে চায়,পা ছুঁতে চায়। শিক্ষক না চাইলেও দিতে চায় উপহার সামগ্রী বা তাদের সাধ্যমত কিছু। কিন্তু যখন কোন ছাত্র শিক্ষককে সম্মান করেনা বা দেখা-সাক্ষাতে সালাম কিংবা শ্রদ্ধা করেনা তখন খুবই খারাপ লাগে। আগের মতো সেই শ্রদ্ধাবোধটুকু নেই। উঠে যাচ্ছে দ্রæতই। শিক্ষকতা জীবনে একজন শিক্ষককে বিভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, শুনতে হয় নানা কথা। ছাত্রকে মানুষ করতে গিয়ে এসব কথা কিংবা পরিস্থিতিকে সামলে নেন একজন শিক্ষক। সাধ্যমত জ্ঞান বিতরণে ব্যাপৃত থাকেন তিনি। ‘কিছু শিক্ষক বিভিন্ন অনিয়ম ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত থাকেন’- এমন অভিযোগ করে থাকেন অনেকে। তাই বলে ক্ষুদ্র এ অংশের কারণে গোটা শিক্ষক সমাজকে দায়ী করা মোটেই যুক্তিসংগত নয়। বেশিরভাগ শিক্ষকই প্রাণ উজাড় করে দেন তার শিক্ষার্থীদের জন্য। আর এটাই বাস্তব। একজন শিক্ষক তার শিক্ষকতা পেশার বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মান উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের দেওয়া নানা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সচেষ্ট থাকেন।
ব্যক্তিগত জীবনে একজন শিক্ষক কোনমতে খেয়েপড়ে বেঁচে থাকেন। অন্য কোন উপায় তেমন না থাকায় বেশিরভাগ শিক্ষককে সরকারের বেতন-ভাতাদির উপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। ফলে খুব বেশি সচ্ছল জীবনযাপনের সুযোগ থাকেনা। বর্তমানে বেতন স্কেল বাড়ানো হলেও পণ্যমূল্যের কারণে তা শিক্ষকের জীবনে তেমন প্রভাব ফেলেনি। যোগ্যতা অনুযায়ী স্কেল দেওয়া হলে কিছুটা সচ্ছলতা ফিরে আসবে বলে বিশ্বাস করি।
যথোপযুক্ত সম্মানীর ব্যবস্থা হলে শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীরা আসতে আগ্রহী হবে।
সম্মানীর কথা চিন্তা করলে শিক্ষকগণ কবে যে তাদের পেশা ছেড়ে চলে যেতেন তা বলা বাহুল্য! মূলত: ছাত্রছাত্রীদের মানুষ করার তীব্র আকাংখা থেকে তারা এখানে থেকে যান। দায়িত্ববোধের চিন্তা করেন। ফলে অপরের সন্তানকে মানুষ করতে শিক্ষকতা পেশাকে আঁকড়ে থাকেন। অবসরের আগমূহুর্ত পর্যন্ত এই চেষ্টা করে যান। পৃথিবীর সকল শিক্ষক তার প্রাপ্য সম্মান ও যথোপযুক্ত সম্মানী নিয়ে বেঁচে থাকুন- এই কামনা রইল।
লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক