মহাকবি ইকবাল

শিকওয়া-জওয়াব-ই শিকওয়া

সবুজ কবির

211

১৯১১ সাল। পতন্মুখ তুর্কি খিলাফত হারিয়েছে তার ইউরোপিয় ভুখন্ড। আফ্রিকা আর এশিয়ার মুসলিম দেশগুলি শ্বেতাঙ্গ ঔপনিবেশিকদের ক্রিড়াক্ষেত্র হয়ে গেছে। আরব ভূমি এক বদ্ধ ইসলাম এর চর্চায় বন্ধ্যা হয়ে আছে। তখনই পরাধিন ভারতবর্ষের লাহোরে এক মুশায়রা মাহফিল এ এক তরুন কবির কন্ঠে ধ্বনিত হল বিশ্বমুসলিম এর মনের অস্থির অবস্থার প্রতিধ্বনি। সেই কবি ছিলেন আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল। ‘শিকওয়া’ নামে বিশ্ব মুসলিম এর সেই হৃদয় এর না বলা কথা কে মুর্ত রুপ দিয়ে ইকবাল এর কবিতা মুহুর্তেই আলোড়ন সৃষ্টি করে। শত বর্ষ পরও এই কবিতার আবেদন অটুট। বিশেষ করে বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে বিশ্ব মুসলিম এর জন্য যেন আবারও এই শিকওয়ার দিন ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে।
.ইকবাল তখন কয়েক বছর হল মাত্র ফিরে এসেছেন ইউরোপ থেকে। সেখানে মানুষের বৈষয়িক উন্নতির সাথে আত্মিক অবনতি দেখে ইউরোপিয় সভ্যতার প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়েছেন। অন্যদিকে উপমহাদেশে ও বিশ্বের মুসলিম সমাজের কূপমন্ডুকতা এবং ভিরুতা তাকে আহত করেছে। তার করুনাময় হৃদয় খুজছে মুসলিম দের এই পতন এর কারন। খোদার দরবারে তাই তার এক অভিযোগ পেশ এই কাব্য মালায়। কবিতার নাম তাই “শিকওয়া’ বা অভিযোগ। কেন মুসলিম জাতি আল্লাহর আনুগত্য সত্বেও তার রহমত থেকে বঞ্চিত সেই প্রশ্ন করছেন তিনি। আসলে সেই প্রশ্ন তিনি আল্লাহ কে করেন নি। করেছেন মুসলিম জাতিকে।
মরম-বেদনা রসনায় মোর শানিয়ে তুলিছে ভাষাটি,তাই
আল্লার নামে শেকায়েত আনি, মুখেতে আমার পড়ুক ছাই।
(মনিরুদ্দিন ইউসুফ)
কবি ইকবাল কোন কবিতা রচনার সময়ই তার ঘনিষ্ট বন্ধুদের দেখাতেন। কিন্তু এই কবিতাটি তিনি রচনা করেন অত্যন্ত গোপনে। লাহোরে ইসলামিয়া কলেজ এর হোষ্টেলে যে মুশায়রা তে তিনি কবিতাটি প্রথম পড়ে শোনান সেখানের নিয়ম ছিল কবিতা ছাপিয়ে বিলি করার। কিন্তু ইকবাল পড়ার আগে সেটা ছাপাতে রাজি হননি। কবি উঠে দাড়িয়ে সুর এর সাথে কবিতাটি পড়তে শুরু করেন আর মুহুর্তেই শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যায়।তাদের হৃদয় এর কথ্ াকবির কলম দিয়ে অনুভব করে তারা। কবির উপর ফুল বৃষ্টি বর্ষন করে শ্রোতারা। মুহুর্তের মধ্যেই যেন বিশ্ব মুসলিম এর ব্যাথা কবি ইকবাল এর কলমে মুর্ত হয়ে যায়। কবিতাটি শ্রিঘ্রই প্রকাশিত হয় এবং বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। সাধারন মানুষ কবির কণ্ঠে কনণ্ঠ মিলিয়ে নিজেদের অবস্থার কারন খুজতে শুরু করে। অন্যদিকে কিছু কায়েমি স্বার্থবাদি তথাকথিত আলেম শ্রেনির মধ্যে সৃষ্টি করে ঈর্ষার। জিবনের সত্য খুঁজতে আগ্রহি তরুণ সমাজ তাদের গ্রেফ প্রদর্শনি ধর্ম ছেড়ে দিয়েে ইসলামের প্রকৃত রুপ অনুসন্ধান এর আশংকায় তারা এই কবিতার জন্য ইকবাল এর উপর আরোপ করেন কাফির ফতোয়!
কবি সেই ফতোওয়ার জবাব দিয়ে দুই বছর পর উপস্থানপন করেন তার “জওয়াব ই শিকওয়া“ শিকওয়া তে কবি আল্লাহর কাছে যে বিষয়গুলি উপস্থাপন করেছিলেন তার জবাব নিয়েই এই কবিতা রচনা করেন। ভঙ্গুর মুসলিম সমাজের প্রচলিত বিশ্বাস আর ভন্ডামির প্রতি এক ত্রিব্র আক্রমন করেন কবি। এই কবিতা “শিকওয়া“ থেকেও জনপ্রিয় হয়। লক্ষহিন,মানবতাহিন মুসলিম সমাজ কে তার পতন এর কারন দেখান কবি তার কয়েকটি লাইনে। কি করে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি তখন সেবাদাস হয়ে গেছে শ্বেতাঙ্গ খৃষ্টানদের। হারিয়েছে নিজেদের তাহযিব তমুদ্দন।
কবর-ব্যবসা করিয়াও তুমি করিছ বড়াই, নাহি কি লাজ?
নিশ্চয় তুমি মুর্তি পেলেও তাহারি দোকান ফাঁদিবে আজ।
(মনিরুদ্দিন ইউসুফ)
বা
অসনে বসনে খ্রিষ্ট তোমরা, হিন্তু তোমরা সভ্যতায়
তুমি মুসলিম! যাহারে দেখিয়া ইহুদিও লাজে মরিয়া যায়।
(মনিরুদ্দিন ইউসুফ)
“শিকওয়া” ও ”জওয়াব ই শিকওয়া” উভয় কবিতাই দির্ঘ ও উর্দু কবিতার নজম শ্রেনির। “শিকওয়া“ কবিতাটি ৩১ টি স্তবক বা ষ্ট্যাঞ্জায় বিভক্ত। প্রত্যেকটি স্থবক ৬ লাইন এর।
”জওয়াব ই শিকওয়া“৩৬ টি স্তবক এ বিভক্ত। উভয় কবিতায় পরবর্তিতে একসাথে প্রকাশিত হয়। ইকবাল এর “বাঙ্গে দারা” ও কাব্য সমগ্র “কুল্লিয়াত এ ইকবাল“ গ্রন্থে সংযুক্ত হয়।ইকবাল উর্দু ও ফার্সি উভয় ভাষায় কাব্য রচনা করতেন। উর্দু ভাষায় তার লেখার মধ্যে “শিকওয়া“ও ”জওয়াব ই শিকওয়া“ তার সবচেয়ে জনপ্রিয় রচনা।
“শিকওয়া“ও ”জওয়াব ই শিকওয়া” বিশ্বের অনেকগুলি ভাষায় অনুদিত হয়েছে। ইংরেজিতে অধ্যাপক আরবারির অনুবাদটি প্রথম। বাংলায়ও একাধিক জন এর অনুবাদ করেছেন। বাংলায় অনূদিত ইকবাল এর প্রথম কবিতাও “শিকওয়া” সেই অনুবাদটি করেছিলেন কবি আশরাফ আলি খান। এরপর অনুবাদ করেন মুহাম্মদ সুলতান। যার প্রকাশিত অনুবাদ এর একটি ছোট কিন্তু মুল্যবান ভূমিকা লিখেছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম।এরপর মিজানুর রহমান ও ড” মুহাম্মদ শহিদুল্লাহও অনুবাদ করেন এই দুই কবিতার। ইকবাল কাব্য সঞ্চয়ন এ মনিরুদ্দিন ইউসুফ এর অনুবাদও সুপাঠ্য। ইকবাল এর শিকওয়ার সব অনুবাদই জনপ্রিয় হয়।
ইকবাল এর এই কবিতা মুসলিম জাতির জন্য কি এনেদিয়েছি? বিশেষ করে বাঙ্গালি মুসলিমদের জন্য। এই প্রসঙ্গে জাতিয় অধ্যাপক সৈয়দ আলি আহসান এর বক্তব্য হচ্ছে
“নজরুলি ইসলাম কে পুরোভাগে রেখে বাংলার মুসলিম সমাজ যখন জীবনের ভিত্তিহীনতার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে, তখন ইকবাল এর “শিকওয়া” র সাথে আমাদের পরিচয়। নজরুল কে পথিকৃত মেনে আশরাফ আলি খান আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলেন আমাদের জীবনের বিপর্যয় ও স্বস্তিহীনতার জন্য এবং সত্যাদর্শের অভাবের জন্যও। ”শিকওয়া“ এ তিনি আপন মনের অনুরনন শুনলেন। কাব্য হিসেবে “শিকওয়ার“ মুল্য যতই লঘু হোকনা কেন, এর অভিযোগ আমাদের অনুভুতিতে শিহরন তুলেছিল।নজরুল কে ভাল লেগেছিল,ইকবাল কে আরো ভাল লাগল।নজরুলের দীপ্তি অসাধারন, কিন্তু সেইি দীপ্তির দাহন আছে-স্নিগ্ধতা নেই। ইকবাল এর কাব্যে জ্বালা আছে কিন্তু ধর্মের স্থির সত্যের সাথে তার অসদ্ভাব নেই, তাই তা মুলত প্রশান্ত ও জীবনানুভূতিতে অতুলনিয়”
আজ বিশ্বের এই অশান্ত পরিবেশে “শিকওয়া” ও “জওয়াব ই শিকওয়া“ শুধু মুসলিম জাতির জন্য নয় বরং সকল মানুষের জন্যই এক আত্মঅনুসন্ধান এর পথ।
২১ এ এপ্রিল আল্লামা ইকবাল এর মৃত্যুবার্ষিকিতে তরুণ সমাজের প্রতি আহব্বান সময় এর এই উচ্ছৃঙ্খলতার সময় সত্যের খোজে ”শিকওয়ার” পুন’ পাঠ প্রয়োজন।