শাহছুফী হযরত মাওলানা সৈয়দ আবদুল গণি চৌধুরী (ক.) মাইজভান্ডারী

অধ্যাপক কাজী ফরিদ উদ্দিন আখতার

6

ত্বরীকা এ মাইজভান্ডারীর প্রবর্তক ও প্রতিষ্ঠাতা গাউছুল আযম শাহছুফী সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (ক.) মাইজভান্ডারী বিশাল আধ্যাত্মিক প্লাটফরম তৈরী করে জগৎবাসীর জন্য মুক্ত বেলায়তের অর্থাৎ আচার ধর্মের অর্গলমুক্ত যে দ্বার অবারিত করে সমকালীন বিপন্ন মানবতাকে ঐশী আলোর পথ দেখিয়ে গেছেন তা যুগে যুগে মানুষকে সুপথগামী করবেই। হযরত কেবলা তাঁর জীবদ্দশায় যে কয়জনকে তাঁর নিজস্ব তত্ত¡াবধানে উপযুক্ততা দান করে তাঁর প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত করেছিলেন তাঁদের মধ্যে খলিফা-এ গাউছুল আযম মাইজভান্ডারী হযরত মাওলানা শাহছুফী সৈয়দ আবদুল গণি চৌধুরী মাইজভান্ডারী (ক.) এক উজ্জ্বল আধ্যাত্মিক পুরুষ। তিনি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানার অন্তর্গত কাঞ্চন নগর গ্রামে ১৪ আশ্বিন ১২৫৫ বঙ্গাব্ধ বুধবার সুবেহ সাদেকের সময় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হযরত মৌলভী সৈয়দ আনসার আলী চৌধুরী। তিনি উত্তর চট্টগ্রামের একজন স্বনামধন্য ন্যায়পরায়ন জমিদার হিসাবে খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব ছিলেন। অসাধারণ মেধাবী হযরত আব্দুল গণি আশৈশব প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি অতিন্দ্রিয় শক্তির তথা ঐশী জ্ঞানের প্রতি অনুসন্ধিৎসু ছিলেন। ১০/১১ বছর বয়সেই তিনি নির্জনতায় ধ্যানমগ্ন হতেন। বাড়ীর অনতি দূরে ছমুর পাহাড় এলাকায় তাঁর এই ধ্যান মুরতি দর্শনে শিকারে আগত চাকমা রাজা সূজঁও চৌধুরী তাঁর দর্শন পেয়ে এই সাধক বালককে পরম শ্রদ্ধায় তাঁর স্বীয় গৃহে নিয়ে আসেন। লেখাপড়ায় সমাপনান্তে চাকমা রাজা তাঁকে কর্মাধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্বপূর্ণ পদে সম্মানের সহিত অধিষ্ঠিত করেন। চাকমা রাজার বাড়ীতে তাঁকে অত্যন্ত বিলাসবহুল আসবাবপত্র দিয়ে বসবাসের সুযোগ করে দেয়া হলেও তিনি ঐসব আপ্যায়নে অনাসক্ত ছিলেন। তিনি প্রায়শঃ পালংক ছেড়ে মেঝেতে শয়ন করতেন। এদিকে তাঁর পিতা একমাত্র সন্তানকে নিজ গৃহে এনে জমিদারীর বিশাল ভূ-সম্পত্তি স্বর্ণ-রৌপ্য-মুদ্রার ধনসম্পদের দায়িত্ব দিতে চাইলেও তিনি ঐসব বিষয়-আশয়ে অনীহা প্রকাশ করতেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এ ধরনের অনেক উদাহরণ বিদ্যমান যারা এশকে এলাহীর সন্ধান পান তাঁরা মূলতঃ ঐশী জ্ঞান বা খোদায়ী প্রেমের স্বাদ দ্বারা এতো মশগুল বা বিভোর হয়ে যান যে, ভোগের দুনিয়ার বিলাস ব্যাসনে তাঁদের কোন আগ্রহ থাকে না। তাই তো দিল্লী সম্রাটের “রাজকবি” আমীর খসরু মাহবুবে এলাহী খাজা নিজাম উদ্দিনের ছোহবতে তথা সান্নিধ্যে এসে মন্ত্রীত্বের সম-মর্যাদা সম্পন্ন রাজ কবির রাজকীয় পদ ছেড়ে দিয়ে আপনা মুর্শিদ কেবলার চরণে নিজেকে নিবেদন করে বলেন রাজার রাজ সিংহাসন অপেক্ষা প্রকৃত অলির দরজার দারোয়ানী অনেক শ্রেয়। বলখ নগরীর বাদশা হযরত ইব্রাহীম আদম তাই সিংহাসন ছেড়ে পীরের দরবারে লাকড়ির বোঝা বহন করে নিজেকে ধন্য করে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। আমি অধম ক্ষুদ্র লেখকের হাতে হযরত আবদুল গণি সাহেবের নাতি অধ্যাপক শাহজাদা শফিউল গণি চৌধুরী যতটুকু তথ্য সরবরাহ করেছেন তাঁর অতি ক্ষুদ্রাংশের পাঠ উদ্ধার করে আমি নিশ্চিত হয়েছি যে, হযরত আবদুল গণি আল মাইজভান্ডারী এ ত্বরিকার প্রাণপুরুষ হযরত গাউছুল আযম শাহছুফী সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (ক.) এবং মগ্ন চতন্যৈর অন্যতম প্রধান সম্রাট ভান্ডারীর ত্বরিকার প্রধান রূপকার হযরত গাউছুল আজম শাহছুফী সৈয়দ মাওলানা গোলামুর রহমান প্রকাশ বাবা ভান্ডারীর যথাক্রমে নির্দেশনা এবং স্বর্গীয় সুধায় ভরা নেয়ামতের আহবান পেয়ে স্বীয় জীবন যৌবন অর্থবিত্ত ভূ-সম্পত্তি জমিদারী ইত্যাদি ইত্যাদি দুনিয়াবী আকর্ষণ ত্যাগ করে এই মহান ত্বরিকার একটি অত্যান্ত গুরুত্বপুর্ণ দায়িত্ব পূর্ণ সফলতার সাথে পালন করতে সক্ষম হয়েছিলেন বিধায় তারই বংশধারায় এই গুরু দায়িত্বের উত্তরাধিকার চলমান রয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি। তাঁর কর্মময় জীবনের একটি বিশেষ অংশজুড়ে রয়েছে তাঁর সুনিপুণ হস্ত লিখিত পান্ডুলিপি। এই পান্ডুলিপিগুলি গবেষণার উপযুক্ত উপাদান বলে আমি মনে করি। জার্মানীর মার্টিন লুথার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. হান্স হার্ডার পাÐুলিপিগুলো সম্পর্কে গত ১১-০৩-২০০১ইং লিখিত যে মন্তব্য করেন তা নি¤œরূপ-ও যধাব হড়ঃ ংববহ ঃযব ড়ৎরমরহধষ সধহঁংপৎরঢ়ঃং ড়ভ ঐধুৎধঃ অনফঁষ এযধহর ঈযড়ফিযঁৎু, নঁঃ রঃ ংববসং ঃড় সব ঃযধঃ ধহ বভভড়ৎঃ ভড়ৎ ঃযবরৎ ঢ়ঁনষরপধঃরড়হ রং াবৎু সঁপয রহ ড়ৎফবৎ বাবহ রভ সধহু ড়ভ ঁং ফড়হ’ঃ ঁহফবৎংঃধহফ ঃযবস. ডব ফড় ঁহফবৎংঃধহফ ঃযধঃ ঃযব সধহঁংপৎরঢ়ঃং নব ভরৎংঃ ংপধহহবফ ধহফ ধফফবফ ঃড় ঃযব গধরুনযধহফধৎর বিন ংরঃব. ওহ ধ ংবপড়হফ ংঃবঢ়, সড়হবু ংযড়ঁষফ নব ৎধরংবফ ভড়ৎ ধ বিষষ-ফড়হব ড়ভভঢ়ৎরহঃ ঢ়ঁনষরপধঃরড়হ যিরপয ড়িঁষফ নব ধ নবহবভরঃ নড়ঃয ভড়ৎ গধরুনযধহফধৎরং ধহফ ংপযড়ষধৎং ড়ভ ঝঁভরংস বঃপ. ভৎড়স ইধহমষধফবংয ধহফ ধনৎড়ধফ.
এছাড়া জাপানের বিখ্যাত টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য গবেষক, শিক্ষক এবং জাপান সোসাইটি ফর দি প্রমোশন অফ সায়েন্স টোকিও এর রিসার্চ ফেলো ড. মাশাহিকো তোগাওয়া পান্ডুলিপিগুলো দেখে বিষ্ময় প্রকাশ করেন এবং কয়েকটি পান্ডুলিপির আলোকচিত্র ধারণ করে গবেষণার জন্য নিয়ে যান।
এ সমস্ত পাÐুলিপির সঠিক তথ্য উদঘাটন হলে মাইজভান্ডারী ত্বরিকার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। মাইজভান্ডারী গবেষক, লেখক, বুদ্ধিজীবী ও সাধকগণকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসা আশু প্রয়োজন রয়েছে।
এ মহান সুফি সাধক ১৩ নভেম্বর ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দ ২৯ কার্তিক ১৩৪১ বঙ্গাব্দ, সোমবার বেসাল প্রাপ্ত হন। প্রতি বছর ২৯ কার্তিক তাঁর বার্ষিক ওরশ শরীফ অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর অসংখ্য কারামত রয়েছে। তাঁর সবচেয়ে বড় কারামত তাঁর রচিত রহস্যপূর্ণ অসংখ্য পান্ডুলিপি। সেগুলোতে আর্শ, কুর্সি, লৌহ, কলম, বেহেশত, দোজখ, হাশর-মিজান, মনকির-নকির প্রভৃতির সচিত্র বর্ণনার পাশাপাশি গাউসিয়তের আইন-কানুন, বিধি-বিধান, সংবিধানের অনুপুঙ্খ ধারা ও রূপরেখা বর্ণিত হয়েছে-যা পৃথিবীর ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে।
লেখক: শিক্ষক, প্রাবন্ধিক