শাস্তি

আব্দুস সালাম

8

বেশ কয়েক বছর আগে চাকুরি খোঁজার জন্য ঢাকাতে এসেছি। মিরপুরের একটি ম্যাচে আমার এলাকার এক বড়ভাই থাকেন। আমি সেখানে উঠেছি। আমাদের ম্যাচটি চারতলা বিল্ডিং এর টপ ফ্লোরে। ম্যাচের ঠিক বিপরীত দিকে ছিল একটি আটতলা বিল্ডিং। আমি ম্যাচে ওঠার মাস দুয়েক আগে ওই বিল্ডিং-এর চার তলার একটি ফ্ল্যাটে এক দম্পতি ভাড়া নেন। স্বামী-স্ত্রী দু’জনা ভাল একটি কোম্পানিতে চাকুরি করতেন। সপ্তাহে দুইদিন তাদের অফিস বন্ধ থাকতো। গৃহকর্মের জন্য ওই দম্পতি তাদের গ্রাম থেকে অল্প বয়সের একটি মেয়েকে গৃহকর্মের জন্য এনেছিলেন। মেয়েটির বয়স বার বা তের বছর হবে। সকালবেলায় ওই দম্পতি অফিসের উদ্দেশ্যে বের হতেন। আর রাত নয়টা দশটার সময় বাসাতে ফিরতেন। সারাদিন মেয়েটি ঘরের মধ্যে একা একা সময় কাটাতো। আর মাঝেমাঝে বারান্দাতে বসে আমাদের ম্যাচের দিকে মুখকরে তাকিয়ে থাকতো।
আমরা অবশ্য জানতাম ছুটির দিন ব্যতীত বেশিরভাগ সময় মেয়েটিকে রাতের বেলায় কাজ করতে হতো। প্রায় প্রতি রাতেই ওই চারতলার বাথরুম হতে কাপড় কাচার শব্দ শোনা যেত। স্বামী-স্ত্রী গৃহকর্মের নানান কাজে মেয়েটির ভুল ধরতো। আর তার সাথে চিল�াচিলি করতো। মাঝেমাঝে তাকে চড় থাপ্পড়ও দিত। প্রায়ই মেয়েটির কান্নার শব্দ শুনতে পেতাম। তাদের বকাঝকার শব্দে আমরা খুব বিরক্ত হতাম। হঠাৎ একদিন মধ্যরাতে মেয়েটির কান্নার শব্দে আমাদের ঘুম ভেঙে গেল। করুণ সুরে মেয়েটি থেমে থেমে কাঁদছে। কিছুক্ষণ পর আমরা আবার ঘুমিয়ে পড়ি। খুব সকালেও সেই মেয়েটির কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম। আমরা জানালা খুলে দেখলাম যে, মেয়েটিকে দড়ি দিয়ে বারান্দার গ্রিলের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। মেয়েটিকে দেখে আমাদের খুব কষ্ট হলো। ম্যাচের সকলে আলোচনা করলো এর একটা বিহিত করা দরকার। ম্যাচের একজন বড়ভাই ছিল। তিনি খুব সাহসী। তিনি চেষ্টা করলো মেয়েটির অপরাধ কী তা জানার জন্য। অবশ্য পরে তিনি জানতেও পেরেছিলেন। আর তা হলো- আগের রাতে থালা-বাসন মাজার সময় মেয়েটি একটি চিনামাটির পে�ট ভেঙে ফেলেছিল। তাই শাস্তি স্বরুপ তাকে এই সাজা দেওয়া হচ্ছে। ম্যাচের বড়ভাই আমাদের দুই একজনকে সঙ্গে নিয়ে ওই বিল্ডিংয়ে গেলেন এবং বাড়িওয়ালার কাছ থেকে ওই চারতলার ভাড়টিয়ার মোবাইল নং নিলেন। তারপর তিনি ওই ভাড়াটিয়াকে মোবাইল করে মেয়েটির বিষয়ে জানতে চাইলেন। বড়ভাইয়ের সাথে ওই ভাড়াটিয়ার বেশ কথা কাটাকাটি হলো। এক পর্যায়ে বড়ভাই বললেন : ‘আপনি এক ঘন্টার মধ্যে মেয়েটিকে ছেড়ে দেবেন নইলে পুলিশকে খবর দেব। শুধু তাই নয় যদি দ্বিতীয় কোনদিন শুনি আপনি মেয়েটির সাথে খারাপ ব্যবহার করেছেন তাহলেও আপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’ তারপর মোবাইলটি কেটে দেন।
সেদিন ওই ভাড়াটিয়া এক ঘন্টার মধ্যে অফিস থেকে বাসাতে চলে আসেন এবং মেয়েটির বাঁধন খুলে দেন। এতে আমরাও খুশি হলাম। অবশ্য তারপর থেকে আমরা ওই মেয়েটির আর কান্নার শব্দ শুনতে পাইনি। এমনকী ওই দম্পতিরও কোন চিল্লাচিল্লির আওয়াজও শুনতে পাইনি। একদিন জানতে পারলাম যে, আমার বড়ভাই কথা বলার পর অর্থাৎ ওই ঘটনার দেড় মাস পর তারা বাসা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন।