শাম্মী তুলতুল : লেখার প্রতি ভালোবাসা থেকেই লেখিকা

আনোয়ার হোসাইন

9

পরিবার, পরিজন নিয়ে আর পাঁচটা মেয়ের মতোই ছোট থেকে বেড়ে ওঠা। শৈশবে পড়াশোনার ঝোঁক সেভাবে না থাকলেও সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা বাড়তে থাকে বয়স বাড়ার সাথে সাথে। পরিবারের মানুষগুলির মধ্যেও ছিল সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ। আর সেই ভালোবাসা বাড়ির মেয়ের প্রতি পড়বে সেটাই হয়তো ছিল স্বাভাবিক। কিশোরকাল থেকেই সাহিত্যের প্রতি ঝোঁকে যাওয়া এ ব্যক্তি হচ্ছেন বিশিষ্ট লেখিকা শাম্মী তুলতুল। নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশের সৌন্দর্য্য, নমনীয়তা বার বার ধরা পড়েছে বিশিষ্ট এই লেখিকার লেখনীতে। তাছাড়া ছোটদের অন্তরের অনুভ‚তি অতি সুন্দরভাবে পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। স্থান করে নিয়েছেন মানুষের হৃদয়ে।
শাম্মী তুলতুলের মতে, সাহিত্য, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, মুক্তিযোদ্ধা, অভিজাত পরিবারে আমার বেড়ে ওঠা। গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার হালদা নদী ঘেঁষা গ্রাম মোহাম্মদপুর। জন্ম চট্টগ্রাম শহরেই। সাহিত্য, সাংস্কৃতিক পরিবেশে জমজমাট থাকত আমার পরিবারটি। তাই সব কিছু এড়িয়ে আমি সাহিত্যের দিকেই ঝুঁকে পড়ি প্রবলভাবে।
মূলত সংস্কৃতিক পরিবারে বেড়ে উঠা শাম্মী তুলতুলের। বাবা মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবিদ আবু মোহাম্মদ খালেদ তৎকালীন রাউজানের সাংস্কৃতিক সংগঠন জাগরণী ক্লাবের সভাপতি ছিলেন। আর মা কাজী রওশন আখতার দৌলত ছিলেন খ্যাতিমান কবি দৌলত কবির বংশধর। তাই মায়ের সব সময় গল্প কবিতা, উপন্যাস পড়ার ঝোঁক ছিল।
দাদু আব্দুল কুদ্দুস মাস্টার লেখক ছিলেন। দিদা কাজী লতিফা হক নিয়মিত লেখালেখি করতেন বেগম পত্রিকায়। যখন তিনি বুঝতে শিখেন তখন থেকেই এই আবহ বিস্তার হতে থাকে তার মনে।
শাম্মী তুলতুল বলেন, একদম ছোট থেকেই আমার গান, নাচ, খেলাধুলা, গল্প-কবিতা লেখার আগ্রহ ছিল প্রবল। স্কুল বা বাড়ির আশেপাশের ক্লাবগুলোতে আমি নিজের লেখা ছড়া বা কবিতা আবৃত্তি করতাম। পুরস্কারও পেতাম অনেক। লেখাপড়ায় ছিলাম প্রচুর ফাঁকিবাজ। শিক্ষক এলে নানা অজুহাতে তাড়াতাম। তবে দিন রাত গল্পের বই আর মা, দিদার আর দাদুর কাছ থেকে গল্প শোনার বায়না ছিল বেশি। অতি ভালো ফল না করলেও ভালো ফল করে আজ আমি দেশ সেরা কলেজের ছাত্রী। পরিবারের লোকজন যায় চমকে। বর্তমানে পড়ছি চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে মাস্টার্সে। ক্লাস ফোরে পড়া অবস্থায় প্রথম ছড়া ছাপা হয় ক্লাব ম্যাগাজিনে। নিজের নামের বড় হাতের ছাপার অক্ষর দেখে চোখ হয় ছানাবড়া। সেই থেকে কাগজ- কলমের পিছু ছাড়ে-কে।
ধীরে ধীরে দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে চলে পত্রিকায় লেখালেখির পথচলা। দেশ ছেড়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ে লেখালেখির বিস্তার। সাংবাদিক আরিফ রায়হান তাঁর অনুপ্রেরণায় ২০১৩ সালে প্রথম বই প্রকাশের কাজে হাত দেন শাম্মী তুলতুল। পত্রিকায় প্রকাশিত বাছাইকৃত কলাম নিয়ে বইটি প্রকাশ করে আদিগন্ত প্রকাশনী। নাম ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’। পরবর্তী বিভিন্ন প্রকাশকদের আগ্রহ ও আন্তরিক সহযোগিতায় ২০১৪ সালে পত্রিকায় প্রকাশিত শিশু-কিশোরদের নিয়ে বের হয় ছোটোদের বই ‘টুনটুনির পাখির স্কুল’। যথেষ্ট সাড়া পাই এই বইটিতে। সহজ সরল ভাষায় লিখা বইটি শিশুদের অন্তরে জায়গা করে নেয় খুব সহজেই। ২০১৬ সালে মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস ‘চোরাবালির বাসিন্দা’ শাম্মী তুলতুলকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে যায়। হিন্দু-মুসলিমদের বিভেদ ছিল এখানে মুখ্য বিষয়। এভাবেই একে একে শিশুদের বই ৭টি, গল্পের বই একটি, উপন্যাস প্রকাশিত হয় চারটি। ২০১৩ থেকে ২০১৯ মোট ১৪ টি বই বের হয়েছে এই পর্যন্ত। বর্তমানে বাংলাদেশ বেতার চট্টগ্রামে গ্রন্থনার কাজ করছে শাম্মী তুলতুল।