শামসুর রাহমান আধুনিক কবিতার মাতাল ঋত্বিক

আরিফ চৌধুরী

22

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি ও কবি সত্বার অধিকারী শামসুর রাহমান। নিজস্ব কাব্য ভাষা, স্বকীয় চিত্ররুপ, সৌন্দর্য্যবোধ , প্রকৃতি, বাস্তবতা, মানবিক সকল সংকট ও নাগরিক জীবনবোধ.দেশপ্রেম, স্বাধীনতার চেতনা,তার কাব্য ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে নানাভাবে। এতিহ্য চেতনা, ও সমাজের জাগতিক পট-পরিবর্তনের ধারাবাহিক বৈপবিক সময়কে তিনি তুলে এনছেন সু-বিনস্ত করেছেন কবিতার নিজস্ব বৈচিত্র্যতায়।দেশ চেতনা, মধ্রবিত্বেও টানাপোড়েন, সমাষ্টির সংকট, গণ আন্দোলন, স্বাধীনতার তীব্র আংকাংখাও প্রত্যাশা, সংগ্রামী প্রবণতায় শামসুর রাহমানের কাব্য জগত হয়ে উঠেছিলো এশ্বর্যমন্ডিত। তাইতো দেশ ,কাল সমাজ ও ভৌগলিক সমিানা ছাড়িয়ে শামসুর রাহমানের কবিতা সমুজ্জ্বল হয়েছে সর্বত্রই । ১৯৮৭ সালের দেশভাগের পর থেকেই সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যে যে ধারার চেতনা প্রবাহিত হয়েছিলো তার মধ্যে দিয়ে শামসুর রাহমানের আর্বিভাব।ক্রমান্বয়ে নিজস্ব ক্রমকিাশ,কবি শক্তির প্রদীপ্ত উচচারণ ও সৃষ্টিতে বাংলাদেশের কবিতায় আধুনিকতার বিভা জ্বলে উঠলো শামসুর রাহমানের কবিতায়।১৯৫০ সালে কবি আশরাফ সিদ্দিকী ও আবদুর রশীদ খাঁন সমপাদিত ‘নতুন কবিতা’ সংকলনে শামসুর রাহমানের কবিতা ছাপা হলে একজন সম্ভাবনাময় ও কাব্য সৃষ্টির সৃজন ক্ষমতার অধিকারী কবি হিসাবে তীক্ষœবোধ ও মেধা মননে তিনি হয়ে উঠলেন নতুন কালের অভিনব কন্ঠস্বর এবং এর পূর্বে ১৯৪৮ সাওে প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘উনিশশো উনপঞ্চাশ’ নলিনী গুহ সমপাদিত ‘সোনার বাংলা’য় প্রকাশিত হয়েছিলো। পরবর্তীকালে শামসুর রাহমান পঞ্চাশ, ষাট, সওর, আশির দশকে রোমান্টিক প্রবণতার অধিকারী এক সৌন্দর্য্যবোধ নিয়ে রাজনৈতিক সচেতনতামূলক, সামাজিক আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত নানান বিষয় বৈচিত্র্যতায় কাব্যের শক্তিময়তায় প্রকাশ করেছেন নিজেকে অনায়াসেই।শামসুর রাহমানের চিন্তা চেতনা ও মানস রুপের যেমন পরিবর্তন ঘটেছে তেমনিভাবে তার কবিতায় উপজীব্য হয়ে উঠেছে বিচিত্র বিষয় আঙ্গিক, উপমা, ও রুপকল্প।তাইতো তিনি মনবিক জীবন,নাগরিব বোধ, স্বদেশ প্রেমের মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত জাতিস্বতার কবি রুপে স্বীকৃত হয়েছেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত প্রকাশিত শামসুর রাহমানের পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ যেমন- ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে, রৌদ্র করোটিতে, বিধ্বস্ত নীলিমা, নিরালোকে দিব্যরথ, নিজ বাসভূমে, এই সকল কাব্যগ্রন্থে তার প্রতিভার সামাজিকবোধ, ছন্দের বৈচিত্র্যতা, কবির দৃষ্টিভংঙ্গি ও কাব্য দর্শনে প্রকাশ পেয়েছে অনায়াসেই। সেই সময়ে লেখা ‘কখনো আমার মাকে’ বাংলা কবিতার প্রতি পাঠক সমাজের নতুন আগ্রহ সৃষ্টি করেছিলো। উনসওরের গণ আন্দোলন নিয়ে তার কবিতায় ধরা পড়েছে স্বদেশ প্রেমের নির্মোহ চিত্ররুপ। এঠি তার লেখনিতে অব্যাহত থাকে ‘বর্ণমালা আমার দু:খিনি বর্ণমালা’হরতাল, ফেব্রæয়ারি ১৯৬৯, আসাদের শার্ট, ইত্যাদি কবিতায়। অন্যদিকে, উন্মাতাল করা স্বাধীনতা যুদ্ধেও চেতনা াারও শানিত হয়ে আলোড়ন তুলে মানুষের মনে যেমন- তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা, স্বাধীনতা তুমি, তুমি বলেছিলে, কবিতায়। রাজনৈতিক সচেতন কবি শামসুর রাহমান সাংস্কৃতিক আন্দোলন, একাওুরের মুক্তিযুদ্ধেও প্রেক্ষাপটকে ধারণ করে নিজস্ব আত্বশক্তি, তা থেকে উৎসারিত হয়ে উচচারণ করেছেন চিত্রকলা সমৃদ্ধ অসাধারণ কবিতাবলী। অন্যদিকে কবিতা বইয়ের মধ্যে ‘নিজ বাসভূমে(১৯৭০) ও বন্দী শিবির থেকে (১৯৭২)কাব্যগ্রন্থে উঠে আসে কবিতাগুওলা মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী ও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের প্রত্যক্ষ সময়ের ফসল। নিজস্ব চেতনায় অনূভ’তির ও সময়ের তব্রি উরাপের মদ্যে তিনি রচনা করেছেন আলোচ্য কবিতাগুলো। স্বদেশের পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বাস্তবতা, জাতির ইতিহাস, যুদ্ধোওোরকালে স্বদেশের প্রাপ্তি ও প্রত্যাশাকে ধারণ করে কবিতার প্রেক্ষাপটে তিনি চেতনায় ধারণ করেছেন। গণ- আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের সময়ের চিত্রাবলী, ও সংগ্রামের সিঁড়িপথ রচিত হয়েছে কবিতায়। যেমন,-
‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা, তোমাকে পাওয়ার জন্য
আর কতকাল ভাসতে হবে রক্ত গঙ্গায়
আর কতকাল দেখতে হবে খান্ডবদাহন?…..
পৃথিবীর কূলে নতুন নিশানা উড়িয়ে
দামামা বাজিয়ে দিºি¦দিক এই বাংলায়
তোমাকে আসতে হবে,হে স্বাধীনতা।
(তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা-বন্দী শিবির থেকে)
একদিকে স্বদেশের ধ্বংসলীলা অন্যদিকে হত্যা ,মৃত্যু, ও আত্বত্যাগের মধ্য দিয়ে স্বদেশ গড়ার স্বপ্ন জাগানিয়া প্রতীকী বাঞ্জনায় রুপ পেয়েছে বিন্ন উপমা ও চিত্রকল্পে। শামসুর রাহমান সমদ্ধে এক প্রবন্ধে ভাষা গবেষক, প্রয়াত কবি হুমায়ূন আজাদ বলেছিলেন-“আধুনিক কবি শামসুর রাহমানের আত্বপ্রকাশে তিরিশের উওরসূরি আধুনিক কবি ও কবিতাকে অক্ষুন্ন রেখেছেন। শামসুর রাহমানতো পঞ্চাশের কাব্য প্রতিভা তাই তার স্বাতনত্র অবশ্যম্ভাবী। তিরিশের কবিতার কাব্য প্রতিভার মধ্য শামসুর রাহমান তার সঙ্গে গেঁথেছেন বাস্তবতা ও অব্যবহিত প্রতিবেশ ও সময়। শামসুর রাহমান সমকালে বিস্তৃত ও বাস্তবতাকে ধারণ করেছেন। তার কবিতায় উঠে এসছে জাতীয় চেতনার প্রতিটি দ্রোহ, উন্মাতাল, আবহ, উওাপ, গণমুক্তির মূখর শব্দামালা। শামসুর রাহমানের কৃতিত্ব এখানেই যে তিনি বাস্তব প্রতিবেশকে ব্যাপক বিস্তৃত বাসবতবতাকে তার কবিতায় ধারণ করেছেন ন¤্র স্বভাবে।তাইতো তিনি বাংলাদেশের একমাত্র প্রধান কবি রুপে স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। পক্ষাশের দশক থেকে নতুন শতাব্দীর শুন্য দশক পর্যন্ত প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শামসুর রাহমানের কবিতা যে চেতনা ও আকর্ষনের জোওে দীপ্যমান তা হলো তার কাব্যশৈলী, উপমা, প্রতীক, শিল্পরুপ ভাষার সারল্য, আধুনিক কবিতার শব্দও চিত্রকল্প কাব্য ভাষার গেীরবময় এতিহ্যে ও গভীর ব্যাপক দৃষ্টিভংঙ্গি তার কবিতাকে যুগে যুগে মানুষের সুখও দু:খের সাথী করেছে।
শামসুর রাহমানের কবিতা সবার চেতনা ও নাগরিক জীবনযাপনের চিত্রাবলীতে শাণিত বলেই চিত্রিত কাব্যের অধিকাংশ জুড়ে নগর ঝবিনের কথা উঠে এসেছে।নাগরিক অভিঞ্জতার পাশাপাশি সতেজ গ্রামীণ চিত্রকল্পের ব্যাবহার মৃওিকার ঘ্রানের মত শব্দ প্রয়াগের সম্ভাবতা তিনি আয়ত্ব করেন অনায়াসেই। তিনি কবিতার শরীর জুড়ে কৈশোর যাপিত জীবন, জীবনের সামাজিক লোকালয়ের দৃষ্টিভংঙ্গি ও বিশ্বাস এতিহ্যে শাসিত শব্দমালা চিত্রকল্প ব্যাবহার করেছেন সচেতনভাবেই। তাইতো শামসুর রাহমানের হাতে সৃষ্টি হয়েছে শহরকেন্দ্রিক আত্বজীবনের অনন্য কৈশোরের স্মৃতিচারণমূলক রচনা “স্মৃতির শহর” । নাগরিক জীবনযাপনের শহর ঢাকাকে নিয়ে কবি বলে উঠেন-
“ শামসুর রাহমান বলে আছে একজন,
যার প্রতি ইদানিং
বিমুখ নারীর ওষ্ঠ, শিল্পকলা বাগানের ফুল।
সবাই দরজা বন্ধ করে দেয় একে এক মুখের ওপর,
শুধু মধ্যরাতে ঢাকা তার রহস্যের অর্ন্তবাস খুলে বলে-
ফিরে এসো তুমি।
মধ্যরাতে ঢাকা বড়ো বড় একা বড় ফাঁকা হয়ে যায়,
অতিকায় টেলিফোন নেমে আসে গহন রাস্তায় জনহীন
দীর্ঘ ফুটপাত
ছেয়ে যায় উচু উচু ঘাসে স্ইনবোর্ডের বর্ণমালা
কী সুন্দর পাখি হয়ে রেস্তোরার আশপাশ ছড়ায় সংকেত
একজন পরী হ্যালো হ্যালো বলে ডায়াল করছে অবিরাম
মধ্যরাতে ঢাকা বড়ো একা বড়ো ফাঁকা হয়ে যায়।
(পারিপাশ্বিকের আড়ালে- শুন্যতায় তুমি শোকসভা)
স্বাধীনতার উওরকালে শামসুর রাহমান কাব্য সাধনায় হয়েছে নিবিড়, স্পন্দিত,চেতনাপ্রবণ সমাজের উন্থান-পতন, রাজনীতিতে পরিবর্তনের ঢেউ, াপশক্তির ত্যপরতা, নাগরিক জীবনের স্বপ্নভঙ্গ, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় মানবিক জাগরণ, ও তার নির্যাতনের চিত্রাবলী, তার কবিতায় উঠে এমসছে নিবিড় লেখনির শক্তিতে। রাজনীতি যখন তার উপলব্ধিতে প্রত্যয়ী হয়ে উঠে তখন সেই ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক কবিতার জন্মলাভ করে।এদেশের রাজনীতির পরিবর্তন সাস্কৃতিক চেতনায় নতুনতর প্রবাহের সৃষ্টি করেছে। যার প্রতিফলন আমরা খঁজে পাই স্বাধীনতা উওর বাংলাদেশের কবিতায়। তেমনিভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ও পরে স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক সামাজিক অস্থির সময়ের চিত্র শামসুর রাহমানের কবিতায় ছায়া ফেলেছে নানান মাত্রায়। তাইতো কবি বলে উঠেন-
“সারারাত নূর হোসেনের চোখে এক ফোঁটা ঘুমও
শিশিরের মতো
জমেনি, বরং তার শিরায় শিরায়
জ্বলেছে আতশবাতি সারারাত, কী এক ভীষণ
বিস্ফোরণ সারারাত জাগিয়ে রেখেছে
ওকে, ওর বুকে ঘন ঘন হরিণের লাফ,
কখনো অত্যন্ত ক্ষিপ্র জাগুয়ার তাকে প্রতিদ্ব›দ্বী ভেবে জ্বলজ্বলে
চোখে খর তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে,
এতটুকু ঘুমোতে দেয়নি।
উদোম শরীরে নেমে আসে রাজপথে, বুকে-পিঠে
রৌদ্রের অক্ষরে লেখা অনন্য শ্লোগান,
বীরের মুদ্রায় হাঁটে মিছেলের পুরোভাগে এবং হঠাৎ
শহরের টহলদার ঝাক ঝাক বন্দুকের সিসা
নুর হোসেনের বুক নয় বাংলাদেশের হুদয়
ফুটো করে দেয়; বাংলাদেশ
বণপোড়া হরিণীর মতো আর্তনাদ করে,তার
বুক থেকে অবিরল রক্ত ঝরতে থাকে, ঝরতে থাকে।
( বুক তার বাংলাদেশের হুদয়- শামসুর রাহমান) স্বৈরাচারী শাসনের অত্যাচারের নির্মমতায় মানুষ যখন অতিষ্ট,রাজপথ যখন সমাজ নির্মাণের স্বপ্নে মিছিলে মিছিলে প্রকম্পিত হতো প্রতিদিন, সূর্য সৈনিকদেও মতো নূর হোসেনের মৃত্যুহীন প্রান একটা নতুন মুক্তির পথ এঁকে দিয়েছিলো সমগ্র জাতির সংগ্রামী চেতনায়। শোষণ থেকে মুক্তির অঅলোকিত পথ তৈরি করেছিলো নতুন পথে স্বৈরাচারী সরকার পতনের মধ্য দিয়ে নতুন সমাজ নির্মানের দিক নির্দেশনায় এগিয়ে গেলো। স্বদেশের চেতনা ধারার মানুষ কবি শামসুর রাহমানকে মাতৃভুমির সমাজ চেতনা প্রবাহিত করেছিলো, করেছিলো আলোড়িত। তাইতো মানবতাবাদী কবি উচচারণ করেছিলেন এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী শব্দমালা। নিজস্ব মাতৃভুমির প্রতি প্রেম শামসুর রাহমানকে নিয়ে যায় সমাজ বাস্তবতার দিকে।
তাইতো স্বাধীনতা উওর বাংলাদেশের নিবিড় সামাজিক পট পরিবর্তনের ঘটমান ঘটনাবলী পতাকার মতো পবিত্রতায় সমুজ্জ্বল। প্রতিক্রিয়াশীল কবিতায় শামসুর রাহমানের কবিতা হয়ে উঠেছে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রের মতো গুরুত্ববহ। ফলে তার কবিতা হয়ে উঠেছে সমাজবাস্তবতা নাগরিক জীবনবোধ ও স্বদেশ চেতনায় বহুমুখি জীবনধারার চিত্ররুপ। তিনি একে একে হয়ে উঠলেন জীবন ভাবনার কবি, স্বাধীনতার কবি। তার কবিতা হয়ে উঠলো পতাকার মতো স্বাধীনতার প্রতীক। বাংলা সাহিত্যের প্রধানতম কবি, স্বতন্ত্র কবি স্বত্বার অধিকরী এ কবি জন্মেছিলেন ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর নরসিংদির পাড়াতলী গ্রামে।
আর মৃত্যুবরণ করেন ২০০৬ সালের ১৭ আগষ্ট ঢাকায়। কবির জন্মবার্ষিকীতে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ।