শামসুদ্দিন শিশির একজন শিক্ষাব্রতী মানুষ

শিব প্রসাদ

35

শামসুদ্দিন শিশির আমার প্রিয় মানুষ, প্রিয় বন্ধু। তার সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার আগেই তাকে আমার ভালো লেগে গিয়েছিলো। এটি খুব কম মানুষের ক্ষেত্রেই ঘটে। এদিক থেকে শিশির খুবই সৌভাগ্যমান। শিশির আমার ব্যাচমেট ও পলিটিকেল সায়েন্সের স্টুডেন্ট। আমি ফিলোসটির। তবে পটিটিকেল সায়েন্স এবং সোসিওলোজিও আমার অধিত বিষয়। অন্তত সাবসিডিয়ারি হিসেবে আমার খুব প্রিয় সাজেক্টও বলা চলে। পটিটিকেল ফিলোসফি আমি পড়েছি। প্রিএইচডির রিসার্চ এর বিষয় করেছি, তাও ভালোলাগার কারণে।
এত সব কথা বলা তাও শামসুদ্দিন শিশির এর কারণেই। আমি শুধুই শিক্ষক, আর শিশির শিক্ষকদের শিক্ষক, আমি একবার এসএসসি পরীখ্ষায় এক্সটারনাল হিসেবে বোর্ড টিমে চট্টগ্রাম আবদুর রহমান হাইস্কুলে এক্সাম পরিদর্শনে যাই। সমগ্র স্কুলের সবগুলো হলরুম ঘুরে আসার পর হেডমাস্টার স্যার আমাদেরকে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করলেন। সেখানে তর টেবলের ওপর শামসুদ্দিন শিশির এর শিক্ষকতা একটি মহান পেশা(?) দেখতে পাই। আমার স্বভাব সুলভ বাস্তবতায় পৃষ্ঠা ওল্টাতে থাকি আর চোখ বুলাই। চোখ আটকে যায় চুম্বকের মতো।
রিসার্চ করতে গিয়ে দুটো জিনিস শিখেছি একটি স্কেনিং আর একটি স্কিমিং। বইটির ক্ষেত্রেও তা-ই হলো। মনে মনে ভাবলাম সকল শিক্ষকেরই এটি অবশ্য-অবশ্য পড়া উচিৎ, কেননা শিক্ষকতা হলো একটি ক্রিয়েটিভ প্রফেশন। জ্ঞান সৃজন, বিতরণ এবং উৎসাহ উদ্দীপনা প্রদান এর প্রধান হাতিয়ার। শামসুদ্দিন শিশির সব সময়ই এ কাজটি করাতে চেষ্টা করেন। অনেকটা গ্রিক ফিলোসফারদের মতো। শিক্ষা দর্শনের ক্ষেত্রে তিনি পাশ্চাত্য ঘেঁষা স্টুডেন্ট-টিচার রিলেশন ভালো না হলে স্টুডেন্টরা ভালো স্টুডেন্ট হতে পারে না। শিশির স্টুডেন্টদের মনের মণিকোটায় প্রবেশ করতে চেষ্টা করেন, তার সেই যোগ্যতাও অছে।
এসব মোটেও স্তুতিবাক্য নয়। সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের পালামৌতে লিখেছেন, ‘অশ্বত্থবৃক্ষ এতই রসিক যে ইহা নিরস পাথর হতেও রস চুষিয়া লয়’। আমি ব্যক্তিগতভাবে খুবই বেরসিক মানুষ। অসংখ্য মানুষের সাথেই মিশি, কিন্তু পদ্মাপাতার মতো, কিংবা বলা চলে রাজহাঁসের মতো, যে বয়সটাতে আমার হেসে খেলে বেড়ানোর দরকার ছিলো। সে বয়সটাতে আমি না জেনেই দর্শনের মতো একটা কাটখোট্টা বিষয় আত্মস্থ করার প্রয়াস পেয়েছি। ব্যক্তিগত চর্চার কারণেই আমি ১৯৮৩ খ্রি. থেকেই লিটল ম্যাগ সম্পাদনা ও প্রকাশনা করে থাকি। এটি ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিতরণও করি, পাঠক তৈরি করি, পাঠকের প্রতিক্রিয়া উপলব্ধি করি। কারও পকেট থেকে দশ টাকা খসানো যে কত বড় শিল্প সে আর কেউ না জানুক আমি অন্তত ভালো করে-ই জানি। লাইব্রেরি থাকার সুবাধে আমাদের এক সময় বিভিন্ন দৈনিক-সাপ্তাহিক পত্রিকার এজেন্সি ছিলো। কলেজে পড়ার ফাঁকে ফাঁক বিভিন্ন স্কুল-কলেজে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াতাম। বিতর্ক করতাম, আবৃত্তি করতাম নিজেও নানাবিধ পাঠ গ্রহণ করতাম, পরিচিত জনদেরকে পত্র-পত্রিকা দিতাম। আমার তৎকালীন এক পরিচিত জন ফিজিক্স-এর শিক্ষক অধ্যাপক বিজয় শঙ্ক পাল বলেছিলেন, ‘শিব তুমি যে এভাবে পত্র-পত্রিকা দাও, কখনো যদি তুমি বড় হয়ে যাও তো তোমাকে লোকে হকার বলে খোটা দেবে।’ আমি বললাম, যদি কখনো আমি বড় হয়ে যেতে পারি তো আমি নিজেই তখন নিজেকে হকার বলে গর্ববোধ করবো। পতিক্রা সম্পাদনা-প্রকাশনা ও বিতরণ করতে গিয়ে শামসুদ্দিন শিশিরকেও আমি প্রায়শ: সাপ্তাহিক পরিচয় কিংবা নিজের অথবা অন্যের বই-পত্রও দিয়ে থাকি। পয়সা না নিতে চাইলেও এই মহান শিক্ষক এবং লেখক কিছু না কিছু দিয়ে ছাড়েন। আমাদের দেশে যারা দু’কলম লিখতে শিখেছেন, কিংবা দু’পাতা পড়তে শিখেছেন, কিংব সমাজে দু’চার জনে চেনে তখন তারা মনে করে থাকে প্রিন্টেড কোনো কিছু কেউ দিয়ে থাকলে তা ‘সৌজন্য কপি’। এই বোধ আমাদের শামসুদ্দিন শিশির মনে করেন না, বইমেলায় মাঝে মাঝে যখন দেখা হতো দেখতাম ভালো বই পেলেই কিনে নিয়ে যেতেন দু’হাতে। আমি মাঝে মাঝে তাকে জিজ্ঞেস করি, তোমার বউ তোমাকে কিছু বলে না? তার সেই হো-হো প্রাণখোলা হাসি!
আমার ছোট্ট বাসায় বইয়ে ঠাসা এখন আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সোনার তরী কবিতাটি মাঝে মাঝে স্মরণ করি, ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোট্ট সে তরী, আমারই সোনার ধানে গিয়েছে যে ভরি! আমি মাঝে মাঝে এও স্মরণ করি, জীবনে কতো দিন দুপুরে ভাত না খেয়ে কিংবা কম খেয়ে প্রিয় সব বই কিনেছি। কিন্তু এক সময় আমার এই বইগুলো হয়তো অনাদর অবহেলায় কেউ না কেউ নিয়ে যাবে। কে-ই বা করবে তার রক্ষণাবেক্ষণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছি বলে লাইব্রেরিতে মাঝে মাঝে আনাগোনা করি। চাত্র-শিক্ষক তেমন কেউই ওমুখো হন না, অন্তত স্কুল কলেজ এডুকেশনে এ চিত্র সর্বত্র। এ শঞরের আমার চেনাজানা আর একজন কবি আছেন ফাউজুল কবির, তার সংগ্রহ শালাও রিচ্। আমি ভাবি এই অনিত্য সংসারে সবাই শুদু ধন-সম্পদ-সোনা দানা-হীনা-জহরত নিয়েই মশগুল ছিলো কিংবা থাকতে চান অথচ আমাদের মতো কিছু বোকা সোকা মানুষ কেবলই বইয়ের ধুলোবালি ঝেড়ে মুছে যান। শামসুদ্দিন শিশিরও তেমন ঘরানারই মানুষ। জীবনে যা কিছু আয় করেন এবং করেছেন তার সিংহভাগই ব্যয় করেছেন বইয়ের পেছনে। লিখেই তিনি ক্ষান্ত হননি, অনেকগুলো বই প্রকাশও করেছেন। পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছেন, মানুষের অন্তর ছুঁয়ে গেছেন। তার এ কাজ যতো বেশি বেশি সম্পন্ন হবে দেশের শিক্ষক সমাজ তথা জনগণও যথেষ্ট উপকৃত হবেন। সমাজদর্শন শিক্ষাদর্শন ছাড়া তো কোনো দেশ জাতি সঠিকভাবে এগিয়ে যেতে পারে না। সমাজে এমন কিছু মানুষ থাকা চাই যারা দেশ-জাতির কল্যাণে নির্মোহভাবে কাজ করেই থাকেন। এটি শ্রীকৃষ্ণেরও দর্শন-নিষ্কাম কর্মের ধারণা, জার্মান দাশনিক ইমানুয়েল কান্টও এ ধরনের দর্শন প্রচার করেছেন পাশ্চাত্যে।
আমাদের শামসুদ্দিন শিশির এর মনস্তত্বেও এ প্রদর্শন চিন্তাটা অবশ্যই কাজ করে। যারা বাণিজ্যিক লাভালাভের হিসাব কষেন নিখুঁতভাবে, ক্যালুলেটর ইউজ করে-তাদের পক্ষে আর যা-ই হোক সমাজ হিতোষী কিংবা হিতবাদী হওয়া সম্ভব নয়। আমাদের শামসুদ্দিন শিশির যতোদিন বাঁচবেন, ততো দিন এ কাজটুকু মন্টিনিউ করেন এবং দীর্ঘায়ু হন আমি সে কামনাই করছি।