শান্তি ও সম্প্রীতির বন্ধনে শেষ হল দুর্গোৎসব

4

গতকাল শুক্রবার বিজয়া দশমীর মাধ্যমে শেষ হল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার সনাতন ধর্মাবলম্বীরা মহাসমারোহে আনন্দঘন পরিবেশে এ ধমীয় উৎসবটি পালন করে থাকেন। প্রতি বছরের মতো এবারও বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায় যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসাহ-উদ্দীপনায় দুর্গোৎসব সম্পন্ন করেছে। চট্টগ্রামসহ দেশের প্রতিটি শহর-বন্দর ও প্রত্যন্ত গ্রামের মন্ডপগুলোও ছিল উৎসবমুখর। বাংলার চিরায়ত রীতির বন্ধনে একীভূত হয়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীর পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মের মানুষও সার্বজনীন দুর্গোৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেয়। এ দেশে শত শত বছর ধরে বিভিন্ন সম্প্রদায় পারস্পরিক সহাবস্থান ও সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করে আসছে। এক ধর্মাবলম্বী অন্য সম্প্রদায়ের বিপদে-আপদেও পাশে দাঁড়ায়। এটা বাঙালির চিরন্তন ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির পরিচায়ক। মাঝে-মধ্যে অশুভ শক্তি এ পরিচয় মুছে ফেলতে তৎপর হলেও সাধারণ মানুষ কখনই একে প্রশ্রয় দেয়নি। এ বছরও শান্তিপূর্ণ ও আনন্দমুখর পরিবেশেই দুর্গোৎসব উদযাপিত হয়েছে। প্রায় সর্বত্রই মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সক্রিয় অংশগ্রহণই এর প্রমাণ। দৈনিক পূর্বদেশ কর্তৃপক্ষ পূজা উপলক্ষে বাঁশখালীর প্রায় সকল পূজামন্ডপ পরিদর্শনসহ আর্থিক অনুদান দিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এ উৎসবকে আরো বেশি অনুপ্রাণিত করেছে। আমরা সার্বজনীন দুর্গোৎসব উপলক্ষে দেশের সকল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানাই।
সনাতন ধর্মের পৌরাণিক বর্ণনার সূত্রে জানা যায়, শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে দেবী দুর্গার আবাহন হয়েছিল। দশমীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি হয়। দেবী দুর্গা অশুভের বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক। এ বিজয় অর্জিত হয় আদ্যাশক্তি মহামায়ার সক্রিয় ভূমিকায়। মাতৃরূপিণী মহাশক্তি দুর্গা অশুভ শক্তির কবল থেকে বিশ্ব ব্রহ্মান্ড ও ভক্তকুলকে রক্ষা করেন। এই অমিত চেতনার সঙ্গে আবহমান বাংলার লোকজ সংস্কৃতি যুক্ত হয়ে দেবী দুর্গাকে বাঙালি হিন্দু সমাজ ‘ঘরের মেয়ে’ হিসেবেই বরণ করে নেয়। বাঙালি হিন্দুদের কাছে দুর্গাপূজা বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। দুর্গাপূজার শুরু হয় মহালয়ায়। এদিন দেবীপক্ষের সূচনা হয়। এর ঠিক পাঁচদিন পর মহাষষ্ঠীতে বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস। মহাসপ্তমীতে নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপন, সপ্তম্যাদিকল্পারম্ভ, সপ্তমীবিহিত পূজা। কদলীবৃক্ষসহ আটটি উদ্ভিদ এবং জোড়াবেল একসঙ্গে বেঁধে শাড়ি পরিয়ে একটি বধূ আকৃতিবিশিষ্ট করে দেবীর পাশে স্থাপন করা হয়। এই হল ‘নবপত্রিকা’, প্রচলিত ভাষায় যাকে ‘কলাবউ’ বলা হয়। মহাষ্টমীতে মহাষ্টম্যাদিকল্পারম্ভ, কেবল মহাষ্টমীকল্পারম্ভ, মহাষ্টমীবিহিত পূজা, বীরাষ্টমীব্রত, মহাষ্টমী ব্রতোপবাস, কুমারী পূজা, অর্ধরাত্রবিহিত পূজা, মহাপূজা ও মহোৎসবযাত্রা, সন্ধিপূজা ও বলিদান। মহানবমীতে কেবল মহানবমীকল্পারম্ভ, মহানবমী বিহিত পূজা। বিজয়া দশমীতে বিহিত বিসর্জনাঙ্গ পূজা, বিসর্জন, বিজয়া দশমী কৃত্য ও কুলাচারানুসারে বিসর্জনান্তে অপরাজিতা পূজা। এই দশমী তিথি বিজয়া দশমী নামে খ্যাত। দুর্গোৎসবের সঙ্গে বাংলার প্রকৃতিরও রয়েছে নিগূঢ় সম্পর্ক। শরতের শুভ্র কাশফুলের মতো মানব হৃদয়েও পুণ্যের শ্বেতশুভ্র পুষ্পরাশি প্রস্ফুটিত হোক। অসুরকে বধ ও অশুভকে বিনাশ করে মানব মনে সঞ্চারিত হোক শুভ চেতনা- এটাই হোক আমাদের সকলের প্রত্যাশা।