শিক্ষার্থীর পা বিচ্ছিন্নের ঘটনায় উত্তাল চবি

শাটল ট্রেনের বগি বৃদ্ধিসহ সংস্কার দাবিতে মানববন্ধন

চবি প্রতিনিধি

29

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) রুটে শাটল ট্রেনের বগি বৃদ্ধি, সংস্কারসহ বিভিন্ন দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে শিক্ষার্থীরা। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে গতকাল বৃহস্পতিবার আলাদাভাবে এসব কর্মসূচি পালিত হয়। কর্মসূচি ঘিরে গতকাল নগরীর ষোলশহর রেল স্টেশন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার চত্বর ছিল উত্তাল। গত বুধবার রবিউল আলম নামে এক শিক্ষার্থী ট্রেনে কাটা পড়ে দুই পা বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর এসব কর্মসূচির ডাক দেয় শিক্ষার্থীরা।
গতকাল সকাল সোয়া ৭টার দিকে দুর্ঘটনাস্থল নগরীর ষোলশহর রেল স্টেশনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী মনজুরুল হাসানের সঞ্চালনায় এতে বক্তব্য রাখে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী শুভ মারমা, পালি বিভাগের কিরণ মারমা, শিক্ষা ও গবেষণা ইনিস্টিটিউট বিভাগের ইমতিয়াজ ইমতু প্রমুখ। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, রবিউল ক্যাম্পাসে এসেছিল দুই পায়ে দাঁড়াতে, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে। কিন্তু তার পা-ই কাটা পড়লো। ট্রেনে শুধু তার পা কাটা পড়েনি, পড়েছে একটি পরিবারের স্বপ্ন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে রবিউলের পুনর্বাসনের দায়িত্ব নিতে হবে। তার চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে। এসময় শাটল ট্রেনের বগি বৃদ্ধি ও সংস্কারের দাবি জানিয়েছে শিক্ষার্থীরা।
একই দাবিতে সকাল ১১টায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার চত্বরে মানববন্ধন করে প্রগতিশীল ছাত্রজোটের নেতাকর্মীরা। অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী দেওয়ান তাহমিদ এর সঞ্চালনায় উক্ত মানববন্ধনে বক্তব্য রাখে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী দিদারুল ইসলাম, রাজেশ্বর দাশ গুপ্ত, আসিফুর রহমান, ইংরেজি বিভাগের শুভ মারমা, পদার্থবিদ্যা বিভাগের আশরাফী নিতু, নাট্যকলা বিভাগের ঋজু লক্ষী। এতে বক্তারা বলেন, সম্প্রতি শাটল ট্রেনের নিচে পা হারালো সমাজতত্ত¡ বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মো. রবিউল আলম। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের একমাত্র পরিবহন মাধ্যম শাটল ট্রেনে বছরের পর বছর ধরে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। প্রত্যেক শিক্ষার্থী পরিবহন বাবদ নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেয়ার পরেও শাটলে আসনের নিশ্চয়তা পায়না। প্রতিবছর শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, নতুন ডিপার্টমেন্ট হচ্ছে কিন্তু শাটলে বগির সংখ্যা বাড়ছেনা। একটিমাত্র সিট ধরার জন্য ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা, চলন্ত ট্রেনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হুড়োহুড়ি করে ওঠা, সবশেষে সিট না পেয়ে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে মেঝেতে পরে থাকা মলমূত্র সহ্য করে কিংবা মালগাড়িতে চড়ে এক ঘণ্টা পার করা-এগুলো নিত্যদিনের গল্প। সেই সাথে পুরোনো ইঞ্জিন ও মেয়াদোত্তীর্ণ, ভাঙাচোরা সিট-টয়লেট-জানালার বগির যন্ত্রণা তো আছেই। গরম কিংবা বৃষ্টির দিনে ভোগান্তি চরমে উঠে। ডাবল লাইন না থাকায় বিভিন্ন স্টপেজে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে ট্রেন। কোন নিরাপত্তারক্ষী বা সিগনালের ব্যবস্থা না থাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনায় পড়ে শিক্ষার্থীরা। রাতের ট্রেনে প্রায়ই ছিনতাইয়ের শিকার হয় শিক্ষার্থীরা। এছাড়া ট্রেন চলাকালে বাইরে থেকে ছোড়া পাথরে আহত হয় অনেকে। চলমান এই নৈরাজ্যের চাই। আন্দোলনকারীরা মানববন্ধন শেষে বিভিন্ন দাবি উত্থাপন করে। দাবিগুলো হলে অঙ্গহানি হওয়া ছাত্রের সুচিকিৎসার ব্যয়ভার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বহন করতে হবে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির নিশ্চয়তা দিতে হবে, বগির সংখ্যা এবং শিডিউল বৃদ্ধি করতে হবে, ডাবল লাইন চালু করতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয় ফ্রি বাস সার্ভিস চালু করা, নিউমার্কেট টু ক্যাম্পাস, শাটলে নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োগ এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ। মানববন্ধন শেষে একটি মিছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ফ্যাকাল্টি প্রদক্ষিণ করে প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেয় এবং একটি প্রতিনিধি দল উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি পেশ করে।
এরপর বেলা ১২টায় একই স্থানে মানববন্ধন করে শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকশ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। বেলা বাড়ার সাথে সাথে শিক্ষার্থীদের আগমনে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় শহীদ মিনার চত্বর। চবি ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বী সুজনের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন সাবেক সহসভাপতি সৌমেন দাশ জুয়েল, যুগ্ম সম্পাদক আবু তোরাব পরশ, সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ আরমান, সাংগঠনিক সম্পাদক ওমর ফারুক, উপ-গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক ইকবাল হোসেন টিপু, উপ-সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদক ইমাম উদ্দিন ফয়সাল পারভেজ, উপ-বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি সম্পাদক রকিবুল হাসান দিনার, ছাত্রলীগ নেতা প্রদীপ চক্রবর্তী দূর্জয় ও সাবেক কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য সাবরিনা চৌধুরী প্রমুখ। নিরাপদ শাটলের দাবি জানিয়ে মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, শাটলের বগি বৃদ্ধি ও সংস্কারের দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু রেলওয়ে ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি তেমন গুরুত্ব দেয়নি। এই গুরুত্বহীনতার ফলে শাটল আজ মালবাহী ট্রেনে পরিণত হয়েছে। ৩০০ কোটি টাকার উন্নয়নের দাবি নিয়ে আমরা আসিনি। নিরাপদ শাটল নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিটি ট্রেনে ১২টি বগি দিতে হবে। এছাড়া পুরনো বগিগুলোও সংস্কার করতে হবে। দুর্ঘটনায় দুই পা হারানো শিক্ষার্থী রবিউলের সহপাঠীরাও এতে অংশ নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়ে। জাকারিয়া হোসেন নামে তার এক সহপাঠী বলেন, শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত মাঠে থাকবো। রবিউলের চিকিৎসার ব্যয়ভার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নিতে হবে। পাশাপাশি তাকে চাকরিও প্রদান করতে হবে। এসময় রবিউলকে পুনর্বাসনের দাবিও জানায় তারা।
অন্যদিকে মানববন্ধন শেষে মিছিল নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে উপাচার্য কার্যালয়ের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। পথে মিছিলটি ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের সামনে এলে সামনে দাঁড়ানোকে কেন্দ্র করে কথা কাটাকাটি শুরু হয় ছাত্রলীগের দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে। হাতাহাতি ও দুই দফা কথা কাটাকাটি এক পর্যায়ে সিনিয়র নেতাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নেয়। পরে ছাত্রলীগের নেতারা চবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরীর কাছে মৌখিকভাবে দাবিগুলো জানায়। এসময় দাবিগুলো দ্রæত সমাধানের আশ্বাস দেন তিনি।